ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০২ মার্চ ২০২৪, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

মামলার জট

-

প্রকাশিত: ২০:২৮, ৩০ মার্চ ২০২৩

মামলার জট

সম্পাদকীয়

দেশের উচ্চ আদালতসহ নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ। কেবল উচ্চ আদালতেই বিচারাধীন (আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ) মামলার সংখ্যা ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪৭টি। এর মধ্যে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয়ই রয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে নিম্ন আদালতÑ জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও অন্যান্য। যেগুলোতে মামলার সংখ্যা ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ৫টি। সব স্থানেই রয়েছে অসহনীয় মামলার জট নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

ফৌজদারি মামলার তুলনায় দেওয়ানি মামলার সংখ্যা অনেক বেশি নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এর সঙ্গে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মামলা। ফলে স্বভাবতই মামলার সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দেশে ভূমি অনুপাতে মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা একটি সমস্যা। জমিজমা নিয়ে পারিবারিক দলাদলি, ভাগাভাগি, হানাহানি ইত্যাদি বাড়ছেই। আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যাও কম নয়। চুরি-ডাকাতি-প্রতারণার পাশাপাশি বাড়ছে খুন-ধর্ষণ-রাহাজানি-লুটপাট ইত্যাদি।

ইদানীং রাজনৈতিক সহিংসতা, বোমা হামলা, আগুন লাগানোসহ মৌলবাদী ও জঙ্গি তৎপরতাও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এর ফলেও বাড়ছে মামলার সংখ্যা। কিছু মামলা-মোকদ্দমা জনগুরুত্বসম্পন্ন বিবেচনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালসহ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। সেগুলোর রায় দ্রুত সম্পন্ন হয়। তবে এর সংখ্যা খুব কম। অধিকাংশ মামলার ক্ষেত্রেই দীর্ঘসূত্রতা লক্ষণীয়। দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে ঝুলে আছে, এমন মামলার সংখ্যাও কম নয়। এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই আলোচনা-সমালোচনা হয়, সেমিনার-গোলটেবিল বসে।

প্রধান বিচারপতিও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির কথা বলে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে জনভোগান্তি লাঘবের কথা বলেন। তবু মামলার জট কিছুতেই কমে না। খুঁজলে এমনও পাওয়া যাবে যে, মামলার চূড়ান্ত রায় পেতে পেতে বাদী-বিবাদী এমনকি সাক্ষী মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে।
মামলার জট নিরসনসহ জনভোগান্তি কমাতে আইন মন্ত্রণালয়, বিচারক সমিতি, সর্বোপরি আইনজীবী সংগঠনসহ বিভিন্ন জন বিভিন্ন মত ও পথের কথা বললেও বাস্তবে সাফল্য অর্জনের হার খুব কম। মোটা দাগে অনেকেই বিচারক ও বিচারালয়ের স্বল্পতার কথা বললেও মূল কারণ পদ্ধতিগত জটিলতা। মামলা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত আইনজীবীদের মতে, ব্রিটিশ আমলের আইনসহ পদ্ধতিগত কারণেই বেড়ে যাচ্ছে মামলার জট ও জটিলতা।

ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে থানা-পুলিশ তদন্ত ও চার্জশিট দাখিল করতেই ব্যয় করে বহু সময়। জমি-জিরাত সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রেও অনুরূপ। এর পর মামলা সংশ্লিষ্ট পক্ষদের নামে নোটিস জারি করতেও লেগে যায় বছরের পর বছর। ভুল ঠিকানা, ভুল নথি, নাম ও বানান বিভ্রাটসহ সমন হারিয়ে যাওয়ার খবরও আছে। দেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো পবিত্র আদালত অঙ্গনেও অর্থ তথা দুর্নীতির দাপট কম নয়। 
৪২ লাখ মামলার বিপরীতে উচ্চ আদাত এবং নিম্ন আদালতে বিচারকদের সংখ্যাও কম প্রয়োজনের তুলনায়। আইন কমিশনের মতে, নিম্ন আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে কয়েক হাজার নতুন বিচারক নিয়োগসহ অবকাঠামো করতে হবে, যা অর্থ বরাদ্দ ও সময়সাপেক্ষ। এর পাশাপাশি বিচারক এবং আইনজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণও অপরিহার্য। আরও চাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সততা, নীতি-নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির মনোভাব। মামলার জট নিরসনসহ দ্রুত রায় প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালত যথাযথ প্রদক্ষেণ গ্রহণ করবে বলেই প্রত্যাশা।

×