ছবি: জনকণ্ঠ
বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তা বিকাশ ও ক্ষমতায়নের অগ্রযাত্রায় যুক্ত হলো আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়। সফল নারী উদ্যোক্তা ও সরকারি স্বীকৃত ‘জয়িতা’ মুক্তি আকা খাতুন (মাহি) আবারও একটি মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্জনের মাধ্যমে তাঁর সাফল্যের ধারাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। প্রতিকূলতা পেরিয়ে দৃঢ় সংকল্প, অধ্যবসায় এবং দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি যে পথচলা তৈরি করেছেন, তা আজ অনেক নারীর জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। তাঁর এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস, সম্ভাবনা ও অগ্রগতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস–২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে Global Star Communication–এর উদ্যোগে আয়োজিত মর্যাদাপূর্ণ Global Star Women’s Award–2025 এ মুক্তি আকা খাতুন (মাহি)–কে একজন সফল ও প্রগতিশীল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর অসামান্য অবদান, দূরদর্শী নেতৃত্বগুণ এবং সৃজনশীল উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ সংস্থার সম্মানিত নির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করেন।

এই গৌরবময় অর্জনকে উদযাপন করতে ৭ই মার্চ ২০২৬ তারিখে ঢাকার বাংলামোটরস্থ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুস সালাম, মাননীয় প্রশাসক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন,ঢাকা। সভাপতিত্ব করেন প্রফেসর ড. হামিদা খানম, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উপদেষ্টা, গ্লোবাল স্টার কমিউনিকেশন। এছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দিলারা জামান, দেশবরেণ্য চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত, ফাতেমা-তুজ-জোহরা, দেশবরেণ্য নজরুল সঙ্গীত শিল্পী, চিত্রনায়িকা রোজিনা, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত, দেশবরেণ্য চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, হুমায়ুন কবির বেপারী, সভাপতি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক জোট এবং অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন তাশিক আহমেদ, উপদেষ্টা (অনুষ্ঠান ও সম্প্রচার), এটিএন বাংলা, প্রফেসর ডাঃ ব্রিঃ জেঃ (অবঃ) নাজমা বেগম নাজু, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, রিজিয়া পারভিন, বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী, লায়ন আনোয়ারা বেগম নীপা, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, গ্লোবাল ইয়ুথ বিজনেস ইনোভেশন ফোরাম।

অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের গুণীজন, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি আকা খাতুন (মাহি)-এর হাতে Global Star Women’s Award–2025 সম্মাননা স্মারক ও সার্টিফিকেট তুলে দেন।
উক্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র একজন নারী উদ্যোক্তার সাফল্য উদযাপন নয়, বরং দেশের নারী ক্ষমতায়ন ও উদ্যোক্তা মানসিকতার সম্প্রসারণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পুরস্কার গ্রহণের পর মাহি এক আবেগঘন মুহূর্তে বলেন—“এই সাফল্য আমার একার নয়। আমার পরিবার, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী—সবাই মিলে আমাকে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে সাহায্য করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, একজন নারী যদি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখে, তবে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।”
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন:
মুক্তি আকা খাতুন (মাহি)-এর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথ সহজ ছিল না। উত্তরবঙ্গের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে জন্ম নেওয়া মাহি জীবনের শুরুতে নানা আর্থিক সংকট ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন। তবুও দৃঢ় মনোবল, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য সাফল্যের গল্প।
কর্মজীবনের শুরু:
২০০৯ সালে মাহি টিএমএসএস-এর সিএনপি পদে মা ও শিশুর পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ শুরু করেন। পরে, ২০১২ সালে তিনি গালিব ইন্টারন্যাশনালে বিমানের টিকিট বিক্রেতা হিসেবে যোগ দেন, যেখানে মাত্র ছয় হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন। এছাড়া, তিনি টিউশন ও কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করতেন।
উদ্যোক্তা হিসেবে উত্তরণ:
