সোমবার ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৫ মে ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

ব্যভিচারী অধ্যক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত প্রাণ দিয়েছে, তবুও প্রতিবাদ করেছে। বিনা প্রতিবাদে যেতে দেয়নি। শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগে বলেছে, ‘আমার যা হয় হোক, মাদ্রাসা অধ্যক্ষ নামধারী দুর্বৃত্তের যাতে বিচার হয়, যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়।’

জানি না আলেম নামধারী ওই শয়তানটার শাস্তি হবে কিনা? শাস্তি হোক বা না হোক নুসরাত যে কাজটি করে দিয়ে গেল তা হলো ‘প্রতিবাদ করতে হবে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী, অবিচারী, ব্যভিচারী সে যত বড়ই হোক প্রতিবাদ করতে হবে। নইলে এ সমাজ আর মানুষের সমাজ থাকবে না। জংলী সমাজে পরিণত হবে।’ রাষ্ট্র তার কাজ করছে, আমরা নাগরিক সমাজ আমাদের কাজ করছি কিনা আজ তার হিসাব নেয়ার সময় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে মানবতার অসম্মানের কথা শুনছেন সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। মানুষের আর্তচিৎকারে তিনি চোখ বন্ধ করেন না বরং পাশে দাঁড়াচ্ছেন। সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। নুসরাতের কথা শোনামাত্রই তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিটের প্রধান ডাঃ সামন্ত লাল সেন সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগ নেন। কিন্তু নুসরাতের শারীরিক অবস্থা অর্থাৎ তার শরীরের বেশিরভাগই (৮০ শতাংশ) পুড়ে যাওয়ায় তাকে স্থানান্তর করা যায়নি সঙ্গে সঙ্গে। নুসরাত সমাজকে ধিক্কার জানিয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে। কিশোরী নুসরাত, কতটা বয়স হয়েছিল, কিংবা যৌনতা কী বোঝার আগেই জীবন থেকেই সরে দাঁড়াল। নুসরাতের আত্মা শান্তি পাক এই কামনা করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জাতির অপার কৃতজ্ঞতা যে, তিনি আর্তমানবতার সেবায় যেভাবে এগিয়ে আসেন সমসাময়িক বিশ্বে আর কোন রাষ্ট্রনেতা সেভাবে এগিয়ে আসেন বলে শুনিনি।

কেবল নুসরাত নয়, ক’দিন আগে চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের গুরুতর অসুস্থতার খবর কাগজে দেখে তাকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠাতে নির্দেশ দেন। আমজাদ হোসেন কিন্তু আওয়ামী লীগ করতেন না, করতেন বিএনপি। বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে আর্তমানবতার সেবাই বড়। কে কোন্ দল করলেন, কার জাত-পাত কী সেদিকে তিনি তাকান না। তার মানবিকতার কথা বলতে গেলে আমাদের জাতীয় (বিদ্রোহী) কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথায় বলতে হয়- ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই/নহে কিছু মহীয়ান/....’এখানে কন্যা পিতার মতোই অনন্য অতুলনীয়।

নির্যাতনকারী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। নামটা নবাবী; কিন্তু কাজটা ব্যভিচারী, খুনী, সন্ত্রাসীর। নুসরাতকে হত্যাই করা হলো। তার মোল্লা চেহারার পেছনে বরং শয়তান লুকিয়ে আছে। ভাল করে দেখলে সহজেই ধরা পড়বে। ওই মওলানা (?) অধ্যক্ষ নুসরাতকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাবার চেষ্টা করে। নুসরাত কোনরকমে বেরিয়ে এসে এর প্রতিবাদ করে। কিন্তু এই প্রতিবাদের মূল্য তাকে জীবন দিয়ে দিতে হলো।

এই মোল্লা-মওলানা আবার গুন্ডা পালেন। গুন্ডাদের পাঠান নুসরাতকে শায়েস্তা করার জন্য। তারা নুসরাতকে ডেকে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। সবাই বোরকায় আবৃত। তাদের ৪ জনের একজন নারী বলেও কাগজে এসেছে। তারা নুসরাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে। কিন্তু নুসরাত তা প্রত্যাহার করেনি। দুর্বৃত্তরা তখন তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বলে এবার দৌড়া। অর্থাৎ নুসরাত প্রাণ দিয়েছে মান দেয়নি।

