ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ভয়াবহ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সঙ্গী পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকল আরোহীর মৃত্যু

প্রেসিডেন্ট রাইসি নিহত

জনকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:২০, ২১ মে ২০২৪; আপডেট: ১৬:৪৮, ২২ মে ২০২৪

প্রেসিডেন্ট রাইসি নিহত

ইব্রাহিম রাইসি ও আমির আব্দুল্লাহিয়ান

হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আব্দুল্লাহিয়ান এবং দেশটির আরও সাতজন ঊর্ধ্বতন নেতা নিহত হয়েছেন। রবিবার ইরান-আজারবাইজান সীমান্তের আরাস নদীতে নির্মিত একটি বাঁধ উদ্বোধন করতে যান ইরানের ৬৩ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলীয়েভের সঙ্গে যৌথভাবে বাঁধটি উদ্বোধনের পর হেলিকপ্টারযোগে তাবরিজ শহরে আসছিলেন তিনি।

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই জোলাফা এলাকায় কপ্টারটি দুর্ঘটনায় পড়ে। তবে বহরের অপর দুটি হেলিকপ্টার নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে। ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে ইরানজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। আজ থেকে পাঁচদিনের শোক পালন করছে ইরান। দেশটির একাধিক সূত্র জানায়, ঘনকুয়াশার কারণে রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি হার্ডল্যান্ডিং করে। এরপর ১৯৬০ সালে নির্মিত কপ্টারটি দুমড়ে মুচড়ে যায়।

এ ঘটনা প্রকাশের পর ৪০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী, অনুসন্ধানী কুকুর এবং ড্রোন দিয়ে শুরু হয় বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কুয়াশার মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মীদের বেগ পেতে হয়। সোমবার সকালে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেওয়া একটি তুর্কি ড্রোন প্রথমে পাহাড়ের ওপরে দুর্ঘটনাস্থল শনাক্ত করে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান হোসেইন কোলিভান্দ প্রথমে বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে প্রাণের কোনো চিহ্ন মেলেনি। বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি পুড়ে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে অপর একটি সূত্র দাবি করে, দুর্ঘটনার পরও অন্তত এক ঘণ্টা বেঁচে ছিলেন রাইসি। 
ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার পৃথক শোকবার্তায় তাঁরা শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন শোকবার্তায় বাংলাদেশের জনগণ ও তার পক্ষ থেকে ইরানের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

তিনি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ও অন্য যারা নিহত হয়েছেন, তাদের শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বার্তায় এই শোকের সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে ইরানের সরকার এবং জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান। 
প্রেসিডেন্ট রাইসিকে একজন বিচক্ষণ নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী নিহতদের স্বজন ও ইরানের জনগণ যেন শোক কাটিয়ে উঠতে পারে, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ইরানের প্রেসিডেন্টের মৃত্যুতে বিশ্বের আরও দেশ ও গোষ্ঠীর নেতারা শোক ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
পুতিন ॥ রাইসির মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পরই প্রথমে শোক জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।  তিনি বলেন, সৈয়দ ইব্রাহিম রাইসি একজন অসাধারণ রাজনীতিক ছিলেন যার পুরো জীবন মাতৃভূমির সেবায় নিয়োজিত ছিল। রাশিয়ার একজন প্রকৃত বন্ধু হিসেবে তিনি আমাদের দেশগুলোর মধ্যে ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসামান্য ব্যক্তিগত অবদান রেখেছিলেন এবং তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর্যায়ে নিয়ে আসতে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
শি জিন পিং ॥ ইরানের প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম রাইসির মৃত্যুতে শোকাহত চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। তিনি বলেছেন, একজন ভালো বন্ধুকে হারিয়েছে চীন। শোকবার্তায় তিনি এ কথা বলেন।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ানের মৃত্যুতে চীন খুব দুঃখ পেয়েছে। তা জানিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ইরানের কাছে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন।
শি বলেন, রাইসি ইরানে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় ব্যাপক অবদান রেখেছেন। তিনি চীন-ইরান কৌশলগত অংশীদারিত্ব সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
এরদোয়ান ॥ তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান বলেন, আমি জনাব রাইসিকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। যিনি ক্ষমতায় থাকাকালে ইরানি জনগণ ও আমাদের অঞ্চলে শান্তির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।
নরেন্দ্র মোদি ॥ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন,  ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. সৈয়দ ইব্রাহিম রাইসির শোচনীয় মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে দুঃখিত ও মর্মাহত। ভারত-ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার অবদান সব সময় স্মরণ করা হবে। তার পরিবার ও ইরানের জনগণের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। এই শোকের সময়ে ভারত ইরানের পাশে আছে।
শাহবাজ শরিফ ॥ পাক প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফ বলেন, মহান ইরান জাতি এই শোচনীয় শোক তাদের স্বভাবগত সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবে বলে আশা করছি। প্রেসিডেন্ট রাইসি ও তার সঙ্গীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং ভ্রাতৃসম ইরানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে একদিনের শোক পালন করবে পাকিস্তান এবং পতাকা অর্ধনমিত রাখবে।
আব্দেল ফাত্তা আল-সিসি ॥ মিসরের প্রেসিডেন্ট বলেন আরব প্রজাতন্ত্র মিসরের প্রেসিডেন্ট ভ্রাতৃসম ইরানি জনগণের প্রতি তার আন্তরিক সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশ করছে আর দোয়া করছে যেন ইরানের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট ও অন্যরা সর্বশক্তিমান আল্লার রহমতে বিশ্রাম নিতে পারে, তাদের পরিবারগুলিকে ধৈর্য ও সান্ত¡না দিন। এই ভয়াবহ ঘটনায় ইরানের নেতৃবৃন্দ ও জনগণের সঙ্গে আরব প্রজাতন্ত্র মিশর সংহতি প্রকাশ করছে।
সিরিল রামাফোসা ॥ রাইসির মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। রামাফোসা বলেন, ‘একটি জাতির জন্য এটি একটি নজীরবিহীন, অকল্পনীয় মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনা। রামাফোসা রাইসিকে একজন অসাধারণ নেতা দাবি করে বলেন, তার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকা দৃঢ় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উপভোগ করে।

