ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

মিলু শামস

নীরদ সি চৌধুরী, ল্যুভঁ মিউজিয়াম, দ্য দা ভিঞ্চি কোড

প্রকাশিত: ২৩:৩৪, ২৪ জুন ২০২০

নীরদ সি চৌধুরী, ল্যুভঁ মিউজিয়াম, দ্য দা ভিঞ্চি কোড

মনে হচ্ছে অনেক দিন ধরে একটা দিনই যাপন করছি। দীর্ঘ একটা দিন। ‘আত্মঘাতী বাঙালী’ এবং ঞযব অঁঃড়নরড়মৎধঢ়যু ড়ভ অহ টহশহড়হি ওহফরধহ খ্যাত লেখক নীরদ সি চৌধুরীর ‘বাঙালী জীবনে রমণী’র পাখায় ভর করে উনিশ শতক ঘুরে এলাম। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের প্রচুর উদ্ধৃতি, নীরদ সি চৌধুরীর দৃষ্টিভঙ্গি, ইংরেজ ও ইংরেজী প্রভাবিত একটি নতুন সমাজের বিকাশ ও প্রবণতাসমূহ আরেকবার দেখে এলাম। উনিশ শতকের শেষ তিন দশক পর্যন্ত গান ছিল বারবনিতাদের ব্যাপার স্যাপার। ‘আমোদ ফুর্তি’ করতে পুরুষরা বাঈজীদের কাছে গিয়ে গান বাজনার আসর জমাতেন। ‘ভদ্র’ বাড়ির অন্তপুরে গানের জায়গা ছিল না। কারণ গান গেয়ে যারা পয়সা আয় করতেন সেই বাঈজীরা সমাজে ঘৃণিত ছিলেন। ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত ‘সঙ্গীত’ নিবন্ধে বঙ্কিম চন্দ্র বলেছেন, ‘কুলকামিনীরা সঙ্গীতা নিপুণা হইলে গৃহমধ্যে এক অত্যন্ত বিমলানন্দের আকর স্থাপিত হয়। বাবুদের মদ্যাসক্তি এবং অন্য একটি গুরুতর দোষ অনেক অপমানিত হইতে পারে। এতদুদ্দেশ্যে নির্মল আনন্দের অভাবেই অনেকের মদ্যাসক্তির কারণ সঙ্গীতপ্রিয়তা হইতেই অনেকের বারস্ত্রীবশ্যতা জন্মে।’ বিশ শতকের গোড়ার দিকে এই বাঈজীদের গানই গ্রামোফোন বা কলের গানের মাধ্যমে অভিজাতদের অন্দর মহলে ঢুকে যায়। যারা কণ্ঠ বিক্রি করে পুরুষদের ‘আমোদ’ দিতেন তাদেরই কণ্ঠ গ্রামোফোনে ধারণ করে ভিন্ন আঙ্গিকে বিপণনের ব্যবস্থা হয়। শ্রোতাদের বিভিন্ন টার্গেট গ্রæপের জন্য তৈরি হতে লাগল ভিন্ন স্বাদের গান। গ্রামোফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শুরুতে প্রায় সব কোম্পানি শহর উপশহর থেকে খুঁজে সম্ভাবনাময় শিল্পীদের গান রেকর্ড করার উদ্যোগ নিয়েছিল। আরও পরে প্রায় প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব ‘নির্বাচক বোর্ড’ ছিল। যেখানে থাকতেন দক্ষ গীতিকার, সুরকারসহ সঙ্গীত বিশেষজ্ঞরা। যারা প্রতিভাময় কণ্ঠ খুঁজে বের করতেন। কণ্ঠ আর কণ্ঠের গায়কী অনুযায়ী গান লিখতেন, সুর করতেন, দীর্ঘদিন অনুশীলন করাতেন। যখন তারা শিল্পীদের গানে সন্তুষ্ট হতেন কেবল তখনই ওই শিল্পীদের গান রেকর্ড করার অনুমোদন দিতেন। এ কাজের জন্য কোম্পানি তাদের বেতন দিত। এর পর এলো বাঁধা শিল্পীর প্রচলন। প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব গায়ক-গায়িকা থাকত। এক কোম্পানির গায়ক-গায়িকা অন্য কোম্পানির ডিস্কে কণ্ঠ দিতে পারতেন না। ওই গায়ক-গায়িকাদের দিয়েই নতুন গান ছাড়া হতো। কেতকী কুশারী ডাইসনের অসাধারণ বই ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ এবং ‘ভাবনার ভাস্কর্য’ -বার বার পড়া বই দুটো আবার উঠে আসছে হাতে। গত শতকের সত্তর দশক থেকে লন্ডন প্রবাসী কেতকী ‘ভাবনার