ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গোপসাগর

জাফর ইকবাল রাসেল

প্রকাশিত: ২০:৫৬, ১১ আগস্ট ২০২২

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গোপসাগর

বঙ্গোপসাগর

এই গল্প সবাই জানে, অসংখ্যবার লেখা হয়েছেতবু ইচ্ছে হলো আবার মনে করিয়ে দেই সবাইকেরাশিয়া যুদ্ধ করছে ইউক্রেনের সঙ্গে আর চীন তার ক্ষমতা দেখাচ্ছে তাইওয়ানের সঙ্গেদুই জায়গাতেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রইন্ধন বা উস্কানি দেয়াতে এরা ওস্তাদবিশ্বজুড়ে অশান্তি করাই এদের বিদেশনীতিযুদ্ধ বাধলেই অস্ত্র ব্যবসা চাঙ্গা, তাদের অর্থনীতির উন্নয়নআগস্ট মাস এলেই আমাদের মন খারাপ হয়কারণ, আমার বাবা বলতেন, ১৫ আগস্টের আসল কারিগর এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

১৯৭১ সালের চরম অপমানের প্রতিশোধের বলি বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারমাঝে মাঝে ভাবি, ১৫ আগস্ট না হলে কি হতো? পদ্মা সেতু মনে হয় আরও ২০ বছর আগেই হতো, আমাদের হয়ত বা একটি বিমানবাহী রণতরী বঙ্গোপসাগরে ভেসে বেড়াতআর গুধহসধ (ইঁসধ) আমাদের ডাকত বড়ভাই বলে

যা হোক, ফিরে আসি গল্পেখুব শীত পড়েছে, ১৯৭১ সালমুক্তিযুদ্ধ চলছেভারতও পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধে জড়িয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গেজাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে উত্থাপিত যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নাকচ হয়েছেমার্কিনী কূটচাল টিকল নাআমেরিকা তখন ভারতকে হুমকি দিল যুদ্ধ (আমাদের মুক্তিযুদ্ধ) বন্ধ করারউদ্বিগ্ন ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নে (বর্তমানে রাশিয়া) একটি ঝঙঝ পাঠালযখন ৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত, দুষ্ট কিসিঞ্জার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বঙ্গোপসাগরে পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী টঝঝ এন্টারপ্রাইজের নেতৃত্বে ৭ম নৌবহর পাঠাতে প্ররোচিত করেছিল

টঝঝ এন্টারপ্রাইজ তখন বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরীআর ভারতীয় নৌবাহিনীর বহরের নেতৃত্বে ছিল বিক্রান্ত, ২০টি হালকা যুদ্ধবিমান বহন করছিলআনুষ্ঠানিকভাবে টঝঝ এন্টারপ্রাইজকে বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশে আমেরিকান নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য, আসলে এটি ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ভয় দেখানো এবং পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) স্বাধীনতা রোধ করাএকই সময়ে আরেকটি দুঃসংবাদ পেল ভারতজানা গেল, একটি শক্তিশালী ব্রিটিশ বিমানবাহী নৌবহর বেশ কয়েকটি উবংঃড়ুব এবং অন্যান্য জাহাজসহ ভারতীয় জলসীমায় পশ্চিম দিক থেকে আরব সাগরের দিকে আসছে

ব্রিটিশ এবং আমেরিকানরা ভারতকে ভয় দেখানোর জন্য একটি সম্মিলিত নৌ আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলভারত রাশিয়ার কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠালবাঘের বাচ্চা সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া) তক্ষণা মার্কিন নৌবহরকে অবরুদ্ধ করতে ১৬টি সোভিয়েত নৌ-ইউনিট এবং ৬টি পারমাণবিক সাবমেরিন প্রেরণ করল বঙ্গোপসাগরের দিকে২ ডিসেম্বর ১৯৭১, টঝঝ এন্টারপ্রাইজের নেতৃত্বে ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে পৌঁছেছিলব্রিটিশ নৌবহর আরব সাগরে আসছিলপৃথিবী তার নিশ্বাস আটকে রেখেছিল

কিন্তু, আমেরিকানদের অজানা, রাশিয়ার সাবমেরিনের পেরিস্কোপের সীমানায় তারা ধরা পড়ে আছেটঝঝ এন্টারপ্রাইজ বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোভিয়েত সাবমেরিনগুলো সতর্কতা ছাড়াই সামনে আসেতারা ভারত এবং আমেরিকান নৌবাহিনীর মধ্যে অবস্থান নেয়দুষ্ট আমেরিকানরা আশ্চর্য ও বিস্মিত, অনেক দেরি হয়ে গেছে, পশ্চাদপসরণ ছাড়া কোন বিকল্প নেই তাদেরআমেরিকান এবং ব্রিটিশ নৌবহর উভয়ই পিছু হটলরাশিয়ান সাবমেরিনগুলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকার বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীকে রক্ষা করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে করেছিল ত্বরান্বিত

আমাদের মনে রাখা জরুরী, কে আমাদের বন্ধু আর কে নয়কেউ যেন আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর দুঃসাহস না দেখাতে পারে, সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবেস্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়েছেআমরা এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নই

 

লেখক : পরিচালক (ফিন্যান্সিয়াল এইড), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়