রবিবার ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২২ মে ২০২২ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

ঘটনাবহুল ছাব্বিশ ও সাতাশের কাছে প্রজন্মের প্রত্যাশা

  • আকিল জামান ইনু

১৯৯৩, ফেব্রুয়ারি ২১। মাস্ট হেডে ‘স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষতায় সচেষ্ট’ স্লোগান নিয়ে আত্মপ্রকাশ দৈনিক জনকণ্ঠের। এই আত্মপ্রকাশকে এক বাক্যে বলা যায়- ভিনি, ভিসি, ভিডি। এল, দেখল এবং জয় করল। এ এমন এক আত্মপ্রকাশ যা বদলে দেবে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের খোলনলচে। ঠিক সে কারনেই দিনটি ঠাঁই করে নিল বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের পাতায়। আজ নিশ্চিতকরেই বলা যায় যে, বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধিৎসু গবেষককে আগামী দিনেও ফিরে আসতে এই দিনটির কাছে। যাত্রা শুরুর দিনটিও ইঙ্গিতবহ। বাঙালীর আজ যা কিছু অর্জন সে লক্ষ্যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল জনকণ্ঠের আত্মপ্রকাশের ৪১ বছর পূর্বে ১৯৫২ এর এই দিনটিতে। শুরুটা ভাষার দাবিতে- চূড়ান্ত পরিণতি স্বাধীন বাংলাদেশ। যে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ছিল মানুষে মানুষে সাম্য-মৈত্রী, অর্থনৈতিক মুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা আর স্বশাসনের অধিকার অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের। আত্মপ্রকাশের জন্য এই দিনটিকে বেছে নিয়ে দৈনিক জনকণ্ঠ সেই প্রতিশ্রুতির পক্ষে নিজের অবস্থানের বার্তা জানিয়ে দেয় পরিষ্কার। যদি সময়ের বিচারে জনকণ্ঠের আত্মপ্রকাশের সময়কে মূল্যায়ন করতে হয় সে তাৎপর্যও অনন্য। অন্তত তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস করেন ’৭১-এর বাংলাদেশে, লালন করেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতি বুকের ভেতর। সময় তখন প্রতিকূল। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার আর ইতিহাস বিকৃতির কারিগর জেনারেল জিয়া প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায়। নেতৃত্বে খালেদা জিয়া। কর্তৃত্ব কার্যত পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর ভেড়ার চামড়া গায়ে জড়িয়ে দাঁত লুকানো নেকড়ে জামায়াতের হাতে। রাজাকার পুনর্বাসনে জিয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়নকে পূর্ণতা দেয়ার মহোৎসব চারদিকে। রাজাকার মোড়ল গোলাম আযম তখন ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত এই বাংলার মাটিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আমির-এ-জামায়াত হয়ে। প্রতিবাদ করায় দেশের বিবেক বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবীরা সরকারের ভাষায়- রাষ্ট্রদ্রোহী। বেদনাহত মানুষ শহীদ জননীর পেছনে প্রতিবাদের সারিতে। তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই সরকারের। রাজাকার পুনর্বাসের পাশাপাশি ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতার নিমর্ম হত্যাকা-ের পর বাঙালীর যা কিছু অর্জন তার সমাধি রচনায় সরকার নিয়োগ করেছে সর্বশক্তি। সে লক্ষ্যে তাদের মন্ত্র জিয়াউর রহমানের গড়হবু রং হড় ঢ়ৎড়নষবস বলে গধশব ঢ়ড়ষরঃরপং ফরভভরপঁষঃ চর্চায়। ঠিক এমন এক সময়ে জনকণ্ঠের আত্মপ্রকাশ মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে। যে পথচলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জনকণ্ঠের সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ। যাঁর সামনে ছিল অনিশ্চিত আগামী, বুকের গভীরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার। সার্বিক দিকনির্দেশনায় ছিলেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংবাদপত্র জগতের এক দিকপাল তোয়াব খান।