প্রশ্ন হলো, ওই মুখোশধারীরা কারা? হয়তো একদিন তারা ঠিকই ধরা পড়বে। হয়তো বিচারও হবে তাদের। সেদিন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা মওলানা নামধারী সন্ত্রাসী-ব্যভিচারীদের কুৎসিত চেহারাটাও বেরিয়ে আসবে।

আমাদের এ অঞ্চলে ইসলাম আসার পর যে সব ইসলামী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে অর্থাৎ মাদ্রাসা, সেগুলো শতাব্দী ধরে ছিল এই সেদিন পর্যন্ত অবহেলিত পশ্চাৎপদ। এদেশেরই সন্তানরা মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষা গ্রহণ করত, মাস্টার্স ডিগ্রী পর্যন্ত (কামিল/দাওরা) অর্জন করত; কিন্তু সমাজের কোথাও তাদের দাঁড়াবার সুযোগ হতো না। তাদের শিক্ষাটা ছিল ব্যবহারিক জীবনে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ মাদ্রাসায় ছাত্রদের সেভাবে গড়ে তোলা হতো না। কারিকুলামের দিক থেকে মাদ্রাসাগুলো ছিল পশ্চাৎপদ আর সমাজ কিংবা ব্যবহারিক জীবন ছিল আধুনিক এবং পশ্চিমা ভাবাপন্ন। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা থেকেও প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা মাদ্রাসা শিক্ষাকে ব্যবহারিক জীবনের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আধুনিকতার পথ উন্মুক্ত করে দেন। কারিকুলামের আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে ডিগ্রীর স্বীকৃতিও প্রদান করেন। আজ আলিয়া কিংবা কওমি উভয় সিস্টেম থেকেই ডিগ্রী অর্জন করে ছেলে-মেয়েরা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার বা চাকরি পাওয়ার অধিকার অর্জন করেছে। তারা আধুনিক ভাষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা লাভ করে যখন সমাজের মূলধারায় হাঁটার সুযোগ পেয়েছে, হাঁটতে শুরু করেছে, ঠিক এ সময়েই আঘাতটা এলো কেবল নুসরাত নয়, আরো অনেকের ওপর।

এই মোল্লারা ধর্মীয় শিক্ষাদানের সঙ্গে প্রধানত জড়িত। তারপরও ওইসব ধর্মবিরোধী কর্মকান্ড সাবোটাস কিনা তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। আমরা এরকম কর্মকান্ড দেখেছি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। সেদিনও এই রাজাকার মোল্লার দল আমাদের মা-বোনদের পাকিস্তানী বর্বর সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিল, বর্বরদের যৌন লালসার শিকার বানিয়েছিল। এ পর্যন্ত জানা তথ্য অনুযায়ী পাঁচ লক্ষাধিক মা-বোন তাদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিল, প্রাণ দিতে হয়েছিল। অনেকে অসহনীয় যন্ত্রণা বয়েছেন দীর্ঘকাল। এখনও বইছে। মূলত যারা পবিত্র ধর্ম পুঁজি করে রাজনীতি করে সমাজের মাতব্বর সাজে তারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওইসব অসামাজিক কাজ করে। তাদের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে না। যে কারণে তারা যে কোন নিচ কাজ করতে পারে অনায়াসে।

এখন এপ্রিল মাস। বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামে মার্চ-উত্তর এই এপ্রিল মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের যে ক’টি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক রয়েছে তারমধ্যে ১৯৭১ সালের ১০ ও ১৭ এপ্রিল দু’টি- ১০ এপ্রিল আমাদের স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল সেই ঘোষণা অনুযায়ী মুজিবনগর সরকার বা বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। স্বাধীনতার ইশতেহারে যে ক’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে তার মধ্যে রয়েছে (১) কি কি কারণে এই স্বাধীনতা যুদ্ধ তা এক এক করে বর্ণনা করা হয়েছে, (২) বলা হয়েছে সাম্য, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার হবে নীতি এবং (৩) ২৬ মার্চ ১৯৭১ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তা এই ইশতেহারের মাধ্যমে অনুমোদন দেয়া হয়। আর একে ভিত্তি করেই ’৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিগণ কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলায় একত্রিত হয়ে এই অনুমোদন দান করেন। ১৭ এপ্রিল এই বৈদ্যনাথতলার আ¤্রকাননে একত্রিত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার তথা বিপ্লবী সরকার শপথ গ্রহণ করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালী জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী হিসেবে বিপ্লবী সরকারের রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধ এবং আর্ম ফোর্সেসের সুপ্রীম কমান্ডার, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। কর্নেল এমএজি ওসমানীকে করা হয় প্রধান সেনাপতি। এ কথাগুলো এ জন্য বললাম বা এর প্রাসঙ্গিকতা এ জন্য যে যারা ইতিহাসের এ অংশ স্বীকার করে না বা চোখ-কান-জিহ্বা বন্ধ করে রাখে বা দিবসগুলো স্বীকার করে না, আমার দৃষ্টিতে তারাই নুসরাতের খুনী বা খুনের সহযোগী। এদের আমরা দেখেছি ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫তে পেট্রোল বোমা মেরে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে এবং পিটিয়ে মানুষ হত্যা করতে।

