ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সহকর্মীর সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে, যা আছে আইনে

প্রকাশিত: ১৬:১৭, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সহকর্মীর সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে, যা আছে আইনে

সহকর্মীর সঙ্গে প্রেম 

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা সময় সহর্কমীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেটা দেশে যেমন ঘটে, তেমনি পৃথিবীর নানা দেশেও হয়। এ ধরনের পরিস্থিতির যাতে উদ্ভব না হয়, সেজন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কিছু বিধিনিষেধ বা নিয়ম-কানুন রয়েছে।

সরকারি চাকরিতে যা আছে 

সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের বিয়ে বা প্রেমের সম্পর্কের বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের আচরণ বিধিমালায় কোনও কিছু বলা নেই।

তিনি জানান, দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধর্মীয় এবং দেশের আইন অনুযায়ী বিয়ের যে বিধিবিধান আছে তা অনুসরণ করে ঊর্ধ্বতন বা অধস্তন যেকোনো সহকর্মীকে বিয়ে করতে পারেন। এজন্য অনুমোদন দরকার হয় না।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, বিয়ে বা প্রেমের সম্পর্কের বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের জন্য আলাদা কোনও নিয়ম নেই।

তিনি জানান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৯৭৯ সালের আচরণ বিধিমালা আছে। যেখানে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না তা বলা আছে। কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়ে কিছু বলা নেই। তবে নৈতিকতা পরিপন্থী যদি কোনও কাজ কেউ করে, তাহলে সেটি অপরাধ সমতুল্য হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বলেন, এছাড়া বিবাহ, প্রণয়- এগুলো বিষয়ে কিছু বলা নেই। এখন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী একজন মেয়েকে ভালোবাসতে পারে। সেটা আপত্তি সেই। কিন্তু আরেক জনের স্ত্রীকে উনি ভালোবাসবেন। এটা তো নৈতিকতা পরিপন্থী।

এছাড়া কারও সঙ্গে কোনও ধরনের আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক তৈরি করা। পরে তা পূরণ না করে সম্পর্ক থেকে সরে যাওয়ার মতো ঘটনাও প্রতারণা ও নৈতিকতার পরিপন্থী। একইভাবে স্ত্রী থাকা অবস্থায় অধস্তন কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করাটাও নৈতিকতার পরিপন্থী। 

দেশে এ ধরনের ঘটনা অনেক সময় সামনে আসে জানিয়ে তিনি বলেন, একজন কর্মকর্তার অধীনে থাকা কোনও কর্মকর্তার সঙ্গে যদি তার সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি বিবাহিত হলে তার স্ত্রী এ বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করলে তদন্ত করা হয়। অভিযোগের সত্যতা পেলে ওই নৈতিকতার অবক্ষয়ের জন্য তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পরকীয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং তার স্ত্রী যদি অভিযোগ তুলে নেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ প্রত্যাহার করা হয়।

এ কে এম শহীদুল হক বলেন, অভিযুক্তের শাস্তি নিয়ে আমরা আর আগাই না। কিন্তু তাকে ওয়ার্নিং দিয়ে রাখি। যদি ভবিষ্যতেও এ ধরনের কিছু হয়, তাহলে সেটা অমার্জনীয় অপরাধ হবে। আর যদি অভিযোগ না পাওয়া গেলে কিছু হয় না।

তবে সহকর্মী ছাড়া বাইরের কোনও নারীও যদি পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, সেক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত করা এবং ব্যবস্থা নেয়া হয় বলে জানান তিনি।

বেসরকারি চাকরিতে যা আছে 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. আক্কাস আলী জানান, দেশে বেসরকারি সংস্থাগুলোতে সহকর্মীদের মধ্যে বিয়ে বা প্রণয়ের সম্পর্কের বিষয়ে তেমন কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম নেই।

তিনি বলেন, একাডেমিক ক্ষেত্রে বা বই-পুস্তকে এ ধরনের কোনও বিধি বা চর্চার বিষয়ে আলোচনা নেই। তবে একেকটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করে।

উদাহরণ হিসেবে শিক্ষকতা পেশার বিষয়টি তুলে ধরে ঢাবি অধ্যাপক বলেন, এই পেশায় কোনও শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ানোর নিয়ম নেই। তবে সেটি যদি উভয়পক্ষের সম্মতিতে ঘটে, তাহলে সেখানে বাধা দেয়ারও কিছু নেই।

