ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সেই মীর জুমলার ফটক এখন নগর পর্যটনের অনুষঙ্গ

ভুতুড়ে দেওয়ালের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল বটগাছের চারা

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:১০, ২৮ মে ২০২৪

ভুতুড়ে দেওয়ালের ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল বটগাছের চারা

দীর্ঘ অবহেলার শিকার মীর জুমলার ফটক সংস্কারের পর নগর পর্যটনের নিত্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে

এই কিছুদিন আগের কথা। পাশ দিয়ে দিব্যি হেঁটে যেত মানুষ। মীর জুমলার প্রাচীন ফটকটির দিকে তবু একবার চোখ তুলে তাকাত না। চোখের আর দোষ কী! ফটকটিই সব আকর্ষণ হারিয়ে কংক্রিটের জীর্ণ পরিত্যক্ত জঞ্জালে পরিণত হয়েছিল। ক্রমাগত খসে পড়ছিল পলেস্তরা। ফাটলের ভেতর থেকে হৃষ্টপুষ্ট বটগাছের চারা উঁকি দিচ্ছিল। শক্ত মোটা শেকড় বিনা বাধায় সা¤্রাজ্য বিস্তার করছিল এখানে।

এভাবে দীর্ঘ অযতœ-অবহেলার শিকার মুঘল চিহ্নখানা নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথ ধরেছিল। কিন্তু এখন সে স্থাপনা ঘিরেই রাজ্যের কৌতূহল! পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কারও চোখ এড়িয়ে যাবে, না, সে সুযোগ নেই। বরং দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন এখানে। মুগ্ধ চোখে দেখছেন তারা। সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। ছবি তোলা হচ্ছে দেদার। সব মিলিয়ে নগর পর্যটনের নিত্য অনুষঙ্গ এখন মীর জুমলার ফটক। 
ফটকের ইতিহাসটিও মীর জুমলা নামের সঙ্গেই জুড়ে আছে। মুঘল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার সুবেদার ছিলেন মীর জুমলা। তিনিই এ গেট নির্মাণ করেছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত ঢাকা কোষের তথ্য অনুযায়ী, স্থাপনাটি ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে নির্মাণ করা হয়। ঢাকার সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং স্থলপথে শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্য নিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। 
ইতিহাসবিদদের অভিমত, মুঘল আমলে বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে এ তোরণ ব্যবহার করা হতো। তখন এর নাম ছিল মীর জুমলার গেট। এর অনেক পরে ময়মনসিংহ গেট বা ঢাকা গেট হিসেবে পরিচিতি পায়। গেটটি রমনায় প্রবেশ করার জন্য ব্যবহার করা হতো বলে রমনা গেট নামেও চিনতেন অনেকে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট অনুসারে এ তোরণ এবং আশপাশের জায়গার নাম মীর জুমলার গেটই আছে। অপর এক তথ্য অনুযায়ী, ইসলাম খাঁর আমলে রমনা অঞ্চলে বাগে বাদশাহী নামে মুঘল উদ্যান ছিল। বাগে বাদশাহীর প্রবেশপথে ছিল দুটি স্তম্ভ। পরে তা পুনর্র্নির্মাণ করা করা হয়। 
অবশ্য ভিন্ন মত দিয়েছেন ইতিহাসের আরেক দিকপাল এ. এইচ. দানী। তোরণ পরীক্ষা করে তিনি বলে গেছেন, এগুলো মুঘল আমলে তৈরি হয়নি। কারণ স্তম্ভ দুটির গড়ন ইউরোপীয় ধাঁচের। মূল শহরের সঙ্গে রেসকোর্সকে যুক্ত করার জন্য রেসকোর্সের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি রাস্তা তৈরি করেন তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস। একই সময় রাস্তার প্রবেশমুখে এ দুটি স্তম্ভ তৈরি করেন তিনি, যা এখনো দৃশ্যমান।

সে যাই হোক, ফটকটি যে বহু প্রাচীন যুগ কালের সাক্ষী সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। অতীতের সেই গৌরবগাথা তুলে ধরতেই নতুন করে পুরনোকে সামনে আনা হয়। উদ্যোগটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ইতিহাসবিদ ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের দাবির সঙ্গে একমত হতে মোটেও সময় নেননি।

গত বছরের ২৪ মে ফটক সংস্কার কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি। তার পর থেকে বিরামহীনভাবে চলতে থাকে। ২৪ জানুয়ারি সংস্কারকৃত গেট উদ্বোধন করা হয়। তখন থেকেই বিস্ময় দৃষ্টি নিয়ে সবাই তাকাতে শুরু করেন মীর জুমলার ফটকের দিকে। এর পর যত দিন গেছে আকর্ষণ বেড়েছে বৈ কমেনি। বর্তমানে প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ মুঘল স্থাপনা দেখতে আসছেন।

সকাল-দুপুর কিংবা বিকেলে তো বটেই, সন্ধ্যায়ও দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিচ্ছে মীর জুমলার গেট। রাতে মিষ্টি আলোয় অন্যরকম আভিজাত্য নিয়ে এটি উদ্ভাসিত হয়। ফলে দর্শনার্থীরা স্থাপনাটিকে ঘিরে থাকেন। 
গত কিছুদিন মীর জুমলার গেট এলাকায় অবস্থান করে দেখা যায়, প্রতি মুহূর্তে পর্যটকরা আসছেন এখানে। মুস্তফা মহসিন অন্তু নামের এক তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বগুড়া থেকে এসেছিলেন তিনি। বললেন, এসেছিলাম জাতীয় জাদুঘর দেখতে। এর পাশেই মীর জুমলার গেট।

সংস্কারের পর এটি দেখে আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটাও সম্ভব! এই এলাকাটি আশপাশের যে কোনো এলাকার চেয়ে এখন আকর্ষণীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 
দল বেঁধেও অনেকে এখানে আসছেন। পাঁচ জনের একটি দলে ছিলেন সাদিকুর রহমান। তিনি বলছিলেন, আমরা সবাই বন্ধু। ঢাকার প্রাচীন ঐতিহ্য খুব পছন্দ করি। যে কোনো বন্ধের দিনে তাই দল বেঁধে পুরান ঢাকায় চলে যাই। একই নেশায় ঢাকা গেট দেখতে এসেছি। ভেঙেচুড়ে কী অবস্থা হয়েছিল এটার! এখন দেখে মন ভরে গেল। 
দলের আরেক দসস্য ইমরান এ জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ধন্যবাদ জানান। আরও যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনা দখল হয়ে গেছে, অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে সেগুলো উদ্ধার ও সংস্কার করার দাবি জানান তিনি। 
এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন হওয়ায় সব সময়ই শিক্ষার্থীরা এখানে আসেন। সুন্দর বসার ব্যবস্থা আছে। বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে বসে গল্প করেন। আড্ডা জমান।

তেমনই এক আড্ডা থেকে কিছু সময়ের জন্য বের হয়ে শাহীন নামের এক শিক্ষার্থী বলছিলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এভাবেও একটি কাজ করা যায়, আমাদের চিন্তায় ছিল না। মীর জুমলার গেটের আদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনেক কাজ করার আছে বলে মনে করেন এই তরুণ। 
একই প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বলেন, ঢাকা অনেক প্রাচীন শহর। কত যে ইতিহাসের সাক্ষী। পৃথিবীর সব উন্নত সভ্য দেশ নগরের ইতিহাস সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। আমরা পারি না। তবে মেয়র তাপস এগিয়ে আসায় নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ সম্ভাবনাকে আরও সফল করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

×