আনোয়ার ইব্রাহিম ॥ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন গত নভেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় প্রেসিডেন্ট রাইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সম্মান পেয়েছিলাম। তিনি তার জনগণের কল্যাণ ও জাতির মর্যাদার প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতির উদাহরণ রেখেছিলেন। ইরানি জাতি ইসলামের মূল নীতিতে নিহিত একটি গর্বিত ও সমৃদ্ধ সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে। শান্তি, ন্যায়বিচার ও উম্মাহর উন্নতির প্রতি তার নিবেদন সত্যিকারভাবে অনুপ্রেরণাদায়ী ছিল।

আমরা মালয়েশিয়া-ইরানের সম্পর্ক জোরদারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আমাদের জনগণ ও মুসলিম বিশ্বের উন্নতির জন্য একসঙ্গে কাজ করছি। আমাদের অঙ্গীকার পূরণ হবে।
হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী ॥ হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে, ইরানি জাতিকে রক্ষার জন্য আত্মত্যাগকারী শহীদদের সংগ্রাম ও ইরানের প্রতি তাদের সেবার প্রশংসা করেছে। আল্লাহকে তার রহমত দিয়ে তাদের সুখী করার জন্য ও খামেনিকে রক্ষা আহ্বান জানিয়েছে। আর ইরানকে ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে এই বিপর্যয় মোকাবেলা করার ক্ষমতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি হামাস, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে, জর্ডানের বাদশা আব্দুল্লাহ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাখতুম, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি, ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল, জাপান সরকার, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস, ইয়েমেনের হুতি প্রধান মোহাম্মদ আলি আল হুতি, কাতারের আমির শেখ তামিন বিন হামাদ আল-থানি রাইসির মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন। - খবর বিবিসি, আলজাজিরা, ইরনা ও তাসনিম নিউজ অনলাইনের।

রাইসি ও আমির আব্দুল্লাহিয়ানের মৃত্যুর খবর প্রকাশ পাওয়ার পরপরই নয়া ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মদ মোখবার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আলী বাঘেরি কানির নাম ঘোষণা করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি বলেন, রাইসি ও আব্দুল্লাহিয়ান শহীদ হয়েছেন। দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে খামেনি বলেন, আপনারা উদ্বিগ্ন হবেন না। দেশের কাজে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।

আপনারা রাইসিসহ নিহত সবার জন্য দোয়া করুন। খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি তাবরিজ শহরের জুমার নামাজের ইমাম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ আলি আল-ই হাশেম এবং পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর জেনারেল মালেক রহমাতি, কপ্টারটির চালকসহ আরও একজনের প্রাণ গেছে। তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে প্রেসিডেন্টের সুরক্ষায় নিয়োজিত ইউনিটের কমান্ডার সরদার সাইয়্যেদ মেহদি মুসাভিও রয়েছেন।

