ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

জাতীয়

প্রকৃতির অনন্য অলঙ্কার কদম ফুল

বর্ষার দূত- বর্ণ গন্ধ সৌন্দর্য্যে অতুলনীয়

প্রকাশিত: ২৩:১৫, ২২ মে ২০২২

বর্ষার দূত- বর্ণ গন্ধ সৌন্দর্য্যে অতুলনীয়

সবুজ পাতার মধ্যে সাদা-হলুদ মঞ্জরি --------- জনকণ্ঠ ফিচার --------- গ্রীষ্মের প্রখর তাপপ্রবাহের মধ্যেই বর্ষারানী তার বিপুল সমারোহ নিয়ে সেজে উঠেছে। শহর-গ্রামের দিকে বর্ষা ঋতুর উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বাদল-দিনের অনন্য ফুল কদম। এসেছে কদম ফুলের দিন। আসছে আষাঢ়। বৃষ্টি যদিও থেমে থেমে ঝরেছে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠে। তবু বাংলার বর্ষার নিজের মাস আষাঢ়। আর আষাঢ়ের বর্ষা-প্রকৃতির অনন্য অলঙ্কার যেন কদম ফুল। কদম যেন বর্ষা ঋতুর প্রতীক। এবারের গ্রীষ্মের আগুন নিয়ে এসেছিল শহর-গ্রামে সবখানে। সেই অগ্নিদগ্ধ দিন পেরিয়ে আসছে কাক্সিক্ষত বৃষ্টিধারার আষাঢ়। গাছের পাতায়, টিনের চালে কিংবা ছাদের রেলিং ছুঁয়ে রিমঝিমিয়ে বৃষ্টি পড়ার দিন। বর্ষা মানেই কর্দমাক্ত রাস্তা আর গাঁয়ের দুরন্ত ছেলেদের কদম ফুল নিয়ে হৈ-হুল্লোড়। তাইতো বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,/ আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান...’- কদম্ব ছড়িয়ে আছে বাংলার আনাচে-কানাচে। তবে নাম যাই হোক, বাংলার বাদল দিনের কদমের কথা রবীন্দ্রনাথের চেয়ে সুন্দর করে আর কে-ই বা বলতে পেরেছে? যদিও সেই প্রথম কদম ফুল আজ আর বাদল দিনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে না। দিনপঞ্জির হিসেবে বর্ষা আসার আগেই সে প্রস্তুত হয়ে থাকে বাদল দিনের আগমনী বারতা নিয়ে। গ্রাম বাংলার প্রকৃতির বর্ষা ও কদমের নিগূঢ় ছবি এঁকে রেখে গেছেন পল্লী কবি জসীমউদ্দীন। তার ‘পল্লী বর্ষা’ কবিতায় লিখেছেন- কাহার ঝিয়ারী কদম্ব-শাখে নিঝ্ঝুম নিরালায়, ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ম্ফুট কলিকায়! বাদলের জলে নাহিয়া সে মেয়ে হেসে কুটি কুটি হয়, সে হাসি তাহার অধর নিঙাড়ি লুটাইছে বনময়। সত্যি বাংলার বনে বনে বর্ষার বারিধারায় কদম ফুলের রেণু হয়তো এখনও ভেসে যায়। গাছে গাছে বর্ষার বাহারি ফুলের সঙ্গে ভিজে আরও দ্বিগুণ স্নিগ্ধতায় হেসে ওঠে কেয়া-কদম। কদম গাছ ছাড়া কি গ্রাম হয়! সেখানে এরা অবহেলা-অনাদরেই বাড়ে ও বাঁচে। একসময় লোকালয়ের অগভীর বন-বাদাড়ে অঢেল ছিল। এখন সংখ্যায় কমে গেলেও বর্ষা এলেই কদম গাছের দিকে চোখ না ফেলে উপায় থাকে না। গাছজুড়ে একটা সুষম সমন্বয়ে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকে হলদে শরীরে সাদা সাদা বৃষ্টির মতো পাপড়ি নিয়ে বর্ষার কদম। গফরগাঁও সরকারী কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলম জনকণ্ঠকে জানান, কদম বা কদম্ব গাছ তিন প্রকার- নীপকদম্ব, মহাকদম্ব, ধারাকদম্ব (গিরিকদম্ব, কেলিকদম্ব)। এর বৈজ্ঞানিক নাম নিওলামাকিয়া কাদাম্বা এটি রুবিয়েসি গোত্রের একটি উদ্ভিদ। এর অন্য