ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৯ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩১

মাস্টার মশাই

সুদীপ ওম ঘোষ

প্রকাশিত: ২০:৪৮, ৮ জুন ২০২৩

মাস্টার মশাই

আজ আমাদের স্কুলে নতুন এসেছেন মাস্টার মশাই

“আজ আমাদের স্কুলে নতুন এসেছেন মাস্টার মশাই। তোমরা মন দিয়ে সবাই ক্লাস করো।” হেড মাস্টার অনিল সরকার ছাত্র ছাত্রীদের এই বলে নতুন মাস্টারকে ক্লাসে রেখে চলে গেলেন অফিস ঘরে। 
নতুন মাস্টার মশাই চেয়ারে বসে ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 
* আজ এই স্কুলে আমার প্রথম দিন। আজ কোনো পড়া নয়। তোমাদের সঙ্গে পরিচয় করব। গল্প করবো। তোমরা খুশি তো? 
সবাই খুব আনন্দ পেল। ক্লাসজুড়ে হইচই শুরু হলো। হঠাৎই চমকে উঠলেন মাস্টার মশাই! একদম লাস্ট বেঞ্চে একটা ময়লা জামা গায়ে, মলিন মুখে একটা ছেলে বসে আছে। সে বিশেষ কিছুই করছে না। 
* তোমার নাম কি? কোথায় থাকো? 
উঠে দাঁড়িয়ে ছেলেটা আমতা আমতা করে বলল, 
* হরিপদ দাস। আমি রেল কলোনিতে থাকি। 
* বাবার নাম কি? 
* শতদল দাস। 
* তোমার মায়ের নাম? 
এবার ছেলেটা বেশ ইতস্তত করল। মায়ের নাম সে বলবে কিনা ভাবছে! 
আবার মাস্টার মশাই বলল, তোমার মায়ের কি নাম?
* লিলি দাস 
হঠাৎই চোখমুখ অন্ধকার হলো মাস্টারের। মাথা ঘুরছে। জলের বোতল থেকে জল খেল। ছাত্রছাত্রীরা সবাই অবাক হয়ে গেল। 
তারা বলল, ‘স্যার আপনার কি শরীর খারাপ করছে? হেড স্যারকে কি ডাকব? ’ 
* না না। আমি ঠিকই আছি। তোমরা সবাই চুপচাপ বসো। চিৎকার করো না। 
একটু পরে আবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল, 
* তোমার বাবা কি করেন? 
* আমার মা আছে। আমার সাথেই থাকে। বাবা কোথায় থাকে আমি জানি না। বাবাকে আমি কখনও দেখিনি। মা বলে বাবা বিদেশ থাকে। 
ছেলেমেয়েরা হো হো করে হেসে উঠল হরিপদের কথা শুনে। মাস্টার মশাই সবাইকে থামিয়ে দিলেন। আবার শুরু করল হরিপদ। 
* মা বাবুদের বাড়ি কাজ করে। 
 নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারলেন না মাস্টার মশাই। কোনরকম শেষ করলেন ক্লাস। যাওয়ার সময় ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, 
* ছুটি হলে অবশ্যই আমার সঙ্গে একবার দেখা করবে। আমি টিচার্স রুমে থাকব। 
মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ছেলেটা। হেড স্যারের কাছে গিয়ে শরীরটা খারাপ লাগছে, বলল মাস্টার মশাই। হেডস্যার ডাক্তার ডাকার কথা বলল। মাস্টার মশাই বলল, ডাকতে হবে না, রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। গতকাল রাতে ঘুম হয়নি, নতুন জায়গা। 
বসে বসে হরিপদের কথা ভাবতে লাগল মাস্টার মশাই। সে যেটা ভাবছে তাহলে সেটাই, কোন ভুল নেই! সবটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে হরিপদের মাকে দেখলে। একদম একই রকম দেখতে! পুরনো স্মৃতি আজ খুব মনে পড়েছে মাস্টার মশাইয়ের। সেই সঙ্গে বুকের ভিতরে একটা অজানা আতঙ্ক ও কাজ করছে। এই স্কুলে আসা কি তাহলে অভিশাপ হলো! সবকিছু জানাজানি হলে সমাজে তো মুখই দেখাতে পারবে না। দরকার নেই আর খোঁজখবর নেওয়ার। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে যদি কেউটে বেরিয়ে যায়। একই নাম তো কতজনের হয়, আবার এটাও ভাবল মাস্টার মশাই। কিন্তু হরিপদকে দেখতে তো.. 
এটা প্রাইমারি স্কুল, হরিপদ চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। এই বছরটা কোনমতে পার করে দিতে পারলেই তো আর সেভাবে চাপ থাকবে না। নানান রকম কথা ভাবতে ভাবতে মাস্টার মশাই এটাও ভাবল, আজ এত বছর হয়ে গেলো যখন কোন সমস্যা হয়নি, তাহলে আজও আর হবে না। সত্যিই যদি সমস্যা হওয়ার হতো, এতদিন হতো। একবার দেখা করবেই হরিপদের মায়ের সঙ্গে। মনস্থির করেই ফেলল মাস্টার মশাই। এরই মধ্যে শরীর কেমন আছে খোঁজ নিয়ে  গেছেন অন্য শিক্ষকরা। 

স্যার বলুন, 
মাস্টার মশাই তাকিয়ে দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে হরিপদ। 
* ক্লাস শেষ? 
* হুম 
* আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে? 
* কেন স্যার, আমাদের বাড়ি কেন যাবেন? আমি তো পড়াশোনা ঠিকঠাক করছি। 
গাছ থেকে পড়ল হরিপদ। 
* না না, একটু অন্য দরকার আছে। তোমার কোন ভয় নেই। 
* এখন মা বাড়ি আছে কিনা জানি না। চলুন যেতে যেতে এসে যাবে। 
হরিপদকে রাস্তায় দাঁড়াতে বলে, হেড স্যারের থেকে বিদায় নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেল মাস্টার মশাই। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছলো একটা বস্তিতে। রেলের জমিতে ছোটছোট ঘর করে ত্রিশ চল্লিশটা পরিবার আছে। এগুলো ঘর বলা যায় না, ঘুমটি। 
* স্যার আপনি একটু দাঁড়ান। আমি দেখছি। মা মনে হয় ঘরেই আছে। 
হরিপদ ঘরে ঢুকে গেল। ওর মাথা নিচু করে যেতে হবে না, কিন্তু বড় মানুষদের মাথা নিচু করে যেতেই হবে। মাস্টার মশাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো, প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে আশপাশে। কিছুটা দূরে তাসের আসর বসেছে। ঘরের সামনে দিয়ে রেল লাইন। একদম অসাস্থ্যকর একটা পরিবেশ। 
‘স্যার, এই আমার মা’  
তাকিয়ে দেখলো মাস্টার মশাই, সামনে দাঁড়িয়ে খুব পরিচিত একজন মানুষ। খুব বেশি অবাক হয়নি মাস্টার মশাই। যদি খুব ভুল না হয়, ওর ধারণাই ছিল এমন একজনকেই সে দেখতে চলেছে। যে তার খুব পরিচিত। সামনের মানুষটা ভূত দেখার মতো দেখল মাস্টার মশাইকে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। একটা সময় খুবই কাছের একটা মানুষ যখন দূরে চলে যায়, কোন কারণ ছাড়াই আবার হঠাৎই কাছে চলে আসে ধূমকেতুর মতো তখন বোধহয় এমনই হয়। কোন ভাষা থাকে না। কিভাবে শুরু হবে, কে শুরু করবে কিছুই তখন মাথায় আসে না। হরিপদ মায়ের এই আচরণে ভীষণ অবাক হলো । 
* আপনি! এখানে? 
* আমি তোমার ছেলের স্কুলে আজ থেকে জয়েন করেছি। 
* তা এখানে কী মনে করে?
* সব কিছু এখানেই জানতে চাইবে? ঘরে যেতে বলবে না? 