রাইসি ও অন্যদের লাশ উদ্ধার করে প্রথমে তাবরিজ শহরে নেওয়া হয়। ওই শহরে আজই ইব্রাহিম রাইসি ও অন্যদের লাশ দাফন করার কথা রয়েছে।  এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর সোমবার সকালেই জরুরি বৈঠকে বসে ইরানের মন্ত্রিপরিষদ। ওই বৈঠকেই নয়া প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম আসে। রাইসির মৃত্যুর পর হাজার হাজার মানুষ রবিবার রাত থেকেই রাস্তায় অবস্থান করেন।

এদের অনেকেই নিহতদের জন্য রাস্তায় নফল নামাজ আদায় করেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সোমবারই ইরানের নয়া প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ সময় উভয় নেতা রাশিয়া-ইরানের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জোরদারের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। এর আগে পুতিন ইরানে শোকবার্তা পাঠান। তিনি বলেন, ইরানকে যাবতীয় সহযোগিতা দিতে মস্কো প্রস্তুত। 
অত্যন্ত প্রভাবশালী রাইসিকে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কট্টরপন্থি ও ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল রাজনীতিক রাইসির সঙ্গে বিচার বিভাগ ও ধর্মীয় অভিজাতদের গভীর সংযোগ ছিল। ২০১৭ সালে তিনি প্রথম ইরানের প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হন। কিন্তু সফল হতে পারেননি।

পরে ২০২১ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ইরানের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজাভি খোরসান প্রদেশের প্রধান শহর মাশহাদে ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন রাইসি। তবে তার প্রকৃত নাম সৈয়দ ইব্রাহিম রাইসুলসাদাতি। তিনি ১৫ বছর বয়সে বিখ্যাত কওম মাদ্রাসায় ভর্তি হন তিনি। তারপর থেকে ওই সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট ওলামার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

বয়স ২০ ছাড়ানোর পর তিনি পরপর কয়েকটি শহরে অভিশংসক হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে উপ-অভিশংসক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে রাজধানী তেহরানে যান। ১৯৮৩ সালে তিনি মাশহাদের জুমা নামাজের ইমাম আহমেদ আলমলহোদার কন্যা জামিলেহ আলমলহোদাকে বিয়ে করেন।

তাদের দুই কন্যা সন্তান আছে। ১৯৮৮ সালে পাঁচ মাসের জন্য তিনি বিচার বিভাগীয় একটি কমিটির অংশ ছিলেন। এই কমিটি রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদ- কার্যকর করার ধারাবাহিক এক প্রক্রিয়ার তদারকি করেছিল। এই ভূমিকার কারণে তিনি ইরানের বিরোধী দলগুলোর মধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে তিনি তেহরানে আসেন। পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির অধীনে রাইসির ক্রমপদোন্নতি হতে থাকে। ২০১৬ সালের ৭ মার্চ তিনি ইরানের দ্বিতীয় জনবহুল শহর মাশহাদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুদান সংস্থা আস্তান কুদস রাজাভির চেয়ারম্যান হন। এই পদ ইরানের ক্ষমতার বলয়ে তাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

২০২২ সালের শেষ দিকে ইরানের নীতি পুলিশের হেফাজতে তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যু হলে গণঅসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটে। কয়েক মাস ধরে ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলতে থাকে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি এসে বিক্ষোভ স্তমিত হয়ে আসে, কিন্তু এর মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে কয়েকশ মানুষের মৃত্যু হয়। এই অস্থিরতায় ভূমিকা থাকার অভিযোগে সাতজনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

ওই দাঙ্গা দমনে রাইসি কঠোর পদক্ষেপ নেন। রাইসি আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতেও জড়িয়ে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর তাতে স্বাক্ষর করা অন্য পক্ষগুলো সেটি রক্ষা করতে অসমর্থ হওয়ায় রাইসি ক্ষুব্ধ হন। প্রতিবাদে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিস্তৃত করার ঘোষণা দেন, কিন্তু তারা পারমাণবিক বোমার বিষয়ে আগ্রহী নন বলে জানান।
গাজায় ইসরাইলের নির্বিচার হামলা নিয়ে দেশটির সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। এ সময় ইসরাইলের সঙ্গে চলা অচলাবস্থার মধ্যে দেশকে নেতৃত্ব দেন রাইসি। ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের ওপর ইসরায়েলের বর্বরোচিত হামলার নিন্দা করতে থাকে ইরান, পাশাপাশি ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ হিসেবে পরিচিত ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা ইসরায়েল ও এর পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠে।

এপ্রিলের প্রথমদিকে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানের কনসুলার ভবনে চালানো এক হামলায় দেশটির শীর্ষ কমান্ডার ও তার সহকারীসহ সাতজন নিহত হয়। এ হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে ইরান। ইরান ইসরাইলে পাল্টা হামলা চালাবে, এমন সম্ভাবনাকে সামনে রেখে পুরো বিশ্ব প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে রাইসির উচ্চারিত প্রতিটি বাক্যকে নিরীক্ষণ করতে থাকে। এরপর ১৫ এপ্রিল ইসরাইলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। 
এদিকে ইরানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইসরাইলের এক কর্মকর্তা সোমবার বলেন, রাইসির মৃত্যুর ঘটনায় তার দেশের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা এর সঙ্গে জড়িত নই।
তবে ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা এম কে আভিগদর লিবারম্যান বলেন, রাইসির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে, ইসরাইল এমনটা আশা করে না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি কোনো বিষয় নয়। এ ঘটনা ইরানের প্রতি ইসরাইলের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কারণ ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা দেশটির নীতি নির্ধারণ করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট যে নিষ্ঠুর লোক ছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা তার জন্য একফোঁটা অশ্রু ফেলব না।
কপ্টারটি সম্পর্কে যা জানা গেল ॥ প্রেসিডেন্ট রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বেল-২১২ মডেলের বলে বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। এই মডেলটি ইউএইচ-১এন ‘টুইন হুয়েই‘-এর বেসামরিক সংস্করণ, যেটি বিশ্বব্যাপী সরকারি-বেসরকারিভাবে বহুল ব্যবহৃত।
১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে মূল ইউএইচ-১ ইরোকুইসের আপগ্রেড হিসেবে কানাডিয়ান সামরিক বাহিনীর জন্য বিমানটি তৈরি করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বেল হেলিকপ্টার। আপগ্রেড মডেলের ডিজাইনে একটির বদলে দুটি টার্বোশ্যাফট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে এর বহন ক্ষমতা বাড়ে।
মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষণ নথি অনুসারে, নতুন মডেলের এই হেলিকপ্টারটি ১৯৭১ সালে প্রস্তুত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই মডেলটির ব্যবহার শুরু হয়।
ইউটিলিটি হেলিকপ্টার হিসেবে এই মডেলটি মানুষ বহন, এরিয়াল ফায়ার ফাইটিং গিয়ার মোতায়েন, কার্গো বহন ও অস্ত্র মোতায়েন করাসহ সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য উপযোগী। রবিবার বিধ্বস্ত হওয়া এই মডেলটি ইরানে সরকারি ব্যক্তিদের বহনে ব্যবহৃত হয়। 
বেল হেলিকপ্টারের সর্বশেষ সংস্করণ সুবারু বেল-৪১২ পুলিশের প্রয়োজন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে কিংবা সৈন্য পরিবহনসহ আরও কাজের উপযোগী বলে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সির টাইপ সার্টিফিকেশন নথি অনুসারে, এটি ক্রুসহ ১৫ জনকে বহন করতে পারে।
বেল-২১২ মডেলের হেলিকপ্টারটি ব্যবহার করা বেসামরিক সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানি কোস্ট গার্ড, যুক্তরাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ফায়ার বিভাগ, থাইল্যান্ডের জাতীয় পুলিশ। ইরানের কতগুলো সরকারি সংস্থা এই মডেলটি ব্যবহার করে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে ফ্লাইটগ্লোবালের ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড এয়ার ফোর্সেস ডিরেক্টরির তথ্য বলছে, ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর এই মডেলের মোট ১০টি হেলিকপ্টার রয়েছে।
ফ্লাইট সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বেল-২১২ মডেলের হেলিকপ্টারটির সবচেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত হেলিকপ্টারটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে বিধ্বস্ত হয়।
ফাউন্ডেশনের তথ্য থেকে আরও জানা গেছে, রবিবার যেভাবে বেল-২১২ হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়, এর আগে একইভাবে ২০১৮ সালে এই মডেলের একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে চারজন নিহত হন।

×