এই পেশায় বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়ে আক্কাস আলী বলেন, এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনও নিয়ম নেই। তবে এ ধরনের সম্পর্কে সবসময়ই নিরুৎসাহিত করা হয়। যারা এই সম্পর্কে জড়িত, তাদের স্বামী বা স্ত্রী যদি কোনও ধরনের অভিযোগ করেন; তাহলে সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান কিছুই করতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ অভিযোগ করেন। অন্তত একজনকে কমপ্লেইন করতেই হবে।

বেসরকারি ব্যাংক সিটি ব্যাংকের হেড অব এইচআর অপারেশন্স হাসান এমডি লাভলু বলেন, সাধারণভাবে এ প্রতিষ্ঠানে সহকর্মীদের মধ্যে বিয়ের অনুমোদন রয়েছে। এ নিয়ে নিষেধাজ্ঞা নেই।

তিনি বলেন, তবে বিয়ের আগে যদি তারা এমন কোনও কর্মকাণ্ড করেন, যাতে প্রতিষ্ঠানের সুনামের উপর আঘাত আসে; তাহলে সেটিকে বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়।

হাসান এমডি লাভলু বলেন, কারও পার্সোনাল ম্যাটারে সিটি ব্যাংক কখনই কোনও ইন্টারফেয়ার করে না। যতক্ষণ পর্যন্ত ডিরেক্টলি সিটি ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, এমন কোনও কাজ না করে।

এক্ষেত্রে যদি জড়িত ব্যক্তিদের স্বামী-স্ত্রীরা এ বিষয়ে অভিযোগ করেন, তাহলে প্রাথমিকভাবে তাদের সতর্ক করা হয়। এরপরও যদি একই ধরনের ঘটনা ঘটে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর নিয়ম কী? 

গুগলের এক মুখপাত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে অন্টারপ্রেনার ডটকম নামের ওয়েবসাইটে বলা হয়, গুগল সহকর্মীদের মধ্যে রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে তোলাটা কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে যার কাছে কাজের জবাবদিহিতা করতে হয়, এমন কর্মীর সঙ্গে তার অধস্তন কর্মীর সম্পর্ককে নিরুৎসাহিত করা হয়।

সবশেষ ২০১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, গুগল সব ভাইস প্রেসিডেন্ট বা এর চেয়ে উচ্চ পদমর্যাদার কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছে, তারা যাতে অফিসের মধ্যে কোনও সম্পর্ক গড়ে উঠলে তা যদি স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে; তাহলে সেই বিষয়ে কোম্পানির জেনারেল কাউন্সেল বিভাগ বা পিপলস অর্গানাইজেশন বিভাগকে অবহিত করেন।

বিশ্বের সুপরিচিত ই-কমার্স কোম্পানি অ্যামাজন অফিসে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি না হলে সহকর্মীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে কোনও শক্ত রীতি অনুসরণ করে না। যেমন-ম্যানেজার যদি অধীনস্থ কোনও কর্মচারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সেটি তাকে প্রকাশ করতে হবে। তবে কোম্পানিটির মধ্যে অনেক কর্মীই নিজেদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।

ফেসবুকের নিয়মের মধ্যে রয়েছে-একজন কর্মচারী সহকর্মীকে একবার মাত্র সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিতে পারবে। এর বেশি নয়। মূলত কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধে পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এমন নিয়ম করা হয়েছে।

ভারতে কী নিয়ম রয়েছে? 

প্রতিবেশী দেশ ভারতে সাধারণত বিয়ের বিষয়টি বিভিন্ন ধর্মে নিজস্ব আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। কিন্তু সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্যে নানা পরিস্থিতি উদ্ভূত হওয়ার পর সেটি ওই রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৫ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের একটি ঘটনার কথা। ভারতের ইকনোমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে উল্লেখ করেন, উত্তরপ্রদেশ সরকারের বিধান অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রথম স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে আগে থেকে সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

উত্তরপ্রদেশের কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে তাকে চাকরিচ্যুত করার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট ‘প্রমাণিত অসদাচরণের’ কারণে চাকরিচ্যুতর সিদ্ধান্তের পক্ষে রায় দেন। পরে সেই মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ালে সর্বোচ্চ আদালতও তার বিরুদ্ধে রায় দেন।

এছাড়া জম্মু ও কাশ্মীরের সরকারি চাকরি বিধির ২২ ধারা অনুযায়ী, কোনও সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী জীবিত আছেন, তিনি সরকারের অনুমোদন ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না। আর সরকারের অনুমোদন পেতে হলে তাকে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি দেখানোর নিয়ম রয়েছে।

 

এস

×