* আপনার মতো একজন মহান মানুষকে কিভাবে আমার এই বস্তির ঘরে বসতে দেব তাই ভাবছি। আসুন,
একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করে বলল ভদ্রমহিলা। 
‘মা আমি খেলতে যাচ্ছি। স্কুল থেকে খেয়েছি।’ বলেই ছুটে চলে গেল হরিপদ। মাথা নিচু করে ঘরের ভিতরে ঢুকলো মাস্টার মশাই। অপরিসর একটা ছোট্ট ঘর। এটাকে ঘর বলা যায় কিনা তা নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক চলতে পারে। অগোছালো ঘরের জিনিসপত্র। বেশ উঁচু করে একটা তক্তপোশ পাতা, যাতে নিচে সব জিনিসপত্র রাখা যায়। বেশ কষ্ট করে উঠে বসলো মাস্টার মশাই। 
* এখানে কতদিন আছো? 
* অনেক বছর। হরিপদর বয়স যত, ততদিন। 
* কবে বিয়ে করলে তুমি? মৃদু হাসল মহিলাটি। তারপর বিরক্তি নিয়ে বলল, 
* ঐ লোক দেখানো বিয়ের কথা আর মনে করতে চাই না। 
* তোমার স্বামী কোথায়? 
* জেলে। 
ভীষণ অবাক হল মাস্টার মশাই। তোমার ছেলে বলল,  ‘বাবা বিদেশ থাকে।’ 
* আমার ছেলে সেটাই জানে। 
* জেলে কেন তোমার স্বামী? 
* আপনি শুনে কী করবেন! 
* তুমি আমার সঙ্গে এমন কেন করছ? 
* আমি আর পুরনো কথা মনে করতে চাইছি না। 
* আজ এত বছর পর তোমার সঙ্গে দেখা হলো। আমার সব কিছু জানতে ইচ্ছা করছে। তোমাকে দিনের পর দিন আমি কত  খুঁজেছি। 
* সব সময়ই আমার পিছনে লাগত মাতাল শতদল। আমি ওকে পাত্তা দিতাম না। তারপর একদিন আমিই ওকে বলি বিয়ে করব। আমি জানি ও দুশ্চরিত্র মাতাল। আমার তখন আর কিছুই করার ছিল না। বাধ্য হয়েই বিয়ে করলাম।
বাড়ি থেকে পালিয়ে একটা মন্দিরে বিয়ে করলাম। দুদিন পরেই  পুলিশ অ্যারেস্ট করে শতদলকে। খুুনের মামলায় অ্যারেস্ট হয়। 
* তুমি এখন কী করো? 
* যা করতাম। যেটা ছাড়া আমি অন্য কিছুই পারি না। 
লোকের বাড়ির এঁটো বাসন মাজা। 
* এত বছরে একটুও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করোনি কেন?
* আপনাকে বিরক্ত করতে চাইনি তাই। 
আপনার পরিবারে কোন অশান্তি হোক এটা আমি কোনদিন চাইনি। তাই এতো দূরে চলে এসেছিলাম। কেউ যেন আমাকে খুঁজে না পায়। 
* অনেকটা আমার মতো দেখতে হয়েছে তোমার ছেলের। 
* সন্তান তো বাবার মতো দেখতে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। 
চুপ করে গেল মাস্টার মশাই। তারপর বলল, 
* আমি এই স্কুলে এসেছি হেড মাস্টার রিটেয়ার্ড হবে কিছুদিন পর। তারপর আমি স্কুলের হেড মাস্টার হবো। 
* সেতো খুব ভালো খবর। 
* আমি তাহলে তোমার বৌদিকে এখানে আনবো না।   সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি যাব। 
* আপনার খাওয়া দাওয়ার খুব অসুবিধা হবে। আপনি নিয়ে আসুন বৌদিকে কোন অসুবিধা হবে না। 
* কেন, তুমি তো আছো। আমার রান্না করে দেবে। 
* মাপ করবেন। আমার অনেকগুলো বাড়ির কাজ। আমি সময় পাব না। 
* আপনার মেয়ে কেমন আছে? আমার হরিপদর থেকে ও একবছরের বড়।
* ভালো আছে। তোমার দেখছি সব কিছুই মনে আছে। আমি হরিপদর সব দায়িত্ব নিতে চাই। 
* আমি ওকে যেভাবে মানুষ করছি সেভাবেই করব। কারো সাহায্য আমি চাই না। 
* আমার তো কর্তব্য আছে। আমি ওর বাবা। আমি তো বাইরের লোক নই। 
* আজ যদি আমার সঙ্গে আপনার দেখা না হতো, তাহলে আপনার কর্তব্য কোথায় থাকত? 
* বিশ্বাস করো আমি এত বছর কত জায়গায় তোমাকে খুঁজেছি কিন্তু পাইনি। 
* আপনি চাননি ও পৃথিবীর মুখ দেখুক। আপনার একটা সমাজে মানসম্মান আছে। আপনি একজন মাস্টার। তাই আমি লোক দেখানো বিয়ে করেছিলাম এক শয়তানকে। আপনার কাছে গিয়ে তো কোনদিন স্ত্রীর মর্যাদা চাইনি। 
* আমাকে ক্ষমা করো লিলি। আমি অপরাধী। 
* আমি আপনাকে তো দোষারোপ করিনি। আপনার জায়গায় আমি থাকলেও একই কাজ করতাম। আর আপনাকে তো আমি কখনও কোন সমস্যায় ফেলিনি। 
* তোমার মতো মেয়েরা যারা মুখ বুঝে কষ্ট সহ্য করতে পারে বলে আজও পৃথিবীতে আমাদের মতো মানুষেরা মাথা উঁচু করে চলতে পারে। 
* আপনি বৌদি আর মেয়েকে এখানে আনুন, কোন অসুবিধা হবে না। আমি কোন অসুবিধা করব না। আমার উপর সেই ভরসা রাখতে পারেন। আমি সন্তানের দাবি নিয়ে স্ত্রীর দাবি নিয়ে আজ পর্যন্ত আপনার সামনে দাঁড়াইনি আগামীতেও দাঁড়াবো না। কথা দিলাম। 
* আজ এত বছরে সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। আমার মেয়ে মানুুষ হচ্ছে একভাবে আর আমার ছেলে এই ভাবে মানুষ হবে? 
* সবার কপালে তো সবকিছু থাকে না। আমি যেভাবে পারি ওকে মানুষ করব। আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে ও চোর ডাকাত হবে না। আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও ওকে মানুষ করব। ওর শরীরে তো আপনার রক্ত। আপনার কোন সাহায্য এত বছর যখন নেইনি, আর আজও নেব না। 
* আমার অনুরোধ তুমি তাহলে রাখবে না?
* আমি পারবো না। আপনি এখন আসতে পারেন। আমি কাজে যাব। 
* আমাকে তুমি তাড়িয়ে দিচ্ছ? 
কোন কথার উত্তর দেয় না লিলি। 
চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শতদল রায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাঁটতে লাগলেন। মেয়েটা অন্য ধাতুতে গড়া। নিচু জাত হলে কী হবে মনটা অনেক উঁচু। যেকোন ভদ্রলোকের মেয়েদের থেকেও। 
শতদল রায়ের স্ত্রী বাচ্চা হওয়ার সময় বাপের বাড়ি ছিল। বাড়িতে একাই থাকত শতদল। লিলি সকালে এসে রান্না করে বাসন মেজে দিয়ে যেত। লিলি ঘরের কাজ করার সময় অনেকদিন দেখেছে দাদাবাবু শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনদিন পাত্তা দেয়নি লিলি। যৌবনে পরিপূর্ণ শরীর লিলি বেশ বুঝতে পারত সামলে রাখা খুব কঠিন। শতদল রায় স্ত্রীর অবর্তমানে একদিন লিলির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বারবার অনুরোধ করার পর লিলি বুঝেছিল দাদাবাবুর এই ক্ষুধা আজকের নয়, অনেক দিনের জমানো। এতদিন আগলে রাখা যৌবন বিভিন্ন মানুষরূপী পশুদের হাত থেকে সে রক্ষা করে রেখেছিল । একজন নিচু জাতের কাজের মেয়ের কুমারিত্ব নষ্ট হয়েছিল সমাজের একজন শিক্ষিত মানুষের হাতে। সেদিন পরিতৃপ্তি দিয়েছিল মেয়েটা সমাজের ভদ্র শিক্ষিত মানুষটাকে। একটা সময় তৃপ্তি দিতে দিতে মনের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেফিল সে শতদলকে। গর্ভে সন্তানের কথা জানালে শতদল নষ্ট করতে বলেছিল। লিলির বাবা মা কেউই ছিল না। ছোটবেলায় মারা গেছে। বস্তির একটা ঘরে মামা মামির সঙ্গে থাকতো। অন্য জায়গায় ভালো কাজ পেয়েছে বলে চলে যায়। মামা মামির সঙ্গেও কোন যোগাযোগ রাখে না। প্রথম প্রথম খুব ভয় পেয়েছিল শতদল, লিলি যদি কোন সমস্যা করে! শশুরের একমাত্র মেয়ে সব সম্পত্তি ওদের। বড় লোকের একমাত্র সুন্দরী মেয়ে তবুও কেন ভালো লেগেছিল বস্তির মেয়েটাকে সেটা কি ছিল শুধু শরীরের খিদে! শতদল বুঝতে পারেনি। 
নতুন যে বাড়িতে থাকবে শতদল হাঁটতে হাঁটতে সেখানে উপস্থিত হলো। আগামী সপ্তাহে এই বাড়িতে স্ত্রী মেয়ে নিয়ে আসার ইচ্ছা আছে। কিন্তু এখন অন্য রকম চিন্তা করছে লিলিকে দেখে। রাতে বাড়িতে ফোন করে খোঁজখবর নিল। জায়গাটা খুব সুন্দর মনোরম পরিবেশ। একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে শতদল। লিলির মতো মেয়েরা কোনদিন প্রতিবাদ করে না। শত কষ্টেও এরা মুখ বুঝে সবকিছু সহ্য করে। পাশেই হোটেল থেকে রাতের খাবার আসলো। যে কদিন সবকিছু ঠিকঠাক না হচ্ছে, এভাবেই চালাবে বলে মনস্থির করল শতদল। সারাদিনের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে সেই হোটেল থেকে খাবার দিয়ে গেল। খেয়ে স্কুলে গেল শতদল। 
আজ স্কুলে আসেনি হরিপদ। স্কুল ছুটির পর শতদল ভেবেছিল খোঁজ নিতে যাবে। শেষে আর যাওয়া হয়নি। সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না শতদল স্ত্রী মেয়েকে এখানে নিয়ে আসবে কিনা। জীবনের এতটা বছর পর যদি নতুন করে কালবৈশাখীর ঝড় ওঠে ওর জীবনে, এলোমেলো হয়ে যাবে সব। দৃঢ় বিশ্বাস আছে লিলির উপর কিন্তু তবুও! হরিপদকে যে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেবে পড়াশোনা করার জন্য, সেটাও সম্ভব না। লিলি মেনে নেবে না। এতদিন পর আবার একটা আতঙ্ক কাজ করতে শুরু করেছে শতদলের মনে। সেদিন রাতে ঠিকমতো ঘুম হলো না শতদলের। 
আজও স্কুলে আসেনি হরিপদ। এবার একটু অবাক হলো শতদল। অসুস্থ হতে পারে। স্কুল ছুটির পর হাঁটতে হাঁটতে সেই রেল কলোনিতে গেল সে। চমকে উঠলো, দুদিনের মধ্যে সেই ঝুপড়িতে অন্য লোক! লিলি ওর ছেলেকে নিয়ে কেরালা চলে গেছে। এখান থেকে অনেক লোক কাজ করতে যায় কেরালায়। অনেকদিন থেকে ওকে যেতে বলে ও। যায় না ছেলের পড়াশোনার জন্য। গতকাল রাতে একটা দল যাচ্ছিল কেরালায়। সবকিছু নিয়ে এই ঘর ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর আস্তে আস্তে আবার হাঁটতে শুরু করল । 
পকেট থেকে মোবাইল বার করল। 
‘হ্যালো, তুমি যব গুছিয়ে রেখো। আমি শনিবার যাচ্ছি। সোমবার সকালেই তোমাদের নিয়ে চলে আসব। সোনা কী করছে?’  
ফোন রেখে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন মাস্টার মশাই। মুখে হালকা একটা হাসি খেলা করে গেল, যেটা এই পৃথিবীতে কেউই দেখতে পেল না।

×