ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

জেগেছে বিশ্ব ছাত্রসমাজ

মমতাজ লতিফ

প্রকাশিত: ২০:৩৯, ১৫ মে ২০২৪

জেগেছে বিশ্ব ছাত্রসমাজ

বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে বিশ্বের ছাত্রসমাজ

কবে থেকে অপেক্ষা করছিলাম কখন ফিলিস্তিনের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে বিশ্বের ছাত্রসমাজ। এতদিন পরে, প্রায় ৩৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিরপরাধ মা-শিশুসহ ইসরাইলের অমানবিক নৃশংস বোমা হামলার শিকার হয়ে নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম এ গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমে পড়ে।

আমরা শিক্ষিত মেধাবীদের নিঃস্বার্থ, বিবেকী পদক্ষেপ, ইসরাইলের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিরুদ্ধে এই কাক্সিক্ষত প্রকাশ দেখে আবার বিশ^বিবেকের প্রতি আস্থা ফিরে পেলাম। এ প্রসঙ্গে শুধু কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশে দেশে গণত্যার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে তা নয়।

দেখে খুবই আনন্দিত হলাম- আমাদের খ্যাতিমান ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও ইসরাইলের দ্বারা সংঘটিত ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বিশ্ববিবেকের প্রতি দাবি জানিয়েছে। অন্যান্য বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মস্বার্থ বর্জন করে অবশ্যই পৃথিবীর এ যুগের হিটলারীয় গণহত্যা বন্ধে যে কোনো উপায়ে দাবি জানানোর প্রয়োজন ছিল।

যেহেতু, আমাদের দেশ পাকিস্তানিদের গণহত্যাকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, সেহেতু বুয়েট থেকে শুরু করে সবরকম সরকারি-বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলের শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদী মিছিল সমাবেশে যোগ দিতে হতো! বাংলােেদশের জন্মে ছাত্র সমাজের ভূমিকা, অবদান, তাদের সেদিনের মেধাবী বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হচ্ছে দেশে দেশে আজ ছাত্র সমাজের অন্যায় বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে। 
এতদিন যাবৎ আমাদের প্রশ্ন ছিল- ইসরাইলকে সুদূর ইউরোপ থেকে আরব দেশে একটি ভূখণ্ড দিয়ে স্থানীয়  আরবদের উৎখাত করে, যুদ্ধ করে তাড়িয়ে দিয়ে তখনকার আরব দখলদার যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ঐকমত্য হয়ে জাতিসংঘে ইসরাইলি রাষ্ট্র হিসেবে ইউরোপ থেকে বিতাড়িত ইহুদিদের স্বার্থরক্ষার কাজ করতে গিয়ে আরবভূমিতে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল ১৯৪৮ সালে।

অথচ দেশত্যাগে বাধ্য আরব ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ওই একই সময়ে ফিলিস্তিন নামের রাষ্ট্র গঠনও ছিল জাতিসংঘ এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তব্য। শান্তি-শৃঙ্খলা এবং যে মানবতার নামে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মুখে খই ফোটে, তারও সম্মানজনক সমাধান হতো তাতে।
কিন্তু, তা হয়নি। হতে পারেনি। জাতিসংঘের অদ্ভুত এক নিয়মের পরিণতিতে যার অন্যতম প্রধান কারণ- ইউরোপীয়দের সেমিটিক জাতির প্রতি বিদ্বেষ। দ্বিতীয়ত- পশ্চিমারা হচ্ছে অস্ত্রবাজ ও অস্ত্র ব্যবসায়ী।

এদিকে লিবিয়ায় জাতীয়তাবাদী নেতা গাদ্দাফীর উত্থান লিবিয়ার অর্থনীতিকে যখন উন্নত করছিল, ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের শাসনকালে ইরাক শান্তি ও সমৃদ্ধির দেশ হয়ে উঠছিল, যখন ইরানে শাহ-এর শাসনের সমাপ্তিতে পাশ্চাত্য তাদের এক বড় মিত্র হারিয়েছিল এবং সে স্থানে কট্টর ইসলামপন্থি মোল্লা দল পশ্চিমা অস্ত্র বর্জন করে নিজেরাই রাশিয়ার সাহায্যে নানরকম উন্নত সমরাস্ত্র, এমনকি পরমাণু বোমাসহ উন্নত অস্ত্র ও যুদ্ধ জাহাজ তৈরিতে ইসরাইলের সমকক্ষ হলো- তখন এর কোনোটিই পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারকে মনোপুত হচ্ছিল না।

