ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

৮ মে শুরু উপজেলা নির্বাচন ॥ তৃতীয় ধাপের তফসিল ঘোষণা

বিএনপির অনেকে ভোটে

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০০:০১, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

বিএনপির অনেকে ভোটে

সারাদেশে উপজেলা নির্বাচনের প্রচার তুঙ্গে

সারাদেশে উপজেলা নির্বাচনের প্রচার তুঙ্গে। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, নির্বাচনের প্রচার ততই জোরদার হচ্ছে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রার্থী, তাদের কর্মী-সমর্থক ও স্বজনরা বিরামহীনভাবে গণসংযোগ করে ভোট প্রার্থনা করছেন। ৮ মে থেকে শুরু হয়ে ৫ জুন পর্যন্ত চার ধাপে অনুষ্ঠিত হবে ৪৯৫টির মধ্যে ৪৮১টি উপজেলার নির্বাচন। দলীয়ভাবে কাউকে প্রার্থী না করায় এবার সবখানে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছে।

বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও এ নির্বাচনযুদ্ধে অংশ নিয়েছে দলটির অর্ধশতাধিক স্থানীয় নেতা। ২৫ উপজেলায় নির্বাচন করছে জামায়াতও। নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।  
নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার, খেলার মাঠ, ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন। এবার প্রতিটি উপজেলায় প্রার্থী বেশি থাকায় ভোটব্যাংক বাড়াতে সব প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা মরিয়া। তবে নির্বাচনী প্রচারে কৌশলী বিএনপি-জামায়াত। দল দুটি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রের নির্দেশ উপেক্ষা করে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। তবে তারা প্রকাশ্যে হাঁকডাক না করে প্রচার চালাচ্ছেন চুপে চুপে। 
সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আওয়ামী লীগ এবার উপজেলা নির্বাচনে কাউকে নৌকা প্রতীক দেয়নি। প্রার্থিতা উন্মুক্ত থাকা এবং কাউকে নৌকা প্রতীক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলের স্থানীয় নেতারা যে যার মতো করে নির্বাচন করছেন। এর ফলে একই উপজেলায় আওয়ামী লীগের বেশ ক’জন করে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ায় ভোটের মাঠে কোথাও কোথাও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছেন।

ইতোমধ্যেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে ভোট প্রার্থনাও জোরদার করেছেন। কোনো কোনো এলাকায় মন্ত্রী-এমপিরা নিজেদের স্বজনদের প্রার্থী করে তাদের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করতে চাইলেও দলের কেন্দ্র থেকে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়। এর ফলে এখন আর প্রকাশ্যে কোনো মন্ত্রী নিজের পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি কাজ করতে পারছেন না। তবে তাদের কর্মী-সমর্থক ও স্বজনরা এখনো নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে এলাকায় শোডাউন করছেন।

এবার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী না দেওয়ায় অন্যান্য দল এবং দল না করা অনেক যোগ্য প্রার্থীও নির্বাচন করছেন। এ জন্য প্রতিটি উপজেলায়ই এবার প্রার্থীসংখ্যা বেশি। 
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই প্রতিটি এলাকায় সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন ও বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত কাজ করে থাকেন। এ কারণে সবাই চায় তাদের পছন্দের প্রার্থী উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হোক। তাই এ নির্বাচন সব সময়ই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। এবার অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে উপজেলা নির্বাচন। 

সারাদেশের ৪৯৫ উপজেলার মধ্যে ইতোমধ্যেই তিন ধাপে ৪২৫টি উপজেলা নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। চতুর্থ ধাপের উপজেলা নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ তফসিলও শীঘ্রই ঘোষণা করবে ইসি। তবে এ ধাপের নির্বাচন ৫ জুন হবে বলে আগেই জানিয়েছে ইসি।   
এদিকে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পুরোদমে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। যে যার পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে। আর রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও অর্ধশতাধিক উপজেলায় দলের নেতাকর্মী প্রার্থী থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এ নির্বাচনে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির রাজনৈতিক সঙ্গী জামায়াতও ২৫ উপজেলায় প্রার্থী দিয়েছে। 
দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বেশ ক’টি দল উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি সকল উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এ জন্য ব্যাপক প্রস্তুতিও নিচ্ছে দলটি। তবে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মতো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।

