ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

ঐতিহাসিক নালন্দা মহাবিহার

টুটুল মাহফুজ

প্রকাশিত: ০২:০১, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২

ঐতিহাসিক নালন্দা মহাবিহার

.

নালন্দা মহাবিহার সাত শতকে প্রসিদ্ধি অর্জনকারী বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতিক কেন্দ্র। বিহারের পাটনা থেকে ৮৫ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে এবং আধুনিক রাজগিরের ১১ কিমি উত্তরে অবস্থিত বড়গাঁও গ্রামের কাছে নালন্দার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বাংলার ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থিত হলেও নালন্দা মহাবিহারের সঙ্গে এ অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং পড়াশোনার জন্য এখানে কয়েক বছর অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁর সময় থেকেই নালন্দা বিশিষ্ট পুরোহিতগণের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণের ৩০ বছরের মধ্যে ইৎসিঙ (৬৭৫ থেকে ৬৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বছর এখানে শিক্ষাগ্রহণ করেন) সহ কমপক্ষে ১১ জন কোরীয় ও চৈনিক তীর্থযাত্রীসহ বিশিষ্টজনেরা নালন্দা ভ্রমণ করেন বলে জানা যায়। কনৌজের হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৭ খ্রি.) নালন্দা বিহারের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। হিউয়েন সাং-এর বিবরণের ভিত্তিতে কানিংহাম কর্তৃক শনাক্তকৃত নালন্দায় ১৮৭২ সালের দিকে কয়েকটি প্রাথমিক উৎখনন পরিচালিত হয়। পরে ১৯১৫-১৬ থেকে ১৯৩৫-৩৬ সালের মধ্যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং জে.এ পেইজের নেতৃত্বে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া খনন পরিচালনা করে এবং মঠ, মন্দির স্থাপত্যসহ অন্যান্য স্থাপনা উন্মোচিত হয়। নালন্দার বিহারসমূহ সাধারণ ধরনের। এর সাধারণ নক্সা সমকোণী চতুর্ভুজাকৃতির যা উন্মুক্ত বারান্দাসহ বাইরের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ দ্বারা ঘেরা। বিহারটির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল একদিকে পুরোহিতদের সারিবদ্ধ কতগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মঠ, অপরদিকে মন্দির, সুসজ্জিত ভবন ও কোর্ট। উভয় দিক প্রাচীরবেষ্টিত হয়ে সমগ্র বিহারটি গঠন করেছিল। মন্দির এবং মঠসমূহ ছিল দুটি সমান্তরাল সারিতে, মন্দিরগুলো পূর্বাভিমুখী এবং মঠগুলো ছিল পশ্চিমাভিমুখী। এগুলোর মাঝের বিস্তৃত জায়গায় কখনও কখনও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মন্দির গড়ে উঠত।
নালন্দার পন্ডিতগণ ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত। হিউয়েন-সাং এবং ই-ৎসিঙ উভয়েই নালন্দার শিক্ষকগণের উচ্চ প্রশংসা করেছেন। হিউয়েন-সাং যখন নালন্দায় ছিলেন তখন বাঙালী বৌদ্ধ ভিক্ষু শীলভদ্র ছিলেন এর অধ্যক্ষ। শীলভদ্র ছিলেন সর্বপ্রথম বাঙালী বৌদ্ধ শিক্ষক যিনি বাংলার বাইরে এরূপ দুর্লভ সম্মান অর্জন করেন। হিউয়েন-সাং নিজেও শীলভদ্রের একজন ছাত্র ছিলেন। পরবর্তী পাল রাজাদের দলিলপত্রেও বিভিন্ন প্রসঙ্গে নালন্দার উল্লেখ পাওয়া যায়।
চার থেকে নয় শতক পর্যন্ত নালন্দা শিক্ষা-দীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল। নালন্দায় প্রাপ্ত বৈন্যগুপ্ত, বুধগুপ্ত এবং কুমারগুপ্তের মাটির সীলগুলো চতুর্থ থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এর সমৃদ্ধির বড় সাক্ষ্য। যদিও গুপ্ত সম্রাটগণের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং হিউয়েন সাং-এর বর্ণনানুযায়ী শকারীদিত্য নামে একজন গুপ্ত সম্রাট ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা এবং যদিও এ তথ্যকে সত্য বলে মনে হয় না, তথাপি বিশাল এ প্রতিষ্ঠানের সবচাইতে সমৃদ্ধিশালী যুগ ছিল ছয় থেকে নয় শতক পর্যন্ত। এর কারণ বাংলার পাল রাজাগণের অকুণ্ঠ ও উদার পৃষ্ঠপোষকতা যাঁরা শিক্ষা-দীক্ষার এই মহান প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বড় দান অনুমোদনের মাধ্যমে গুপ্তদের ঔজ্জ্বল্যকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।
পাল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত এলাকায় অবস্থানের কারণে বাংলার সঙ্গে নালন্দার বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সংযোগ। এটি কম গৌরবের বিষয় নয় যে, প্রাচীন যুগের শিক্ষা-সংস্কৃতির একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র নালন্দার ওপর বাংলার প্রভাববলয় বিস্তৃত হয়েছিল। একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলার সংস্কৃতি ও শিক্ষা এ কেন্দ্র থেকে লাভবান হয়েছে।