আজকের অবাধ তথ্য প্রবাহের এই দিনে, জনকণ্ঠের আত্মপ্রকাশের সময়ে সংবাদ প্রবাহের চিত্রটি কল্পনা করাও কঠিন। ঢাকাকেন্দ্রিক সংবাদপত্রগুলোর জন্য জেলা পর্যায়ের পাঠকদের থাকত চাতক প্রতীক্ষা। দিনের পত্রিকা সন্ধ্যায় অথবা পরের দিন হাতে পেয়ে মিটত পাঠকের সংবাদ তৃষ্ণা। অনেক ব্যতিক্রমের মতো এখানেও জনকণ্ঠ শুরুতেই নিয়ে এলো নতুন ধারণা । পাঠকের স্বার্থে একযোগে প্রকাশিত হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, খুলনা ও সিলেট থেকে। রেলওয়ের কাছ থেকে পাওয়া একটি ধীরগতির ট্রান্সমিশন লাইনের সাহায্যে ৫টি জেলা থেকে একযোগে পত্রিকা প্রকাশের সেই দুঃসাধ্য দায়িত্ব জনকণ্ঠ কর্মীরা পালন করেছেন নিরলস পরিশ্রমে। বলা যায় প্রথা ভেঙ্গে যাত্রা শুরু। মাস্ট হেডে স্বাতন্ত্র্য ও নিরপেক্ষতায় সচেষ্ট সেøাগান এ দেশের সংবাদপত্রে প্রথম, যা অনুসরণ করছে অন্যরা। সংবাদপত্র কেবল সংবাদ প্রকাশমাধ্যম নয় তার থাকবে নিজস্ব নীতি এ কথা জোর গলায় ঘোষণা করেছে জনকণ্ঠ। জানিয়ে দিয়েছে জনকণ্ঠের অবস্থান গণতন্ত্রসহ মুক্তিযুদ্ধের মৌলনীতিসমূহের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের মৌলনীতিগুলো তখন পবিত্র অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিফলিত জনকণ্ঠের পাতায়। জনকণ্ঠই প্রথম বিশেষ দিবসগুলোকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে...’ প্রতিবেদন প্রকাশ। স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে ১ মার্চ থেকে মাসব্যাপী রক্তঝরা মার্চ, ২৫ মার্চ সেই কালরাত্রির প্রতিবেদন। ১ ডিসেম্বর থেকে ধারাবাহিক প্রকাশনা বিজয়ের মাস। আজকের বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের মেধা-মননে সেই প্রতিবেদনগুলোর প্রভাব অস্বীকারের কোন উপায় আছে কি? আজ যখন শাহবাগে গর্জে ওঠা তারুণ্যের জোয়ার গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদের উদ্দেশ্যে ঘৃণাভারে ছুড়ে দেয় ‘তুই রাজাকার’ শব্দ দুটি তখন কি মনে পড়ে না, রাজাকারকে রাজাকার বলা যাবে না বলে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে জনকণ্ঠের শিরোনামে যুক্ত ‘সেই রাজাকার’ শব্দ দুটি? মনে পড়ে না মোড়ল রাজাকার গোলাম আযমের নাগরিকত্বের পক্ষে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে জনকণ্ঠের শিরোনাম ‘জাতি ক্ষুব্ধ’? সারাদেশ যখন মৌলবাদীদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত। ঠিক এ সময়ে এটিএম শামসুদ্দীন অর্ধশিক্ষিত মোল্লাদের ধর্মীয় অপব্যাখ্যা নিয়ে জনকণ্ঠে লিখলেন ‘এ বলদ আমিনের’। খালেদা সরকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মোল্লাতন্ত্রের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলো জনকণ্ঠের সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান, নির্বাহী সম্পাদক বোরহান আহমেদ (মরহুম) এবং লেখকের নামে। সে মামলায় জনকণ্ঠের তিন সাংবাদিক তিন সপ্তাহ জেল খাটেন। শুধু কী তাই? প্রতিদিন আক্রমণের শিকার হয় জনকণ্ঠের অফিস। নির্লজ্জ সরকার সামান্য নিরাপত্তাও দেয়নি। শিল্প পরিবারের অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের দিয়ে জনকণ্ঠকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়েছে। পাশে ছিলেন পাঠকেরা। সার্কুলেশন বাড়ছিল লাফিয়ে। জনকণ্ঠ যে তখন পাঠকের প্রাণের ভাষায় কথা বলছে! জনকণ্ঠ প্রথম থেকেই বিবেচনায় রেখেছে পাঠকের পাঠতৃষ্ণার কথা। তখনকার সংবাদপত্রগুলো ছিল সংবাদ প্রতিবেদনভিত্তিক যা স্বল্প সময়ে পাঠ শেষ হয়ে যেত। জনকণ্ঠ উন্মোচিত করে দেয় নতুন দিগন্ত। পাঠক যাতে সারাদিনের পড়ার খোরাক পায় সেভাবে নিজেকে সাজায় জনকণ্ঠ।