সর্বশেষ যে খবরটি লোকমুখে শোনা গেল ফেনীর সেই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ব্যভিচারী মওলানা সিরাজ উদদৌলার পক্ষে কারা নাকি মানববন্ধন করেছে। এতেও নাকি কিছু নারী অংশ নিয়েছে। এ তথ্য বা খবর সত্য হলে বলব- ‘আমরা কোথায় আছি এবং এখনও কেন রাজপথে ‘হি ফর সি’ বা ‘সি ফর হি’ স্লোগান তুলছি না কেন আমরা বলছি না বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার পথে এগিয়ে চলেছে, দেশ নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয়ে পরিণত হয়েছে, অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে আমরা এগিয়ে চলেছি। কেবল এগিয়ে চলেছি না, দ্রুত এগিয়ে চলেছি। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকওয়ালারাও বলল, যে ৫টি দেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে তন্মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আর কী চাই। শেখ হাসিনা মানুষের অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা ও ঘরের ব্যবস্থা করেছেন। আর কী চাই?

একটা কথা আমি অবশ্যই বলব, বাংলাদেশ কোনভাবেই ধর্মবিরোধী রাষ্ট্র নয় বরং সত্যিকার ধর্মের আদর্শ নীতি হিসেবে গ্রহণ করে এগিয়ে চলেছে। তারপরও কেন এ ধরনের নাশকতা? কেন এ ধরনের নারী নির্যাতন? ফেনীর ব্যভিচারী মওলানা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিচার চাই। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

ঢাকা ১২ এপ্রিল, ২০১৯

লেখক : সংসদ সদস্য, সদস্য সংসদে তথ্যমন্ত্রণালয় স্থায়ী কমিটি, সিনেট সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

balisshafiq@gmail.com

শীর্ষ সংবাদ:
শেখ হাসিনাকে ঈদের শুভেচ্ছা জানালেন মোদী         কিটের পরীক্ষা নিয়ে খবর সঠিকভাবে আসেনি : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র         গাজীপুরে ঝুট গুদামের আগুন নিয়ন্ত্রণে         যুক্তরাষ্ট্রে দেড় লাখ পিপিই রফতানি করেছে বাংলাদেশ         দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯৭৫ জন করোনা আক্রান্ত, মৃত্যু ২১         গণমাধ্যমকর্মীদের চাকরিচ্যুত না করার আহ্বান ডিইউজের         ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন মেয়র আতিক         ঈদ সবার মধ্যে গড়ে তুলুক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন ॥ রাষ্ট্রপতি         চীনে তৈরি করোনার টিকা নিরাপদ ও কার্যকর দাবি         আগামীকাল থেকে (বিএসএমএমইউ) বেতার ভবনে স্থাপিত ফিভার ক্লিনিক খোলা         বিটিভিসহ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নজরুল জন্মবার্ষিকী উদযাপিত         সম্মিলিত প্রচেষ্টায় করোনাকালও একদিন শেষ হবে ॥ আইজিপি         জাপানে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার         কুমিল্লার তিতাসে আওয়ামী লীগ নেতাকে গলা কেটে হত্যা         যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মিষ্টি ও ফল উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী         ঈদের নামাজ শেষে ফেরার পথে ইউপি সদস্যকে গুলি করে হত্যা         কোলাকুলিবিহীন অন্য রকম এক ঈদ উদযাপন         এ বছরের ঈদটি অনেক কঠিন ॥ ড. মোমেন         বায়তুল মোকাররমে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত         আজ জাতীয় কবির ১২১তম জন্মজয়ন্তী        
//--BID Records