ভাস্কর্য’র একটি প্রবন্ধে ইংল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থা বিশেষ করে মধবিত্ত পরিবারের নারীদের জীবন বাস্তবতার যে করুণ বর্ণনা দিয়েছেন তা অতুলনীয়। বিবিসি টেলিভিশনের ভ‚মিকার কথা বলতে গিয়ে বৃদ্ধ বয়সের নিঃসঙ্গতা মর্মস্পর্শী করে তুলে এনেছেন। নিঃসঙ্গ শিশু ও বৃদ্ধদের জীবনে টেলিভিশনের উপস্থাক, সংবাদ পাঠক পাঠিকারাই ছিলেন বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যের মতো। অবশ্য টেলিভিশন তার সে চরিত্র হারিয়েছে বহু আগে। এখন তার ভ‚মিকা বিশ্বময় বাজার ও বিপণন চক্রের দক্ষ মিডল ম্যানের। বৈচিত্র্যময় যে সব অনুষ্ঠান একা বিবিসি প্রচার করত কেবল টিভি নেটওয়ার্ক সেই সব বিষয় ভেঙ্গে প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলে আরও বিস্তৃতভাবে দেখাচ্ছে। রুচি ও প্রয়োজন মতো বাটন টিপলেই হলো। এক স্টার টিভি নেটওয়ার্কেরই কত রূপ! আমেরিকায় তার যে রূপ আফ্রিকায় তা একেবারে আলাদা। আবার আফ্রিকার সম্প্রচার পুরোপুরি বদলে যায় ইন্ডিয়ায় এসে। তখন তা ভারতীয় রুচি ও সংস্কৃতির অনুগামী। এখন তো স্টার টিভির বাংলা চ্যানেল স্টার জলসা আর জি নেটওয়ার্কের জিটিভি বাংলা চ্যানেল এ দেশের ঘরে ঘরে। জরিপ করলে হয়ত দেখা যাবে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে এ দু’চ্যানেলের দর্শক বেশি। এসব চ্যানেলের নিয়মিত দর্শকরা তা নিয়ম করেই দেখছেন এবং ক্রমশ আসক্ত হচ্ছেন। দর্শক মূলত পরিবারের গৃহিণী, গৃহকর্মী এবং বয়স্ক সদস্যরা। প্যাসিভ এন্টারটেইনমেন্ট হিসেবে টেলিভিশনের যত দুর্নামই থাক জীবনের এক বড় অংশজুড়ে এখন টেলিভিশনের অবস্থান। সুতরাং এর মানের দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। ভারতীয় নিচুমানের অনুষ্ঠানের দর্শক আসক্তি বাড়ছে, তাতে দেশের অনুষ্ঠান মার খাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ব্যবসার স্বার্থে হলেও চ্যানেল মালিকদের গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টা ভাবা উচিত। কেবল অপারেটররা ইচ্ছেমতো চ্যানেল চালাচ্ছে কিনা তার খোঁজখবরও রাখা দরকার। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা রয়েছে। আইনও আছে। স্যাটেলাইট টেলিভিশনের স্বেচ্ছাচারিতার জবাব দিতে পারে বাংলাদেশ টেলিভিশন। বাংলাদেশ টেলিভিশনই দেশের একমাত্র টেরেস্ট্রিয়াল চ্যানেল যার নেটওয়ার্ক দেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ এবং ৯২ শতাংশ এলাকায় বিস্তৃত। এ চ্যানেলের জন্য মাস শেষে অপারেটরের টাকাও গুনতে হয় না। কিন্তু সরকারী এ চ্যানেলটি জন্ম থেকে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। তবুও স্যাটেলাইট চ্যানেলের এত চাকচিক্যের পরও দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও বিটিভি দেখে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ট্রাস্ট বাংলাদেশে টিভি দর্শকদের ওপর এক মতামত জরিপ চালিয়ে দেখেছে দেশের মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগই বাংলাদেশ টেলিভিশন দেখে। জরিপে দেখা গেছে, ২০০৮ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ বিটিভি দেখেছে। ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ স্যাটেলাইট টিভির অনুষ্ঠান দেখছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনুপাতিকহারে দেখা গেছে, সারাদেশে বিটিভির মোট দর্শক ৮৪ শতাংশ। তবে বিভাগীয় অঞ্চলগুলোয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের দর্শক সংখ্যা এগিয়ে রয়েছে। এখানে স্যাটেলাইট টিভি দেখে ৭০ শতাংশ। বিটিভি দেখে ৬৬ শতাংশ। জেলা শহর বা শহরাঞ্চলে বিটিভি ও স্যাটেলাইট টিভির দর্শক সমান সমানÑ ৬৯ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে ৮৯ শতাংশ দেখছে বিটিভি এবং স্যাটেলাইট টিভি দেখছে ১৮ শতাংশ। জরিপের তথ্য অনুযায়ী বিটিভির গড়ে প্রতিদিন দর্শক ছয় কোটি ৪৪ লাখ। স্যাটেলাইট টিভির গড়ে প্রতিদিন দর্শক তিন কোটি ৭৭ লাখ। শিশুদের জন্য টেলিভিশন খুব ভাল বন্ধু হতে পারে। ইন্টার-এ্যাকশনধর্মী সৃজনশীল অনুষ্ঠান বিনোদনের সঙ্গে শিশুদের বিভিন্ন বিষয় শেখাতে পারে। গৃহিণীদের চিন্তার সূত্র তৈরিতেও টেলিভিশন ভ‚মিকা রাখতে পারে। কিন্তু টেলিভিশন তা করছে না। মিডিয়া সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করতে পুরোপুরি বাণিজ্যিক হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। একজন মেধাবী সমাজ তাত্তি¡কের নির্মোহ দৃষ্টিতে কেতকী কুশারী খুব যৌক্তিকভাবে বিষয়গুলো তুলে এনেছেন। তিনি বেঁচে আছেন কিনা জানি না। অনেক দিন তার নতুন কোন লেখা পড়িনি। টেলিভিশনের এখনকার ভ‚মিকা সম্পর্কে তার অভিমত খুব জানতে ইচ্ছে করে। ’রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ মিশ্র আঙ্গিকে লেখা। কথা সাহিত্য ও গবেষণা কর্মের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন লেখক। বইয়ের মুখবন্ধে বলছেন সেকথা- ‘যেটাকে আমরা বলি সাহিত্য সৃষ্টির তাগিদ, আর যেটাকে বলি অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধানের তাগিদ, সে দুটোতো সব সময় পরস্পর বহির্ভ‚ত নয়। যেহেতু ভাগ্যচক্রে দুটো তাগিদই আমার স্বভাবের মধ্যে বর্তমান, তাই নিজের ভিতর থেকেই জানি যে কখনও কখনও তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে একটা বড় রকমের ওভার ল্যাপ এবং তখন নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে গেলে সেই ওভার ল্যাপের প্রতি বিশ্বস্ত হতে হয়, সাহিত্যের জগৎ আর অ্যাকাডেমিক জগতের মাঝখানে যে কৃত্রিম ব্যারিকেডগুলো প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকে তাদের সরিয়ে দিতে হয়। শেষ বিচারে সব গঠন কর্মেরই মোদ্দা এপোলজি তো এই, যে এই মুহূর্তে এই জিনিসটাকে আমি ছাড়া আর কেউ এভাবে তৈরি করত না।’ বই দুটো কিনেছি তাও প্রায় বিশ বছরের মতো হয়ে গেল। যে দুজন লেখকের কথা বললাম তাদের কেউই সম্ভবত আমাদের দেশে বহুল পঠিত নন। নীরদ সি চৌধুরীর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক বইটির নাম আমি ভুল লিখেছিলাম। শুধু নাম নয়, বানানের অক্ষরে স্মল, ক্যাপিটালেও ভুল ছিল। কাল শেষ রাতে শুতে যাওয়ার আগে ঘুম চোখে পোস্ট দিয়েছিলাম, তখনি সন্দেহ হয়েছিল কিন্তু যাচাই করার সময় ছিল না। সকালে ঘুম ভাঙতে সন্দেহের তীব্র খচ খচানিতে দ্রæত যাচাই করে দেখি, যা ভেবেছি তাই। ততক্ষণে সাত ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে কিন্তু কারও কাছ থেকে ভুল সংক্রান্ত মন্তব্য আসেনি। সিনেমাও দেখা হচ্ছে খুব। নতুন করে পুরনো সিনেমা। মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’ ‘চালচিত্র’ ‘বাইশে শ্রাবণ’ ইত্যাদিতে নকশাল বাড়ি আন্দোলনের টানাপোড়েন, নি¤œ মধ্যবিত্তের জীবন সংগ্রাম, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি বহু বছর পর আবার দেখছি। দেশে যখন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন তুঙ্গে তখন ইউটিউব ছিল না। ঘরে ঘরে পঞ্চাশ ষাট ইঞ্চি সাইজের মনিটর ছিল না। এসব ছবি দেখা তখন বেশ কঠিন ছিল। বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটি রীতিমতো আয়োজন করে ফিল্ম শো করত। দেখার চোখটিও তখন ছিল অন্যরকম। তখনকার দেখা আর এখনকার দেখার মধ্যে একটা তুলনামূলক সম্পর্ক, পার্থক্য ইত্যাদি তৈরির সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রায়ের ‘আগন্তুক’ও দেখলাম নতুন চোখে। ‘ফেলুদা’ ‘চারুলতা’ ‘চিড়িয়াখানা’ ইত্যাদি তো আছেই। ব্রন হাওয়ার্ডের ‘দ্য দাভিঞ্চি কোড’ মুক্তি পাওয়ার পর আলোচিত হয়েছিল খুব। সে সময় যখন দেখি, তখনও প্যারিসের বিশ্ব বিখ্যাত ল্যুভঁ মিউজিয়ামে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। দুদিন আগে আবার দেখলাম। কোডের সন্ধানে চলচ্চিত্রের বেশ ক’টি দৃশ্যে প্যারিসের বিশ্ব বিখ্যাত ল্যুভঁ মিউজিয়ামে রাখা ‘মোনালিসা’সহ ভিঞ্চির আরও কিছু মাস্টার পিসে জুম হয়েছে ক্যামেরা। যা আমরা খুঁটিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলাম ল্যুভেঁ। তাই তখনকার দেখা আর এখনকার দেখার মধ্যে নিশ্চিত একটা পার্থক্য তৈরি হয়েছে। যদিও মূল মোনালিসাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ নেই। একটি কাঁচের বক্সে রাখা ছবিটির সামনে ও দু’পাশে অনেকখানি জায়গা ফিতা দিয়ে ঘেরা। দর্শকদের ওই সীমানার বাইরে থেকে মোনালিসাকে দেখতে হয়। ল্যুভঁ মিউজিয়াম বিশাল এক সমুদ্র। আর সমুদ্রের বিশাল ঢেউটি মোনালিসা। দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এর সামনে। তাদের সামাল দেয়ার জন্য এ ব্যবস্থা। গাইড আগে থেকে আয়োজন করে না রাখলে আমাদের পক্ষে ল্যুভেঁ ঢোকা সহজ হতো না। সম্ভব হতো কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। বিশাল লম্বা কিউ ডিঙিয়ে সে আমাদের নিয়ে গট গট করে ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। এই সব করে কাটছে আবদ্ধ সময়। অফিসও চলছে। তবু মনে হয় একটি দিনই যাপন করছি প্রতি দিন। প্রতিদিন ভোর হয়। আবার রাত। আবার ভোর। তবু দিন মনে হয় একটাই...