এ ছাড়া জাসদ (ইনু) ও ওয়ার্কার্স পার্টিসহ আরও বেশ ক’টি রাজনৈতিক দল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে তৎপর রয়েছে। এর বাইরে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন না থাকা বেশ ক’টি বাম ও ইসলামি দলও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। 
এবার প্রথম ধাপে ৮ মে অনুষ্ঠিত হবে ১৫২ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। দ্বিতীয় ধাপে ২১ মে অনুষ্ঠিত হবে ১৬১টি উপজেলায় নির্বাচন। আর তৃতীয় ধাপে ২৯ মে অনুষ্ঠিত হবে ১১২টি উপজেলার নির্বাচন। চতুর্থ ধাপে ৫ জুন অন্যান্য উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপের ১৫২টি উপজেলার মধ্যে ২২টিতে ভোটগ্রহণ হবে ইভিএমে। বাকি ১৩২টি উপজেলায় ভোট হবে ব্যালট পেপারে। আর দ্বিতীয় ধাপের ১৬১টির মধ্যে আটটি উপজেলায় ইভিএমে আর বাকি ১৫৩টি উপজেলায় ভোট হবে ব্যালট পেপারে। তৃতীয় ধাপের ১১২টি উপজেলার মধ্যে ২১টিতে ভোট হবে ইভিএমে। বাকি ৯১টি উপজেলায় ব্যালটে ভোটগ্রহণ হবে। 
বুধবার নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তৃতীয় ধাপের তফসিল অনুযায়ী ১১২টি উপজেলায় মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ ২ মে। যাচাই-বাছাই হবে ৫ মে। ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল ৬ থেকে ৮ মে। আপিল নিষ্পত্তি ৯ থেকে ১১ মে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১২ মে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ ১৩ মে এবং ভোটগ্রহণ ২৯ মে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুসারে ২৯ মে তৃতীয় ধাপে যে ১১২টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেগুলো হচ্ছেÑ ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ; নীলফামারী সদর; দিনাজপুর জেলার খানসামা, সদর ও চিরিরবন্দর; লালমনিরহাট সদর; রংপুর জেলার গংগাচড়া ও সদর; কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী, ভুরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বর; গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ।

রাজশাহী বিভাগের বগুড়া জেলার শাজাহানপুর, সদর ও শিবগঞ্জ; নওগাঁ জেলার আত্রাই ও রাণীনগর, রাজশাহী জেলার পবা ও মোহনপুর; নাটোর জেলার গুরুদাসপুর ও বড়ইগ্রাম; সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর (ইভিএম) ও চৌহালী (ইভিএম); পাবনা জেলার সদর (ইভিএম), আটঘরিয়া (ইভিএম) ও ঈশ্বরদী (ইভিএম)।
খুলনা বিভাগের যশোর জেলার সদর (ইভিএম), অভয়নগর (ইভিএম) ও বাঘারপাড়া (ইভিএম); বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলা; খুলনা জেলার কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়া; সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া ও সদর। বরিশাল বিভাগের বরিশাল জেলার গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া; পটুয়াখালী জেলার সদর, মির্জাগঞ্জ ও দুমকি; পিরোজপুর জেলার মঠবাড়ীয়া (ইভিএম) ও ভান্ডারিয়া (ইভিএম); ভোলা জেলার তজুমদ্দিন ও লালমোহন, ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া; বরগুনা জেলার বামনা ও পাথরঘাটা।
মানিকগঞ্জ জেলার সদর (ইভিএম) ও সাটুরিয়া (ইভিএম); ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা ও সদরপুর; শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা (ইভিএম) ও গোসাইরহাট (ইভিএম), নরসিংদী জেলার শিবপুর ও রায়পুরা; টাঙ্গাইল জেলার সদর, দেলদুয়ার ও নাগরপুর; মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান ও শ্রীনগর; কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, তাড়াইল, করিমগঞ্জ ও মিঠামইন।

ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া, ঈশ্বরগঞ্জ ও ত্রিশাল; জামালপুর জেলার মেলান্দহ (ইভিএম) ও মাদারগঞ্জ (ইভিএম); নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুড়ী। সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক ও দোয়ারা বাজার; সিলেট জেলার বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার; মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল; হবিগঞ্জ জেলার লাখাই, সদর ও শায়েস্তাগঞ্জ।
চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ ও বাঞ্ছারামপুর; কুমিল্লা জেলার বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, মুরাদনগর ও দেবীদ্বার; চাঁদপুর জেলার কচুয়া (ইভিএম) ও ফরিদগঞ্জ (ইভিএম); ফেনী জেলার সোনাগাজী, সদর, দাগনভূঞা; নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ, সদর ও কোম্পানীগঞ্জ; লক্ষ্মীপুর জেলার সদর; চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা, বোয়ালখালী, পটিয়া ও চন্দনাইশ; কক্সবাজার জেলার উখিয়া (ইভিএম), টেকনাফ (ইভিএম) ও রামু (ইভিএম), খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি; রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ার চর, লংগদু ও বাঘাইছড়ি। 
দেশে প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। এরপর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার ও ২০০৯ সালে তৃতীয়বার, ২০১৪ সালে চতুর্থবার এবং ২০১৯ সালে পঞ্চমবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সালে দেশে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় ৪৮৮টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ৪৫৫টির নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হয়। বাকি উপজেলাগুলোর নির্বাচন পরে অনুষ্ঠিত হয়।

২০১৯ সালের ১০ মার্চ প্রথম ধাপে ৮২টি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৮ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে ১২৩টি, ২৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে ১২২টি, ৩১ মার্চ চতুর্থ ধাপে ১০৬টি এবং ১৮ জুন পঞ্চম ধাপে ২২টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, সারাদেশে উপজেলা নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। এখন নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখতে চলছে ইসির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের দৌড়ঝাঁপ।

×