সম্পাদকীয় পাতার বিপরীতে যোগ হয় ‘চতুরঙ্গ’ নামে আরেকটি পাতা। যেখানে লেখকের পাশাপাশি পাঠকও হয়ে ওঠেন লেখক। আর এভাবেই জনকণ্ঠ উপহার দিয়েছে অসংখ্য নতুন লেখক। জনকণ্ঠের আরেকটি সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে এদেশে সংবাপত্রের চিত্র। পুরো পত্রিকা বহুবর্ণে মুদ্রণ। এদেশে প্রথম। অন্যরা বাধ্য হয় জনকণ্ঠকে অনুসরণ করতে। প্রতিদিন পাঠকদের জন্য অন্তত একটি ফিচার পাতা। গুরুত্ব দেয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ফিচার ও মানবিক কাহিনীতে। সেবা সহায়তার লক্ষ্যে চালু করে আইনী পরামর্শ, মিনি প্রেসক্রিপশন। ঘটনার গুরুত্ব সাপেক্ষে কলামিস্টদের লেখা প্রথম পাতায় ঠাঁই দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জনকণ্ঠ। সবার জন্য শিক্ষার যে অঙ্গীকার ছিল মুক্তিযুদ্ধের তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখিয়েছে জনকণ্ঠ। মৌলবাদী হামলার শিকার ব্র্যাকের স্কুলগুলোর বিষয়ে জনকণ্ঠের ভূমিকা স্মৃতিতে ভাসে। জনকণ্ঠের ‘শিক্ষা সাগর’ পাতা তো আজ ইতিহাস। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে দেশে জনকণ্ঠই প্রথম চালু করে ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষা সাগর পাতা। ধনিক শ্রেণীর করায়ত্ত, কোচিং সেন্টারের বৃত্তে বন্দী শিক্ষা ব্যবস্থাকে সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে জনকণ্ঠের এই উদ্যোগ ছুঁয়ে যায়নি সে সময়ের এমন ছাত্রছাত্রী বিরল।

জনকণ্ঠ যে কেবল দেশের অভ্যন্তরে ঘটা ঘটনাবলীর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তা নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর গুরুত্বও জনকণ্ঠ বিবেচনায় নিয়েছে। তাই হংকং চীনের কাছে হস্তান্তরের ঐতিহাসিক ঘটনা কভার করতে প্রতিবেদক প্রেরণ করেছে। দেশের বাইরে ভিনদেশে চলমান যে কোন জাতির মুক্তি ও ন্যায়ের সংগ্রামে জনকণ্ঠের ছিল অবিচল সমর্থন। ফিলিস্তিনের আন্দোলন সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরতে জনকণ্ঠ প্রতিনিধি প্রেরণ করে। অধিকৃত ইরাক কিংবা কঙ্গোতে প্রতিনিধি পাঠিয়েছে জনকণ্ঠ কেবল তার পাঠকের কাছে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে। বিভিন্ন দেশের জাতীয় নির্বাচন কভার করতে প্রেরণ করেছে প্রতিনিধি । জনকণ্ঠ জানে ’৭১-এ আমাদের মুক্তির সংগ্রামে আমরা কতটা মূল্য দিয়েছি। সে অনুভূতি বুকে নিয়ে একাত্ব থেকেছে যে কোন জাতির ন্যায়ের সংগ্রামের সঙ্গে, যে কোন মানবিক ইস্যুতে।

দেশের অভ্যন্তরেও জনকণ্ঠ কখনই পরোয়া করেনি ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু। যা কিছু ন্যায়, সত্য, সুন্দর তার পক্ষে কথা বলেছেÑ দ্বিধাহীন। নীতির প্রশ্নে আপোসহীন থেকে কুসংস্কার, মৌলবাদ, কূপম-ূকতা, যা কিছু অবৈজ্ঞানিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী তার বিপক্ষে উচ্চকিত কণ্ঠে কথা বলেছে। বিনিময়ে মূল্যও দিয়েছে। জর্জরিত হয়েছে মামলা-হামলায়। মামলা হয়েছে দেশের প্রতিটি জেলায়। সত্যের পক্ষে কথা বলায় জীবন দিয়ে মূল্য পরিশোধ করেছেন আমাদের যশোর প্রতিনিধি শামসুর রহমান। এক ধনকুবের প্রতারকের মুখোশ উন্মোচন করতে গিয়ে পা হারিয়েছেন আমাদের সংবাদদাতা প্রবীর শিকদার। মৌলবাদী নীলনক্সায় পরিচালিত শিয়া ও কাদিয়ানীদের মসজিদে হামলা, যশোর উদীচীর অনুষ্ঠানে, ঢাকায় কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে বোমা মেরে মানুষ হত্যা, পহেলা বৈশাখের প্রভাতে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার নেপথ্য শক্তির মুখোশ খুলে দেয় জনকণ্ঠ তার পাতায়। ক্ষুব্ধ হায়নারা জনকণ্ঠ অফিসে রেখে যায় মাইন (এ্যান্টি ট্যাঙ্ক)। হুমকি-ধমকি তো ছিলই। কিন্তু কিছুতেই রোধ করা যায়নি জনকণ্ঠের কণ্ঠ।

এরপর ২০০১। এক পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলো মহাজোট। নেকড়ে এবার আর ভেড়ার ছাল পরে নয় বরং দাঁত-নখ বের করে দখল করল জাতীয় পতাকা। বিস্মিত, হতভম্ব জাতি দেখল ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত জাতীয় পতাকা কুখ্যাত রাজাকার নিজামী, মুজাহিদের গাড়িতে। তাদের মদদে মাথাচাড়া দিয়েছে দুর্নীতি আর খুনের নতুন যুবরাজ। ক্ষমতার কেন্দ্র তখন স্থানান্তরিত তার নিয়ন্ত্রিত ভবনে। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে জ্বলে উঠল আগুন। ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে গুঁড়িয়ে দিতে জ্বালানো আগুনে উদ্বাহু নৃত্য তখন রাজাকারের। হিন্দুদের ঘরবাড়ি আক্রান্ত, ধর্ষিতা নারীর চিৎকার ভাসে বাতাসে। শুরু হলো টার্গেট কিলিংÑ এরই ধারাবাহিকতায় আক্রান্ত বিরোধীদলীয় নেতার সমাবেশ। রাজপথ ভেসে গেল রক্তস্রোতে, চারদিকে মানব শরীরের খ-াংশ। জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হলো তার শ্রবণেন্দ্রিয়। সারা জাতির ক্ষোভ-ঘৃণা-ধিক্কার প্রকাশিত জনকণ্ঠের পাতায়। উত্তরবঙ্গ তখন প্রকম্পিত এক মৌলবাদী বাংলা ভাইয়ের পদচারণায়। ৬৩ জেলায় বোমা হামলা, নিজামীর ডকইয়ার্ডে দশ ট্রাক অস্ত্র। আর কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে জনকণ্ঠের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা। সরকারী বিজ্ঞাপন বন্ধ, বিদ্যুত ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে জনকণ্ঠ। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে শুরু করে হাস্যকর টালবাহানা। তাদের ইচ্ছা ছিল গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা। মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। ঘোলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লেবাসে ২০০৭-এ ক্ষমতা নিয়ে নেয় সেনাবাহিনীর চক্রান্তকারী মহল। পূর্ব অভিজ্ঞাতা থেকে তারা জানত তাদের নীলনক্সা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমেই স্তব্ধ করে দিতে হবে জনকণ্ঠের কণ্ঠ। কারণ নীতির প্রশ্নে আপোসহীন জনকণ্ঠ গণতন্ত্রের প্রতি তার অঙ্গীকার থেকে এক চুলও সরবে না, যেমন আগেও সরেনি। তাই পরিকল্পিত আঘাত হানল জনকণ্ঠের ওপর। ৭ মার্চ ২০০৭ অফিস ঘেরাও করে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদকে। জনকণ্ঠের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার অভিপ্রায় নিয়ে সিলগালা করে দেয় গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবার ভবনের তিনটি ফ্লোর। যার মধ্যে ছিল এ্যাকাউন্টসও। বন্ধ হয়ে যায় কর্মীদের বেতন ভাতা, দৈনন্দিন খরচ নির্বাহের পথ। জনকণ্ঠের জীবনের সে অন্ধকার অধ্যায়ে সাংবাদিক-কর্মীরা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছে তা অতুলনীয়। তত্ত্বাবধায়কের আড়ালে চক্রান্তকারীদের চক্রান্তে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। জনকণ্ঠের সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদের নামে একের পর এক মামলা এমনকি তার স্ত্রীর নামেও জারি হয় হুলিয়া। সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ২০০৯-এর ২০ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পান মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ। ততদিনে গুঁড়িয়ে গেছে জনকণ্ঠের অর্থনৈতিক মেরুদ-।

জাতির সামনে তখন বড় চ্যালেঞ্জ ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা। যে অঙ্গীকারের পক্ষে শুরু থেকেই কথা বলে আসছিল জনকণ্ঠ। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত জোটের ইতিহাসের উল্টোযাত্রা রোধ করে সঠিক ধারায় দেশকে পরিচালিত করা। ষড়যন্ত্র থেমে ছিল না। নির্মম বিডিআর হত্যাকা- দিয়ে শুরু যে ষড়যন্ত্র তা চরমে ওঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ঘিরে। কাদের মোল্লার রায়কে ঘিরে ফুঁসে ওঠে জাতি। শাহবাগে গর্জে ওঠা তারুণ্যের পাশে জনকণ্ঠ দাঁড়ায় দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে। সুবিধাবাদী সংবাদপত্রগুলো যখন বিভ্রান্তি ছড়াতে ব্যস্ত গণজাগরণ মঞ্চকে ঘিরে তখন জনকণ্ঠের দৃঢ় ভূমিকা তাদের আস্থা যুগিয়েছে। দিয়েছে চলার পথে প্রেরণা। নিশ্চিত করেছে ঘাতক দালালদের প্রাপ্য শাস্তি। পত্রিকা যদি হয় জনমানুষের দাবির অতন্দ্র প্রহরী তবে ঘাতক দালালদের প্রতিটি বিচার ও সাজা নিশ্চিতকরণে জনকণ্ঠ সে ভূমিকা পালন করেছে দৃঢ়ভাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে, উন্নয়ন মহাসড়ক যাত্রায় প্রতিটি যৌক্তিক কর্মসূচীতে দিয়ে আসছে সমর্থন। এখনও বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যে কোন ব্যক্তির অনুভূতি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম জনকণ্ঠ। এখনও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির আশ্রয়স্থল জনকণ্ঠ। এখনও মৌলবাদী অপশক্তির আক্রোশ আর আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য জনকণ্ঠ। ২০১৪ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, হত্যাকা-ের যে উৎসব শুরু হয়েছিল সে সময়ে জনকণ্ঠের বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা উল্লেখ করতেই হয়। খুব বেশি দিন আগের কথা নয় বিচার বিভাগ সম্পর্কিত একটি লেখার কারণে জনকণ্ঠের সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও লেখক জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়কে দাঁড়াতে হয়েছে আদালতের কাঠগড়ায়। অন্য যে কোন পত্রিকা যখন নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে দায়মুক্তির পথ বেছে নিত তখন জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ দৃঢ় অবস্থান নেয় প্রকাশিত মতের পক্ষে। সেটিও এদেশে প্রথম। প্রতীকী সাজা কিংবা অর্থদ-ের পরও জনকণ্ঠ কথা বলে গেছে আইনের শাসনের পক্ষে। সবার জন্য ন্যায় বিচার ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার এবং সে অঙ্গীকারের পক্ষে জনকণ্ঠের অবস্থান প্রথম থেকেই। জনকণ্ঠ যেমন বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী তেমনি মানুষের ন্যায় বিচারের অধিকার প্রাপ্তির নিশ্চয়তার লক্ষ্যে বিচার বিভাগীয় অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলতে পিছপা হয়নি। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করে জনকণ্ঠের অবস্থান যে সঠিক ছিল তা আজ প্রমাণিত। জনকণ্ঠ বিশ্বাস করে কতিপয় ঘাতক দালালের মৃত্যুদ- কার্যকরের ফলে তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। ঘাতকদের শেকর অনেক গভীরে, তাদের অনুচরেরা এখনও সক্রিয়। তাই তো দেশজুড়ে একের পর এক জঙ্গী হামলার নেপথ্য নায়কদের মুখোশ উন্মোচনে জনকণ্ঠ কাজ করছে দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে। শুধু তাই নয় এই মৌলবাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনেও নেতৃত্ব দিয়েছে জনকণ্ঠ। সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ে সমর্থনের পাশাপাশি ভুল-ভ্রান্তির বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের যে কোন অর্জনকে জনকণ্ঠ তার পাতায় ঠাঁই দিয়েছে গর্বের সঙ্গে। বাংলাদেশের স্বার্থে সম্পাদিত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর নির্মোহ মূল্যায়ন করেছে। নিজের মতামত জানিয়েছে স্পষ্ট। বিরোধী দলের যৌক্তিক দাবির প্রতি যেমন সম্মান দেখিয়েছে তেমনি তাদের অপরাজনীতির মুখোশ উন্মোচনে ছিল সচেষ্ট। এই সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের প্রতি জনকণ্ঠের অঙ্গীকার।

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতোই বদলে দিয়েছে সংবাদ ভুবনের চালচিত্র। প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো। আশার কথা এই যে, ছাপার হরফের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এখনও অটুট আর ইতিহাসের দলিল হিসেবে সংবাদপত্র এখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার পরও বাস্তবতা পরিবর্তন দাবি করে। শুধু তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিই নয় বিশ্বরাজনীতি এখন পার করছে এক জটিল সময়। এই জটিলতার প্রভাবের বাইরে নয় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু যেমন বলেছিলেন ইধহমষধফবংয রং ধ নবফ ড়ভ রহঃবৎহধঃরড়হধষ পষরপশ. কথাটি এখনও সমান সত্য। পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর প্রত্যক্ষ মদদে লন্ডনকেন্দ্রিক সে ষড়যন্ত্র ডানা মেলেছিল ২০১৮ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। সদ্যসমাপ্ত এ নির্বাচন ও তার আগের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে জনকণ্ঠ বিভ্রান্ত হয়নি মোটেও। বরং জাতিকে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে ডুবিয়ে দেয়ার অপশক্তির অপচেষ্টার সমুচিত জবাব দিয়েছে নিজের পাতায়। নিজের অঙ্গীকার থেকে সরে আসেনি এক পাও। মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই আমাদের প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর গণতন্ত্র ছিল জনকণ্ঠের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার ধারণ করে তাল মেলাতে হবে সময়ের সঙ্গে। তরুণ প্রজন্মের প্রাণের ভাষায় কথা বলতে হবে জনকণ্ঠকে। এই তরুণরা যখন আমাদের ভবিষ্যত তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক বিকাশে তাদের পথ দেখাবে জনকণ্ঠ এটাই প্রত্যাশিত। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার যে নতুন ধারা জনকণ্ঠ চালু করেছিল এদেশে তা বিস্তৃত হোক। সময়কে ধারণ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ভিন্নমাত্রা পাক জনকণ্ঠের পাতায়। সময়ের সাথে পাল্টেছে অপরাধের ধরন, অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকতা পেয়েছে নতুন মাত্রা সেটিও ধারণ করতে হবে জনকণ্ঠকে। ফিচার পাতাগুলোতে যুক্ত হোক নিত্যনতুন বিষয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে মতামত গঠনে জনকণ্ঠের ভূমিকা প্রসারিত হোক। রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন আর তাদের সঠিক পথে দিকনির্দেশনা দেবে সংবাদপত্র, সেটিই তো সংবাদপত্রের কাছে কাম্য। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে কাজ করবে জনকণ্ঠ প্রত্যাশা সেটাও। সুশাসন তথা আইনের শাসন আজ সভ্যতার দাবি। সে দাবি পূরণে এগিয়ে আসতে হবে জনকণ্ঠকে যেমন সে অতীতে করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো হয়ে উঠেছে বিকল্প সংবাদমাধ্যম, এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে সেখানকার চিত্র ধারণ করতে হবে। বৈচিত্র্য চাই ইন্টারনেট প্রকাশনায়। তথ্যপ্রযুক্তি যে কেবল কল্যাণ ডেকে এনেছে তাই নয় এর ক্ষতিকর দিকগুলো আমাদের আগামী প্রজন্মকে ফেলেছে ঝুঁকির মুখে। এই ঝুঁকি মোকাবেলায় জনকণ্ঠকে এগিয়ে আসতে হবে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে সচেতনতা সৃষ্টি ও জনমত গঠন করে। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় আগের মতোই অবিচল থাকুক জনকণ্ঠ। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা আর গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলুক। এক-এগারোর পরিকল্পিত আক্রমনে ভাঙ্গা অর্থনৈতিক মেরুদ- নিয়ে কাজগুলো কঠিন তবু তা করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের স্বার্থে- আগামী প্রজন্মের স্বার্থে।

সভ্যতা, বিজ্ঞান আজ যেটুকু এগিয়েছে তার কেন্দ্রে কিন্তু মানুষ। শেষ কথা মানবতা। দৈনিক জনকণ্ঠ মানবতার কথা বলবে আপোসহীন- এটা পাঠকের প্রত্যাশা, আমাদের প্রতিশ্রুতি।

শীর্ষ সংবাদ:
হাজি সেলিমকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ আদালতের         সরকার পরিবর্তনের একমাত্র উপায় নির্বাচন ॥ কাদের         পরিবেশ রক্ষায় যত্রতত্র অবকাঠামো করা যাবে না ॥ প্রধানমন্ত্রী         পেছাচ্ছে না ৪৪তম বিসিএস প্রিলি         কোভিড-১৯ : ভারত-ইন্দোনেশিয়াসহ ১৬ দেশের হজযাত্রীদের দুঃসংবাদ         অর্থনীতি সমিতির ২০ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বিকল্প বাজেট পেশ         ‘বিশ্বজুড়ে আরও মাঙ্কিপক্স শনাক্তের আশঙ্কা’         ২০২৩ সালের জুনেই ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন যাবে         রাজধানীর গুলশানে দারিদ্র্য কম, বেশি কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে         জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন, গ্রেফতার ২         পতনে নাকাল শেয়ারবাজার, দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা         হাইকোর্টে নর্থ সাউথের ট্রাস্টি বেনজীরের অগোচরে আদালত চত্তর ছাড়ার চেস্টা         সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা বেতন চান সরকারি কর্মচারীরা         নরসিংদীর বেলাবতে মা ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার ॥ আটক ৩         খুলনায় বিস্ফোরক মামলায় ২ জঙ্গীর ২০ বছরের কারাদণ্ড         চার মাসে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ৬ লাখ ৭৭ হাজার         সৌদিতে প্রথমবার নারী ক্রু নিয়ে আকাশে উড়ল প্লেন         ‘৬০ শতাংশ পুরুষ নারীর নির্যাতনের শিকার’         বাজেটের আগেই বেড়ে গেলো সিগারেটের দাম         পাম্পে তেল না পেয়ে মালিকের বাড়িতে আগুন