ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

ন্যাশনাল ইনভেন্টরি তৈরির পরামর্শ বিশেষজ্ঞ কমিটির

বিশ্ব হেরিটেজ স্বীকৃতির অপেক্ষায় আরও কিছু দেশী ঐতিহ্য

প্রকাশিত: ০৫:৪২, ২ ডিসেম্বর ২০১৬

বিশ্ব হেরিটেজ স্বীকৃতির অপেক্ষায় আরও কিছু দেশী ঐতিহ্য

মোরসালিন মিজান ॥ ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা। সারা দেশের মানুষ এই অর্জনে খুশি। কিন্তু স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি ইউনেস্কো বাংলাদেশের একটি সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছে। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী উপাদানগুলোকে আগে বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিতে হবে। সে লক্ষ্যে একটি ন্যাশনাল ইনভেন্টরি বা জাতীয় পরিসংখ্যানপত্র তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। সামান্য এই কাজ সম্পন্ন করা গেলে পাইপ লাইনে থাকা আরও বেশ কয়েকটি উপাদান ইউনেস্কোর স্বীকৃতি অর্জন করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। জানা যায়, মানবজাতির উল্লেখযোগ্য মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনে ২০০৩ সালে ইউনেস্কো একটি সমঝোতা চুক্তি অনুমোদন করে। সমঝোতা চুক্তির অধীনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৭১ রাষ্ট্র এই সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ২০০৯ সালের ১১ জুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। ২০১২ সাল থেকে সরকারের পক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মানবজাতির মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ইউনেস্কোতে উপাদান পাঠানো শুরু করে। ইউনেস্কোর ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, আবেদনের ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর পাঁচটি শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক। অন্যতম প্রধান শর্তÑ যে দেশের উপাদান সে দেশকে ওই উপাদানের স্বীকৃতি দিতে হবে আগে। প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করতে হবে, উপাদানটি ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে ওই দেশে স্বীকৃত। আর এ জন্য সে দেশের একটি ন্যাশনাল ইনভেন্টরি বা জাতীয় পরিসংখ্যানপত্র থাকতে হবে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ জায়গাটিতে এখনও কাজ বাকি আছে বাংলাদেশের। পূর্ণাঙ্গ ন্যাশনাল ইনভেন্টরি তৈরি হয়নি। ন্যাশনাল ইনভেন্টরি না থাকায় এবং দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ আবেদন ফাইলের কারণে গত দুই বছর বাংলাদেশর অর্জন ছিল শূন্য। ২০১৪ সালে আবেদন করেও ব্যর্থ হয় বাংলাদেশের মৌলিক সংস্কৃতির উপাদান যাত্রাপালা। প্রায় একই কারণে ২০১২ সালে ঐতিহ্যবাহী নকশীকাঁথা সুচিশিল্প সন্তুষ্ট করতে পারেনি ইউনেস্কোকে। চুক্তি অনুসারে, প্রত্যেক রাষ্ট্র তার মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপাদানের এক বা একাধিক জাতীয় পরিসংখ্যাপত্র প্রকাশ করবে। কিছুকাল অন্তর অন্তর এই জাতীয় পরিসংখ্যানপত্র পরিবর্ধন করবে। ইউনেস্কোর নীতিমালা অনুযায়ী, জাতীয় পরিসংখ্যানপত্র ইংরেজী অথবা ফরাসী ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। এই জাতীয় পরিসংখ্যাপত্র মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপাদানের নিছক তালিকা নয়। নির্বাচিত প্রত্যেক উপাদানের বিস্তারিত তথ্য ছবিসহ লিপিবদ্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রথমে ফিল্ডওয়ার্ক করতে হবে। ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমেই প্রতিটি উপাদানের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ফিল্ডওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। আইসিএইচ এক্সপার্টরা কাজটি করে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি হয়নি। ইনভেন্টরি করার জন্য ইউনেস্কো থেকে কিছু অর্থ সহায়তাও দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু ইনভেন্টরি হয়নি। জানা যায়, আপাতত এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত একটি গ্রন্থকে ন্যাশনাল ইনভেন্টরি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ২০০৭ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশের সংস্কৃতির সামগ্রিক পর্যালোচনা ১২ খ-ে প্রকাশ করে। এই সিরিজের একাদশ খ- ৬০০ পৃষ্ঠায় ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত হয়। এই খ-ের তথ্য উপাত্ত ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমে সংগৃহীত হয়। এতে বাংলাদেশের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কয়েকটি উপাদান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সংযুক্ত করা হয়েছে ছবি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গ্রন্থের এই বইটিকে ২০১২ সালে বাংলাদেশের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জাতীয় পরিসংখ্যানপত্র হিসেবে ইউনেস্কোতে উপস্থাপন করে। গ্রন্থটি রচনা করেন বিশ্বনন্দিত আমেরিকান প-িত হেনরি গ্ল্যাসি এবং তার ছাত্র বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞ ড. ফিরোজ মাহমুদ। মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং তার আগে জামদানি বুনন শিল্পের আবেদন ফাইলও প্রস্তুত করেন ড. ফিরোজ। দুটোই ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে। কীভাবে সম্ভব হলো? জানতে চাইলে জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, আমি ইউনেস্কোর সব নিয়ম ও শর্ত বুঝে মনোনয়ন ফাইল তৈরি করি। এ কারণে দুটো ফাইলের ক্ষেত্রেই চার শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু পঞ্চম শর্তটি আমদের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা ও জামদানি প্রসঙ্গে বইটিতে বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ওইসব বর্ণনা ইউনেস্কো আমলে নিয়েছিল বলেই স্বীকৃতি দিয়েছিল দুটি উপাদানকে। কিন্তু সব উপাদানের ক্ষেত্রে বইটি কাজে আসবে না। মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বইতে সামান্য বর্ণনা আছে। পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের অনুষঙ্গ হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা এসেছে। কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিশদ বইতে নেই। এ কারণে ইউনেস্কোর বিশেষজ্ঞ কমিটি পাঁচ নম্বর শর্তটি পূরণ হয়নি বলে তাদের ওয়েব সাইটে জানিয়েছিল। এ অবস্থায় শঙ্কায় পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশকে। কিন্তু শেষতক বুধবার একাদশতম ইন্টারগবর্নমেন্টাল কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্য রাখেন। সে বক্তব্যে নতুন ন্যাশনাল ইনভেন্টরি করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। এতে আশ্বস্ত হয়ে তারা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে স্বীকৃতি দান করে। এদিকে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের মনোগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ৫৭ উপাদানের একটি তালিকা প্রদান করেছে। ফিরোজ মাহমুদের মতে, এই ৫৭ উপাদানের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হলে কমপক্ষে তিন বছর ফিল্ডওয়ার্ক করতে হবে। এই ৫৭ উপাদানের জাতীয় পরিসংখ্যাপত্রের কলেবর ১,০০০ থেকে ১,২০০ পৃষ্টা হতে পারে। কাজটি দ্রুত শুরু করা গেলে বাংলাদেশ আরও অনেক স্বীকৃতি আদায় করতে সক্ষম হবে বলে মত দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জমান নূর বলেন, ন্যাশনাল ইনভেন্টরি অবশ্যই জরুরী। আমরা আপাতত প্রয়োজন মেটাতে এশিয়াটিক সোসাইটির বইটিকে ন্যাশনাল ইনভেন্টরি করেছিলাম। এর ভাল ফলও পেয়েছি। এখন নতুন ইনভেন্টরি হবে। সে লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি।