ছবি: বাম থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক, আহত বাসচালক এবং মো. জাবের।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলকারী সাভার পরিবহনের এক বাস চালককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহার বিরুদ্ধে। এসময় বাসে থাকা এক নারী যাত্রীও আহত হন। এছাড়া এ ঘটনার মিটমাট শেষে ওই বাসচালক গন্তব্যে ফেরার সময় দলবল নিয়ে তাকে পুনরায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে ৫১ ব্যাচের আইবিএর শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের সদস্য মো. জাবেরের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর দুইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে শিক্ষকের মারধরের ঘটনা ঘটে। এছাড়া বিকাল সাড়ে চারটার দিকে ছাত্রদল নেতা কর্তৃক মারধরের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, সাভার পরিবহনের একটি বাস মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় ডেইরি গেট এলাকায় আইবিএ শিক্ষক পলাশ সাহার ব্যক্তিগত গাড়িটি পেছনের দিক থেকে আসছিল। পলাশ সাহার গাড়িটি বাস ক্রস করে বামে বাঁক দিলে বাসের সাথে ধাক্কা খায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই শিক্ষক বাসটি থামিয়ে চাবি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। চালক চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে শিক্ষক তার হাতে থাকা হেলমেট দিয়ে বাসের জানালার কাঁচ ভাঙচুর করেন। এসময় কাঁচের আঘাতে চালকের মাথা ফেটে রক্তপাত হয় এবং বাসে থাকা এক নারী যাত্রীর আঙুল ভেঙে যায় ও মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে।
পরে আহত ড্রাইভার এবং যাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তবে যাত্রীর আঙ্গুল ভেঙ্গে যাওয়ায় এক্স-রে করানো এবং উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর বাবা। এছাড়া বিষয়টি ধামাচাপার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে অভিযুক্ত শিক্ষক ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নারী যাত্রীর পিতা বলেন, আমাদের বাসটি থামানো ছিল। শিক্ষক নিজের গাড়ি ব্যাক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান, এতে বাসের কোনো দোষ ছিল না। তিনি (শিক্ষক) পরিচয় দেওয়ার পর আমরা তাকে শান্ত হতে বলি। কিন্তু তিনি উগ্র আচরণ শুরু করেন এবং হেলমেট দিয়ে বাসের কাঁচ ভেঙে ফেলেন। এতে আমার মেয়ের মাথা ফুলে গেছে এবং আঙুল ভেঙে গেছে। ড্রাইভারের মাথাও ফেটে গেছে।
তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষক সমাজের কারিগর। তার আচরণে মানবতা ও সমঝোতা থাকার কথা থাকলেও তার মধ্যে চরম আক্রোশ ও উগ্রতা দেখেছি। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই এবং বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিলাম।
এ ঘটনায় নিজের দোষ স্বীকার করে সহযোগী অধ্যাপক পলাশ সাহা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটের সামনে এক বাসচালক বাসটি রাস্তার মাঝবরাবর রেখেছিল। আমি তাকে অতিক্রম করার সময় একটি চলন্ত পিকাপ থেকে নিজেকে সেভ করতে ব্রেক করলে আমি পরে যাই। পরে বসে উঠে আমি ড্রাইভারকে বারবার বলেছি বাস সরাতে, কিন্তু সে শোনেনি। একসময় রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। শিক্ষক হিসেবে এটা আমার করা ঠিক হয়নি। আমি আমার ভুলটা স্বীকার করছি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। পরে আমাদের সহকর্মী এই ঘটনার ভুক্তভোগীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে বিষয়টি মিটমাট করে ফিরে যাওয়ার পথে আইবিএর শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক সদস্য মো. জাবেরের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী ওই বাসচালককে আরেক দফায় মারধর করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাস ড্রাইভার বাস চালক আতিক চৌধুরী।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে করা হলে দেখা যায়, বাসচালক ফিরে যাওয়ার সময় জাবের একটি বাইকে করে এসে বাসের সামনে দাঁড়ায়। পরে সে সহ আরও কয়েকজনকে বাসে উঠতে দেখা যায়। তবে তার সাথে থাকা বাকিদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
তিনি বলেন, আমি ফিরে যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছিলাম। এসময় ৪/৫ জন শিক্ষার্থী এসে আমাকে অনেক মারধর করে। উনারা আমাকে কয়েকবার মেরছে। আমি কিছুই করিনি, তবু আমাকে ডেকে নিয়ে সবার সামনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে আমি ভুক্তভোগী হয়েও অপরাধীর মতো দাঁড়িয়েছি। চিকিৎসার জন্য সামান্য টাকা দিয়েছে, কিন্তু এরপরও ছাত্ররা আমাকে পথে পথে আটকায়, হুমকি ও মারধর করে। এখানে শ্রমিক হিসেবে আমাদের কোনো সুরক্ষা নেই।
তবে মারধরের বিষয় অস্বীকার করেন জাবের। তিনি বলেন, বাইকের চাবি হারিয়ে গিয়েছিল। সেটি খুজতে গিয়েছিলাম।
বাসচালককে পুনরায় মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, এ বিষয়ে এখনও কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, সহযোগী অধ্যাপক পলাশ সাহার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় মদতের অভিযোগে স্ট্রাকচার কমিটির তদন্ত চলমান আছে। এছাড়া ছাত্রদল নেতা জাবের হলের ছাদে মদ ও গাঁজা সেবনকালে ধরা পড়েছিলেন। এ ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম চলমান আছে।
এ.এইচ