২০১৬ সালে মাহি মারিয়া এভিয়েশনে যোগ দেন এবং বিমানের টিকিটিং খাতে আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের সঙ্গে কাজ করে তাঁর পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করেন। এই সময়েই তিনি নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা করেন। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Ghausia International Tours & Travels এবং ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই প্রতিষ্ঠা করেন Ghausia Women’s Computer Training Center ঢাকার মিরপুর ও সৈয়দপুরে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও টিকিট বুকিং সেবা প্রদান করছে, অন্যদিকে তেমনই নারীদের জন্য প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে—Office Application Course (MS Word, MS Excel, MS PowerPoint, MS Access, Internet Browsing, E-mail, AI ChatGPT), প্র্যাকটিক্যাল ল্যাব সেশন, আধুনিক প্রযুক্তির বেসিক প্রশিক্ষণ, গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, এআই টুলস এবং ফ্রিল্যান্সিংসহ নানা পেশামুখী কোর্স পরিচালনা করছে, যা বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি শ্রেষ্ঠ জয়িতা – ২০১৭:
২০১৭ সালে (২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশে আয়োজিত ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রমে ‘অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী’ বিভাগে সৈয়দপুর উপজেলা ও নীলফামারী জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তীতে রংপুর বিভাগীয় পর্যায়েও একই বিভাগে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মাননা লাভ করেন। এ সময় তিনি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার কাজী হাসান আহমেদ এবং রংপুরের জেলা প্রশাসক এনামুল হাবীবের হাত থেকে সম্মাননা স্বারক গ্রহণ করেন।
নারী সম্মাননা – ২০২৫:
স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন “হৃদয়ে সৈয়দপুর”-এর ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৫ উপলক্ষে ৮টি বিভাগে প্রদত্ত সম্মাননার মধ্যে মুক্তি আকা খাতুন (মাহি) প্রথম বিভাগে “সেরা নারী উদ্যোক্তা” হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন।
এছাড়া, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে এবং শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সহযোগিতায় Skills for Employment Investment Program (SEIP) Project Tranche-3-এর আওতায় আয়োজিত Entrepreneurship Development Program মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কোর্সও তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করে সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
‘উদ্যমী আমি’ — দক্ষতা ও নেতৃত্ব বিকাশের প্ল্যাটফর্ম:
গত ১১ আগস্ট ২০২৫ইং তারিখে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত গ্র্যাজুয়েশন সেরিমনি ‘উদ্যমী আমি’ কোহর্ট-৯-এর সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন। রাজধানীর মেরুল বাড্ডা ক্যাম্পাসে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উদ্যোক্তা, কর্পোরেট প্রতিনিধি ও প্রশিক্ষকরা একত্রিত হয়ে নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্য উদযাপন করেন।
ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট সেল (WEC) এবং ব্র্যাক ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দুই মাসব্যাপী এই নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল নারী উদ্যোক্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশ এবং ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় পারদর্শিতা অর্জন করানো।
নির্বাচিত উদ্যোক্তারা ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, মার্কেটিং, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেন।
পারিবারিক অবদান:
মাহি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি তাঁর পরিবারের জন্যও এক আলোকবর্তিকা। বাবার অনুপস্থিতিতে ভাইবোনদের শিক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তাদের স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করেছেন। তাঁর ভাইবোনেরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, যা মাহির আত্মত্যাগ ও অনুপ্রেরণার ফলাফল।
নারীর ক্ষমতায়নে অঙ্গীকার:
মাহি বিশ্বাস করেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক নারী এখন নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছেন বা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করছেন।
উদ্দেশ্য ও পরামর্শ:
মাহির জীবন আমাদের শেখায় যে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, সংকল্প ও পরিশ্রম মানুষকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যেতে পারে। তিনি নারীদের উদ্দেশে বলেন— "নিজেকে কখনও তুচ্ছ মনে কোরো না, স্বপ্ন দেখো, লড়াই করো, জয় তোমার হবেই।" তাঁর জীবনসংগ্রাম একটি জীবন্ত প্রমাণ যে, নারীর শক্তি সীমাহীন।
Global Star Women’s Award–2025 সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তা আন্দোলনের অগ্রগতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। এই অর্জন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—নিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রমকে শক্তি হিসেবে গ্রহণ করলে নারীরা সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম।








