ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২৪ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১

ডাকবাংলোয় ক্যাম্প খুলে যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেই

​​​​​​​আবদুল্লাহ আল নোমান, রানীশংকৈল

প্রকাশিত: ২২:৫০, ২৪ মার্চ ২০২৩

ডাকবাংলোয় ক্যাম্প  খুলে যুবকদের  অস্ত্র প্রশিক্ষণ  দেই

.

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান। ১৯৪৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের পদমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি আর্মি ইঞ্জিনিয়ার্স কোর দিনাজপুরে যোগদান করেন। সেখান থেকে পানিপথে পাকিস্তানের রিসালপুর ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। প্রশিক্ষণ শেষে পোস্টিং হয় ওয়ান ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন মুলতানে। কিছুদিন থাকার পরে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পাক সরকার তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিলে গ্রামের বাড়ি পদমপুরে চলে আসেন। মনের ভেতর জ্বলতে থাকে প্রতিশোধের আগুন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকি হায়েনারা নিরীহ বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর বাঙালিরা স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। পাক সেনাদের প্রতিরোধ করার জন্য রানীশংকৈলে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ২৫ মার্চ কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার বাঙালি সৈনিকদের হত্যা এবং নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি অগ্নিসংযোগের খবর সারাদেশে প্রচার হলে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে রানীশংকৈল ডাকবাংলোয় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খুলে আমি সাধারণ যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতে থাকি। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার, মুজাহিদদের যুদ্ধের জন্য দিনাজপুরে পাঠাই। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে পাকিসেনাদের কোচল, চাপসা ডাবরী বিওপি ক্যাম্প অপারেশনে করি এবং অবস্থানরত পাকসেনাদের আমরা হত্যা করি। কোথাও পাকসেনারা আত্মগোপন করে আছে শুনলেই সেখানে প্রশিক্ষণরত জওয়ানদের নিয়ে অপারেশন চালাই। হঠাৎ জানতে পারি, পাকসেনারা ভারি অস্ত্র নিয়ে আমাদের দখল করা ক্যাম্পগুলো দখল করে নিচ্ছে, আমাদের যোদ্ধারা তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারছেন না। তখন ওপরের নির্দেশে সকল মুক্তিসেনাকে ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য যেতে বলা হলে আমি আমার ক্যাম্পে অবস্থানরত জওয়ানদের ভারতে আশ্রয় নিতে বলি। আমি যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ায় পিস কমিটির লোকজন পাকসেনাদের খবর দিয়ে আমাকে ধরার জন্য গ্রামের বাড়ি পদমপুরে আক্রমণ চালায়। আমি খবর পেয়ে বাড়ি থেকে পূর্বদিকে আত্মগোপনের জন্য দৌড় দেই।

আমার পিছু ধাওয়া করে ২০-৩০ জন পিস কমিটির লোক অস্ত্রধারী পাকসেনারা। আমি জীবন বাঁচাতে সামনের নদীতে ঝাঁপ দেই। তারা পেছনে পেছনে এসে আমাকে পানিতেই গুলি করতে থাকে। আমি তারপরেও নিজেকে বাঁচানোর জন্য নদীর পাড়ে সাঁতরে উঠি। নদীর পশ্চিমপাড় থেকে তারা আমাকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। একটি গুলি এসে আমার ডান পায়ের হাঁটুর ওপরে লাগে। আমি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাই। সে সময় তারা আমাকে ওই অবস্থায় হাত ধরে টানতে টানতে আমার বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যায় এবং বাড়িঘর ভাঙচুর চালায়। সেখান থেকে আমাকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে দুজন দুপাশে ধরে রানীশংকৈল বাজারে নিয়ে আসে। আমি তখন জ্ঞানশূন্য অবস্থায় ছিলাম। পরবর্তীতে লোকজনের কাছে শুনি সেদিনের ঘটনা। সেখান থেকে আমাকে পীরগঞ্জ আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানকার লেফটেন্যান্ট ক্যাম্প কমান্ডার দিনাজপুর হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করলে আমাকে হত্যা না করে দিনাজপুর হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সেখানকার মেজর আমাকে প্রশ্ন করে- তুমি কতজন পাঞ্জাবি লোক হত্যা করছো? আমি মৃত্যুর ভয়ে হত্যার কথা স্বীকার করিনি। আমাকে আরও বলে, তুমি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোক হয়ে আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলে কেন? আমি জানাই, আমি বাঙালি, আমরা স্বাধীনতা চাই। পরবর্তীতে আমার বিষয়টি রংপুর সিকিউরিটি ব্রাঞ্চে জানায়। সেখান থেকে উত্তরে আমাকে রংপুরে পাঠানোর কথা বলা হয়। সেখানে নিয়ে আমাকে এবং আরও চারজন তৎকালীন ইপিআর জওয়ানকে নির্মমভাবে নির্যাতন চালায়। কিছুদিন রাখার পর আমাদের রংপুর জেলখানায় নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখে। প্রতি রাতেই / জনকে করে বাইরে নিয়ে গিয়ে সারারাত নির্মম নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের মাত্রা এতই ছিল যে, আমরা তাদের নিজেদের গুলি করে একবারেই হত্যা করতে বলি। তারা গুলি না করে আরও বেশি নির্যাতন করতে থাকে।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা জানান, একটি বিশেষ সূত্রে জানতে পারি, আমাদের বিরুদ্ধে এমএলআর আইনে নয়টি ধারায় বিচার হবে যার প্রত্যেকটি আইনেই মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে। নভেম্বরে রংপুরে মুক্তিযোদ্ধারা বিমান আক্রমণ করলে আমরা ৮০০ জনের মতো কয়েদি প্রধান গেট ভেঙে বের হয়ে পালিয়ে যাই। আমি ইপিআরের ইয়াকুব মোল্লা একসঙ্গে হেঁটে দিনাজপুরের বিরল হয়ে ভারতের তরঙ্গপুর হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাই। সেখানে গিয়ে দেখি, কেউ নেই। সবাই মিত্রবাহিনীসহ যুদ্ধের জন্য বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। আমরা তখন আবার সীমান্ত পার হয়ে পীরগঞ্জ উনিশগাঁওয়ে আসি, এসে গেরিলা কমান্ডার সিরাজের দেখা পাই। সিরাজের কাছে আমি যুদ্ধের জন্য অস্ত্র চাইলে সে আমার শরীরের অবস্থা দেখে আমাকে অস্ত্র না দিয়ে ইনফরমারের কাজ করতে বলে। দুইদিন পরেই সংবাদ পাই যে, পাকসেনারা সবাই প্রাণের ভয়ে সৈয়দপুর পালিয়ে গেছে। তারপরে সিরাজ আমাকে নির্দেশ করে যে, তুমি আগে বাড়িতে গিয়ে বাবা, মায়ের সঙ্গে দেখা কর। আমি সেখান থেকে নিজ বাড়িতে আসি আমাকে দেখে মা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। সকলেই জানে আমি মারা গেছি। আমি জীবিত আছি শুনে গ্রামবাসীসহ সকল আত্মীয়-স্বজন বাসায় ছুটে আসে আমাকে দেখার জন্য। পরে তিন ডিসেম্বর সিরাজ বাহিনীর নেতৃত্বে রানীশংকৈল থানা শত্রুমুক্ত হয়।

×