খুবই সূক্ষ্ম উপায়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্ত অবস্থা তৈরি করা হলো, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা তছনছ করে ফেলা হয়। নিহত হন গাদ্দাফী, সাদ্দামের মতো জাতীয়তাবাদী নেতারাও! ইউরোপকে এখন এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে দুবাই, কাতার থেকে। যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ তো সবসময় আমাদের দেশকে মানবাধিকার ক্ষেত্রে তালিকার শেষের দিক থেকে ২/৩ নম্বরে রাখে। ওরা এখন একটি প্রকৃত গণহত্যার প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা, গ্রেপ্তার করার কাজ করছে ইসরাইলকে খুশি করতে! এই হচ্ছে পশ্চিমা মানবাধিকারের নমুনা!
আরেকটি বিবেচ্য বিষয়Ñ এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কোনোরকম ‘ভেটো’ ক্ষমতা একেবারেই যুক্তযুক্ত নয়। যখন তথ্যপ্রযুক্তি বা এত উন্নত ইন্টারনেট সেবা, মুহূর্তের মধ্যে ভুল বা সত্য তথ্য পৌঁছে যায় মানুষের কাছে, সে যুগে জাতিসংঘের মতো একটি বিশ্ব সংস্থায় সব কাজই গণতান্ত্রিক রীতিতে ডিজিটাল নীতিতে চলার কথা।

এখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের রাশিয়ার ‘ভেটো’ প্রদানের বিষয়টি না ভুলেই বলছিÑ সে যুগ হয়েছে বাসি। এ যুগে ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। এখন গুটিকতক দেশ অন্যদের ভোট নস্যাৎ করার জন্য স¤্রাটদের মতো ভেটো ব্যবহার করা অনৈতিক। সুতরাং এর বিরুদ্ধেও আন্দোলন শুরু করতে হবে শিক্ষার্থীদের।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের রায় না মেনে মিয়ানমার যেমন রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে, তেমনি ইসরাইল ফিলিস্তিনের হাজার হাজার বোমা ফেলে পুরো দেশটিকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। যেন যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হলে তার পক্ষে গণত্যা করা, লাখ লাখ মানুষ হত্যা কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না!

যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ শিক্ষার্থী-শিক্ষকের ওপর সহিংসতা করলে, বিনা অপরাধে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করলে, তা মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় না! আর বাংলাদেশে বিরোধী দল সহিংসতা করলে, পুলিশ হত্যা করলে, অ্যাম্বুলেন্সে আগুন দিলে, সেসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের, ইইউর মানবাধিকার সংস্থাগুলো ‘গেল, গেল’, রব তুলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ‘বিশাল অপরাধ’ ধরে নিয়ে তাদের তৈরি র‌্যাঙ্কিংয়ে একেবারে নামিয়ে দেওয়া হয়!

পশ্চিমাদের এই দ্বি-মুখী আচরণ দ্বারা ওরা প্রমাণ করে- একদিকে ইসরাইল নব্য-হিটলারি নাৎসি দলকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে যুদ্ধে দক্ষ করে তুলছে, একই সঙ্গে ইউক্রেনীয়দের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ও অস্ত্র দিয়ে অহেতুক রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ চলমান রাখছে শুধু অস্ত্র বিক্রির লক্ষ্যে! অপরদিকে প্রতিদিন হাজার হাজার নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি নাগরিক বোমা হামলায়, চিকিৎসা সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ায় খাদ্যাভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে।

অথচ এতে তাদের মানবাধিকারের কোনো লঙ্ঘন হয় না! গাজাকে তো হাসপাতাল, বাড়িঘর, স্কুল, রেডক্রস অফিস, সাংবাদিক হত্যার মাধ্যমে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে! পুরো বিশ্ব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে। আর অকার্যকর জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত ইসরাইলিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে পারেনি!
শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্ন, পৃথিবীর ক্ষমতাধর দেশের মানুষরা কি অস্ত্রকে বাণিজ্যের অযোগ্য পণ্য হিসেবে গণ্য করার একটি আন্দোলন শুরু করতে পারে না? মানুষ বাণিজ্য শুরু করেছিল- খাদ্যশস্য, বস্ত্র, দামি ধাতু, মসলা ইত্যাদি যে দেশে নেই, সে দেশে ক্রয় করে আনার জন্য। এভাবে এক দেশের অপ্রাপ্য পণ্য অন্য দেশের সওদাগররা নিয়ে যেত! বাণিজ্য বিবেচনা করা হতো।