নাম বৃত্তপুষ্প, মেঘাগমপ্রিয়, কর্ণপূরক, ভূঙ্গবল্লভ, মঞ্জুকেশিনী, ললনাপ্রিয়, পুলকি, প্রভৃতি। কদম্ব বহু শাখাবিশিষ্ট বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। বাংলাদেশ, ভারত, এর আদি নিবাস। এটি অজস্র ফুলের সমারোহ। এর একটি মঞ্জরিতে প্রায় আট হাজার ফুল বিন্যস্ত থাকে। কদম গাছের শাখায় পাতার আড়ালে ফুটে থাকা অজস্র কদম ফুলের সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ কারণেই কদম ফুলকে বলা হয় বর্ষার দূত। কদম ফুলের আরেক নাম হলো নীপ। গাছের উচ্চতা ৪০ থেকে ৫০ ফুট। কদম গাছ দীর্ঘাকৃতির। কারুসরল, উন্নত, ধূসর থেকে প্রায় কালো এবং বহু ফাটলে রুক্ষ্ম, কর্কশ। পাতা বিরাট, ডিম্বাকৃতি, উজ্জ্বল সবুজ, তেল চকচকে এবং বিন্যাসে বিপ্রতীপ। বসন্তে কচিপাতা আসে উচ্ছ্বাস নিয়ে। বসন্তের শুরুতে গাছে নতুন পাতা গজায় এবং শীতে পাতা ঝরে যায়। এগুলো বাদুড় ও কাঠবিড়ালির প্রিয় খাদ্য। কদম গাছের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার সম্পর্ক সুবিদিত। আর কদম ফুল নিয়ে আমাদের আকুলতার নমুনা পাওয়া যায় প্রাচীন বৈষ্ণব সাহিত্য থেকে লোকগাথা, পল্লীগীতি ও রবীন্দ্রকাব্য পর্যন্ত। ভানুসিংহের পদাবলি, বৈষ্ণব পদাবলি ও শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনে নানাভাবে নানা আঙ্গিকে এসেছে কদম গাছের কথা। বহুল উপমায় বিভূষিত তার গুণগাথা। কদম গাছ নিয়ে গ্রামবাংলার নানা ছড়া-কবিতাও রয়েছে। ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে কদম তলায় কে/ হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে সোনামণির বে’- এমন বহু ছড়ায় এখনও কদমের সুষমা প্রকাশ পায় মানুষের মুখে মুখে। সাধারণত আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টিতেই কদম ফোটে। আবার কখনও কখনও বৈশাখ- জ্যৈষ্ঠেও ফুটতে দেখা যায়। কদম বর্ণে, গন্ধে, সৌন্দর্য্যে এদেশের রূপসী তরুর অন্যতম। প্রস্ফুটন মৌসুমে ছোট ছোট ডালের আগায় একক কলি আসে গোল হয়ে। ফুল বেশ কোমল ও সুগন্ধী। একটি পূর্ণ মঞ্জরিকে সাধারণত একটি ফুল বলেই মনে হয়। কিন্তু বলের মতো গোলাকার মাংসল পুষ্পাধারে অজস্র সরু সরু ফুলের বিকীর্ণ বিন্যাস অতি চমৎকার। মঞ্জরির রঙ সাদা হলুদ মেশানো। সব মিলিয়ে সোনার বলের মতো ঝলমলে। বৃতি সাদা, দল হলুদ, পরাগচক্র সাদা এবং বাইরের দিকে মুখ। তৃষ্ণায় কাতর বৃক্ষরাজি বর্ষার অঝোর ধারায় ফিরে পাবে প্রাণের স্পন্দন। ঋতুবৈচিত্র্যের প্রাণ ফিরে পায় চারপাশের প্রকৃতি। প্রাণিকুলও হয়ে ওঠে সজীব ও সতেজ। কিংবা বৃষ্টির অঝোর ধারায় মেঘের বিছানা পেতে দেয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ আজও হয়ে ওঠে স্মৃতিকাতর। কদমের ফল অনেকটা লেবুর মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজ থাকে। কদম ফুল আলঙ্কারিক গাছ হিসেবে জনপ্রিয়। ফুল ভরা কদম গাছ দেখতে অসাধারণ হলেও এর আর্থিক মূল্য তেমন একটা নেই। কাঠ নরম বলে আসবাবপত্র তৈরি করা যায় না। কাঠ দিয়ে দেয়াশলাই ও বাক্সপেটরা তৈরি হয়ে থাকে।