ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

আবু আফজাল সালেহ

কবিতায় প্রেম-বিদ্রোহ ও জীবনবোধ

প্রকাশিত: ২৩:৪৯, ২৭ নভেম্বর ২০২০

কবিতায় প্রেম-বিদ্রোহ ও জীবনবোধ

মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখার আন্দোলন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বাঁকবদল দিয়েছে। সে সম্পর্কিত বহু নতুন নতুন শব্দ বা চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে। ফলে, ১৯৪৭ পরবর্তী আলাদা একটি অধ্যায় শুরু হয়েছে। কবিতা পড়লেই বোঝা যায় কবিতাটি কখন রচনা করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে সরব ছিলেন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদরা। মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, মোহাম্মদ রফিক, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখেরা সাহসী উচ্চারণ করেছেন। অনেকেই সে সময়ে স্লোগানধর্মী কবিতা রচনা করেছেন। কিছু ব্যতিক্রমীর মধ্যে কবি আবুল হাসান একজন। ‘এমন সময় আসে/বিপ্লবীর মন শুধু নয়, বনভূমি সেও বড় বেদনায়/বিদ্রোহ জমিয়ে রাখে গাছে গাছে সবুজ পাতায়। (বন্দুকের নল শুধু নয়)- এমন উচ্চারণ কবি আবুল হাসানের। এমন উচ্চারণের কবিতা তাঁর অনেক। আবার ‘আলেখ্য’ কবিতায় উচ্চারণের তীব্রতা আরও ঘন।’ চেগুয়েভারার মতো দাড়িপূর্ণ ছবি/ঠোঁট তাম্রবর্ণ আদিবাসীদের মোটা সিগারেট।/অসম্পূর্ণ যুবক এক অনস্থির/তার বন্দুকের নলে ধ্রুব আত্মশক্তি/এত তীব্র ছিল।/বাহুতে ছিল পেশিকথা ছন্দে/বেজে ওঠে রাজদ্রোহী গর্জনের কাঠ।’ দুটি কবিতাংশেই ব্যতিক্রম সুর। উপমা-অলঙ্কার ব্যবহারে নতুনত্ব। এমন কবিতা অনেক আছে। এসব কবিতায় এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি যা আগে এমন দেখা যায়নি। শক্ত শক্ত ও রক্তজবার মতো উচ্চাররণে কবি আবুল হাসান কবিতার বুনন দিয়েছেন। শুধু বুননই দেননি, শিল্পগুণে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ৪৫টি কবিতা নিয়ে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে। ১৯৭৪ সালে ‘যে তুমি হরণ করো’ নামীয় দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কবি আবুল হাসানের কবিতায় শব্দ, বাক্য ও স্বরে ভিন্নতার পাশাপাশি নান্দনিকতায় আছে। নান্দনিকতার আবহে বিদ্রোহী সুরও বাজিয়েছেন তিনি। (১) ‘... আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে,/যারা খুব হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে, যারা এঘরে ওঘরে যায়/সময়ের সাহসী সন্তান সভ্যতার সুন্দরী প্রহরী/...হয়তো যুদ্ধের নাম, জ্যোৎস্নায় দুরন্ত চাঁদে ছুঁয়ে যাওয়া,/নীল দীর্ঘশ্বাস কোন মানুষের।/সত্যই কি মানুষের?...’(রাজা যায় রাজা আসে)। (২) ‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা।/জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা।/দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনদিন।’(পাখি হয়ে যায় প্রাণ) (৩)‘...কেবল পতাকা দেখি/কেবল উৎসব দেখি,/স্বাধীনতা দেখি,/তবে কি আমার ভাই আজ/ঐ স্বাধীন পতাকা?/তবে কি আমার বীন, তিমিরের বেদিতে উৎসব?’ (উচ্চারণগুলো শোকের) কবি আবুল হাসানের কবিতায় শৈল্পিক ভাষা অনন্য। উপমা-অলঙ্কার ও চিত্রকল্প ব্যবহারে পারঙ্গমতার পাশাপাশি সার্থকতারও পরিচয়ও রেখেছেন। এখানে কবি সার্থক ও অনন্য। তাঁর কবিতা পাঠ করে মনে হয় কবিতাগুলো শুধু নির্মাণ করার চেষ্টা তিনি করেননি বরং কবিতা হয়ে উঠেছে আপনা-আপনিই। আশার পাশাপাশি হতাশার কথাও এসেছে তাঁর কবিতায়। ওনেকের মতো নস্টালজিয়াও ভুগেছেন তিনি। এমন কিছু কবিতাংশ তুলে ধরায় যেতে পারে!- (১) ‘ঝিনুক নীরবে সহো/ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও।’- কী দারুণ ব্যঞ্জনায় বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে!’-(ঝিনুক নীরবে সহো, পৃথক পালঙ্ক) (২) ‘আমি পকেটে দুর্ভিক্ষ নিয়ে একা একা অভাবের রক্তের রাস্তায় ঘুরছি/জীবনের অস্তিত্বে মরছি...।’ (অসভ্য দর্শন, রাজা যায় রাজা আসে) (৩) ‘চিকন কঞ্চির মতো ছিপছিপে রোদের ভিতরে আসি’-(বয়ঃসন্ধি, রাজা যায় রাজা আসে) (৪) ‘এইভাবে ভ্রমণে যাওয়া ঠিক হয়নি, আমি ভুল করেছিলাম।/...আমি পুষ্পের বদলে হাতে তুলে নিয়েছিলাম পাথর।/আমি ঢুকে পড়েছিলাম একটি আলোর ভেতরে, সারাদিন আর/ফিরিনি।’- (ভ্রমণযাত্রা, যে তুমি হরণ করো) (৫) ‘গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর আমিও ভবঘুরেদের প্রধান ছিলাম।/জ্যোৎস্নায় ফেরা জাগুয়ার চাঁদ দাঁতে ফালা ফালা করেছে আমার প্রেমিক হৃদয়।/... বাঘিনীর মুখে চুমো খেয়ে আমি বলেছি আমাকে উদ্ধার দাও।/সক্রেটিসের হেমলক আমি মাথার খুলিতে ঢেলে তবে আমি পান করেছি মৃত্যু’।-(গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর, যে তুমি হরণ করো) প্রেমের কবিতাতেও এনেছেন নতুনত্ব। ‘যে তুমি হরণ করো’ গ্রন্থের অনেক কবিতায় নিয়ে এনেছেন রোমাঞ্চ; প্রেম-বিরোহের দারুণ আবহ! কিছু কবিতাংশ তুলে ধরছি- (১) ‘তোমার চোখের মতো কয়েকটি চামচ পড়ে আছে দ্যাখো প্রশান্ত টেবিলে/আর আমার হাতঘড়ি/নীল ডায়ালের তারা জ্বলছে মৃদু আমারই কব্জিতে/শিশিরের মতো নম্র অপেক্ষার কষ্টগুলো ঝেড়ে ফেলেছি আমার এ্যাস্ট্রেতে...’- (প্রতীক্ষার শোকগাথা, রাজা যায় রাজা আসে) (২) ‘দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদি রাখব না আর আমার ভেতর।/যেখানে বুনব আমি তিন সারি শুভ্র হাসি, ধৃত পঞ্চইন্দ্রিয়ের/সাক্ষাৎ আনন্দময়ী একগুচ্ছ নারী তারা কুয়াশার মতো ফের একপলক তাকাবে...’(কালো কৃষকের গান, যে তুমি হরণ করো) আশার পাশাপাশি যেমন নিরাশা-হতাশা থাকে, তেমনই বৈষম্যও বিদ্যমান। নারী-পুরুষ ও ধনী-গরিব বৈষম্য সর্বত্রই বিরাজমান। কবি আবুল হোসেনের এমন বৈষম্যের ক্ষেত্রে চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে নানা কবিতায়। যেমন- (১) ‘এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া/তোমার ওখানে যাব, তোমার ভেতরে এক অসম্পূর্ণ যাতনা আছেন,/যিনি যদি আমাকে বলেন, তুই শুদ্ধ হ’, শুদ্ধ হব/কালিমা রাখব না।’-(তোমার চিবুক ছোঁব না, যে তুমি হরণ করো) (২) ‘অতটুকু চায়নি বালিকা।/অত শোভা, অত স্বাধীনতা।/চেয়েছিল আরও কিছু কম,... একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী।’-(নিঃসঙ্গতা, যে তুমি হরণ করো) (৩) ‘ছেলেটি খোঁড়েনি মাটিতে মধুর জল।/মেয়েটি কখনও পরে নাই নাকছাবি।/... ছেলেটির চোখে দুর্ভিক্ষের দাহ,/মেয়েটির মুখে কত মায়া মৌনতা;(যুগলসন্ধি, পৃথক পালঙ্ক, ১৯৭৫) কবিতায় কবি ব্যবহার করেছেন প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান, লোকজ উপাদান আর চারিপাশের উপাদান;পাখির কলকাকলি, দিনের মুখরতার চিত্রায়িত আবহের শব্দাবলি। হতাশা ও হাহাকারের ছবিও ফুটে উঠেছে আবুল হাসানের কবিতায়। ক্ষুধা নিয়ে রাজনীতি। কিন্তু এ সমস্যা নিয়ে আন্তরিক প্রচেষ্টা খুবই কমই। যা আছে তার বেশিরভাগই লোক-দেখানো। কবির কলম থেকে বের হয়েছে অমৃত শব্দাবলি। বাঙ্ময় হয়েছে তার কবিতা। যেমন ধরি-‘আমি জানি না দুঃখের কী মাতৃভাষা/ভালভাষার কী মাতৃভাষা/বেদনার কি মাতৃভাষা/যুদ্ধের কী মাতৃভাষা/শুধ আমি জানি আমি একতি মানুষ/আর এখনও আমার মাতৃভাষা, ক্ষুধা (মাতৃভাষা)। কবি আবুল হাসান (জন্ম : ৪ আগস্ট, ১৯৪৭-মৃত্যু : ২৬ নবেম্বর, ১৯৭৫)। স্বল্পসময়ের আধুনিক কবি তিনি। তিনি পেশায় সাংবাদিকও ছিলেন। তাঁর প্রকৃতি নাম আবুল হোসেন মিয়া; সাহিত্যিক নাম আবুল হাসান।সত্তর দশকের গীতল কবি হিসাবেও জনপ্রিয় তিনি। এখন সবকিছুই শিল্প; সেটা সার্থক বা ব্যর্থক যাই হোক না কেন! কবি আবুল হাসানের শিল্পবোধ দারুণ অনুভূতিময়।কবির শিল্পভাবনা এমন-‘শিল্প হল স্বাতীর হাতের ওই কমলালেবু/ লজ্জায় আনত্মুখ রোদের ফড়িং/শিল্প হলো স্বাতীর কানের রিং’ (স্বাতীর সঙ্গে এক সকাল)। কী দারুণ ভাবনা! এমন ভাবনাগুলোই বলে দেয় কবি আবুল হাসানের রুচিবোধ; তাঁর অনুভূতিগুলো কেমন!