ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

আল বিদা মাহে রমজান

অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ০০:৪৭, ১১ মার্চ ২০২৬

আল বিদা মাহে রমজান

পবিত্র মাহে রমজানের আজ ২১তম দিবস

পবিত্র মাহে রমজানের আজ ২১তম দিবস। সিয়ামের মাসের সমাপনী দশকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় সিয়াম সাধনা ও অন্যান্য ইবাদত বন্দেগিতে বিভোর রোজাদারগণ। আজ আমরা এক মহামনীষীকে নিয়ে আলোচনা করব, যিনি নানাবিধ ত্যাগ, সত্য সাধনা ও নবীপ্রেম দিয়ে মুসলমানদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি হলেন প্রিয়নবীর (স.) মহান সাহাবী হযরত সা’দ ইবন উবায়দা (রা.)। ১৫/৬৩৬ সালে মদীনার পার্শ¦বর্তী এক নির্জনবাসে অজ্ঞাতনামা আততায়ীর হাতে তিনি প্রাণ হারিয়েছিলেন। তিনি সে সাহাবীদের অন্তর্গত যারা ইসলামের প্রথমদিকে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে মহানবীর সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি মদীনার আনসার বা সাহায্যকারী সাহাবাদের একজন।

মহানবী  (স.) নিজ মাতৃভূমি মক্কায় নানা অত্যাচার ও নিপীড়নে জর্জরিত হয়ে বিভিন্ন দেশ ও গোত্রের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু কেউ তাকে সহযোগিতা ও আশ্রয় প্রদানে সাহস দেখায়নি। কিন্তু যে ক’জন মদীনার নেতৃস্থানীয় লোক মক্কাবাসীর সমস্ত ভয়ভীতি উপেক্ষা করে, বংশীয় আভিজাত্যের গর্বগাথা ত্যাগ করে হজ মৌসুমে আকাবা নামক স্থানে মহানবীকে মদীনায় নিরাপদ আশ্রয়ের গ্যারান্টি দেন হযরত সা’দ তাদের অন্যতম। মহানবী প্রায় সময় তাঁর এবং তাঁর বংশের জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলতেন: হে আল্লাহ, আনসারগণের উত্তম পুরস্কার দান করুন। বিশেষ করে আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম এবং সা’দ ইবনে উবাদাকে।’ তিনি আরেকদিন বলেছিলেন: হে আল্লাহ সা’দ ইবনে উবাদার বংশের ওপর আপনার রহমত ও করুনা বর্ষিত হোক।’ 
হযরত সা’দের জীবনী আমাদের কাছে এ জন্যই বিশেষ স্মরণীয় যে, নেতৃত্বের কোয়ালিটি, জ্ঞান গরিমা, দানশীলতা ও বীরত্বের জন্য তাঁর ছিল বিশেষ খ্যাতি। আরবে এক সময় দ্বন্দ্ব কলহের সৃষ্টির জন্য মদীনা নগরীর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র আউস ও খাজরাজ এখনো আলোচিত সমালোচিত হয়ে থাকে ইতিহাস পাঠকদের কাছে। মহানবীর (স.) পরশে এসে তাঁরা শান্ত ও মার্জিত হয়েছিল, পরিণত হয়েছিল সোনার মানুষে। সা’দ ছিলেন খাযরাজ গোত্রের দলপতি; উপাধি ছিল তার সায়্যেদুল খাযরাজ। তাঁদের গোটা পরিবার ছিল আরব দেশে দানশীলতার জন্য বিখ্যাত। তাঁর দাদার দানশীলতা এত ব্যাপক ছিল যে, প্রত্যহ নিয়মিতভাবে দুর্গের ওপর হতে এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে ডেকে বলতা: যার গোশত, তেল ও উত্তম খাদ্য খেতে ইচ্ছে হয় সে যেন আমাদের দুর্গে আসে..।’

এ কারণে তাদের পরিবার মদীনায় ‘হাতেম তাঈ’ বলে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে সা’দের বদান্যতার ঘটনাবলি যত্রতত্র গল্পের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। আল্লাহর রাসুলের (স.) মদীনার শুভাগমনের পর হতে প্রত্যহ হযরত সা’দের ঘর থেকে খানাপিনা আসত। বহু গরিব সাহাবী শিক্ষা-দীক্ষার জন্য মহানবীর বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। হযরত অবস্থাপন্ন সাহাবীদের ঘরে তাদের ২/১ জন করে প্রতিদিন আহার গ্রহণের জন্য পাঠাতেন। হযরত সা’দ প্রত্যেক দিন ৮০ জনকে দাওয়াত করতেন।Ñ(আল ইসাবা)। তার মা যখন মারা গেলেন তিনি হুজুরের (স.) দরবারে এসে এ উপলক্ষে কিভাবে দান করবেন জানতে চাইলেন। হযরত (স.) পরামর্শ দিলেন, জনগণের পানি পানের ব্যবস্থা করে দাও।’ তাঁরই দানের ঐতিহাসিক চিহ্ন হিসেবে মদীনায় আজও বিদ্যমান রয়েছে ‘আলে সা’দের নহর’ÑÑসা’দ পরিবারের ঝিল। 
জীবনে তিনি ইসলামের সব ক’টি জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। তিনি প্রায় সময় মহানবীর (স.) পক্ষে নিজ কাফেলার পতাকা গ্রহণ করতেন। হিজরতের কিছুদিন পর হযরত রাসুলে কারীম (স.) মক্কার শত্রুদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য মদীনা শহরের বাইরে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে গমন করেন। তখন তিনি মদীনায় হযরত সা’দকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান।ÑÑ(তাবাকাত)। উহুদ যুদ্ধের সময় মদীনা শহর অরক্ষিত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তখন সা’দ ছিলেন মহানবীর বাসভবন পাহারা দেওয়ার বিশেষ দায়িত্বে। এভাবে রাসুলুল্লাহর (স.) যুগে হযরত সা’দ নানাভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। হযরত (স.) ওফাতের পর যে ক’জন অগ্রসর সাহাবীকে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বভার প্রদানের জন্য নানাভাবে প্রস্তাব এসেছিল। অনেকে হযরত সা’দের নামও এতে জড়িত করেছিল।

কিন্তু সে দিন সবচেয়ে যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে হযরত আবু বকরই (রাদিঃ) এ মহান পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। আজকের সমাজ হযরত সা’দের মতো উদার-মহান বীরত্বপূর্ণ চরিত্রের মানুষের অভাব, নেতৃত্বে উদারতা আর সৎ সাহসের সমন্বয় নেই বললেই চলে। আমরা হযরত সা’দের কাছ থেকে আনুগত্য, ধর্মানুরাগ, কর্তব্যনিষ্ঠা, নবীপ্রেম ও ভালোমন্দ যাচাই-বাছাইয়ের বিবেক বুদ্ধির শিক্ষা নিতে পারি। তাঁদের মতো মহান আনসার বা সাহায্যকারী ছিলেন বলেই মহানবী ও ইসলামের আদর্শিক বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছিল।

প্যানেল হু

×