এখনো আমরা পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, নানারকম ফল, চাল ইত্যাদি যে দেশে এসব বেশি উৎপন্ন হয়, সে দেশ থেকে আমদানি করে থাকি। কোনো কোনো সময় উড়োজাহাজ যা আমরা বানাই না, তাও পশ্চিমা দেশ থেকে আমদানি করি। পৃথিবীব্যাপী আজ এই নিরাপত্তা পরিষদের বিরুদ্ধে ‘ভেটো’ নামক গায়ের জোরে অন্যায়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

একটি মাত্র দেশ ‘ভেটো’ নামক স্বৈরতান্ত্রিক নিয়মে সবার ভোটাধিকারকে মূল্যহীন করে দিতে পারবে- এ ধরনের স্বৈরাচারী নিয়ম বর্তমান যুগে অচল ও পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। সাধারণ পরিষদ এবং দেশে দেশে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও পেশাজীবী এ অন্যায় ‘ভেটো’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে চিরতরে তুলে দেওয়ার জন্য প্রতিবাদী আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। শত শত বছর যাবৎ অন্যায় স্বৈরাচারী পদ্ধতি চালিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থই হয় না।

সময় এসেছে জাতিসংঘের সংস্থার করার, বিশেষত নিরাপত্তা পরিষদের ‘ভেটো’ ক্ষমতা বিলুপ্ত এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতিসংঘকে পরিচালিত করার। এ যুগের শিক্ষার্থী-শিক্ষক-বিজ্ঞানী সবার এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
সব দেশের শিক্ষার্থীদের বলব- বিশ্ব এখন স্বার্থান্ধ বয়স্ক বৃদ্ধ নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কেন তোমরা শত বছরের ওইসব বে-নিয়মকে ভেঙে দেওয়ার পদক্ষেপ, দাবি করবে না? অস্ত্রবিক্রেতা, পরিবেশ ধ্বংসকারী, ঘুষ-গ্রহণকারী, বিশে^র দরিদ্রের জন্য একবিন্দু মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে না যারা, যারা ইচ্ছামতো অস্ত্র বিক্রেতা বন্ধু রাষ্ট্রকে মানবাধিকারে প্রথম, দ্বিতীয় মান দেয়, অথচ অস্ত্র বিক্রি তো সবচেয়ে অমানবিক বর্বর উপায় যা দেশে দেশে, গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে তুচ্ছ বিষয়ে যুদ্ধ-লড়াই বাধায়! কেন বিশ্বের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এসব অনিয়ম মেনে নেবে? সুতরাং জাতিসংঘের সংস্কার করে ইসরাইলকে গণহত্যা বন্ধ করিয়ে স্বাধীন দুটি রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ মানবিক নিয়মনীতি মেনে চলার দাবি জানাতে দেরি করা যাবে না? 
ফিলিস্তিনের জনমানুষের জন্য যেমন তোমরা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছ, একই সঙ্গে সব অপরাধের গোড়া- অকার্যকর জাতিসংঘের সংস্কার প্রয়োজন দাবি কর- যে কোনো ধরনের মারণাস্ত্র আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অংশ হতে পারবে না। বাণিজ্য মানুষ মারার কোনো পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এই তথ্যপ্রযুক্তি-ডিজিটাল পৃথিবীতে তো নয়ই? বিশ্ব-পরিচালনার রীতিনীতিগুলো এই যুগে অবশ্যই পরিবর্তিত হতে হবে।

এ যুগের প্রযুক্তিবিদরা যুদ্ধকে ‘না’ বলবে এবং ‘শান্তি’ পূর্ণ পৃথিবী গড়তে কাজ করবে- এটাই তো কাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিত। যুদ্ধ বন্ধ করার দাবি যেমন জানাতে হবে, তেমনি যুদ্ধের উপকরণ যুদ্ধাস্ত্রের বাণিজ্যিকীকরণও নিষিদ্ধ করতে হবে। নতুবা নতুন নতুন যুদ্ধাস্ত্র নতুন নতুন দেশে যুদ্ধ শুরু করার কারণ তৈরি করবে।
সময় এসেছে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘের সদস্যপদে যোগ দিতে সর্বসম্মত অনুমোদন দেওয়া। বিশ্ব ছাত্রসমাজ যখন জেগেছে, তখন তারা এসব দাবি পূরণ না করে ঘরে এবং শ্রেণিকক্ষে ফিরে যাবে না- এই প্রত্যাশা করি।
লেখক : শিক্ষাবিদ

×