ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

এসএম মুকুল

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে হাওড়বাসী

প্রকাশিত: ০৭:৩৪, ২৭ মে ২০১৮

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে হাওড়বাসী

হাওড়াঞ্চল বাংলাদেশের অতি প্রাকৃতিক জোন। যদিওবা অতি প্রাকৃতিক জোন হিসেবে আজও হাওড়কে স্বীকৃতি বা মূল্যায়ন করা হয়নি। শত বছরের হাওড় বাংলার কালের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এই হাওড়বাসী বংশপরম্পরায় প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকে। অসময়ে বন্যা, অতি খরা, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, কালবৈশাখী ঝড় আর ৬ মাস অথৈ পানির বিনাশী আফালের (ঢেউ) তা-বলীলার সঙ্গে হাওড়বাসীর যুদ্ধ যেন নিয়তির লিখন। বছরের ৬ মাস পানিতে ভাসমান আর ৬ মাস শুকনা থাকার প্রাকৃতিক নিয়মের ছকে বাঁধা হাওড়বাসীর জীবনচক্র। প্রকৃতির বৈরিতায় একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ গ্রাস করে নিয়ে যায় হাওড়ের সোনার ফসল। কখনও পাহাড়ী ঢল আর অতিবৃষ্টিতে ফসল হারায় হাওড়ের মানুষ। কখনওবা কালবৈশাখী আর শিলাবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব প্রাকৃতিক বৈরিতার সঙ্গে নতুন করে যোগ হলো বজ্রপাত আতঙ্ক। অতি প্রাকৃতিক এলাকা হিসেবে হাওড়বাসীর পেছন থেকে দুর্যোগ হানা যেন ছাড়ছেই না। প্রকৃতির মেজাজ-মর্জির ওপর নির্ভর করেই জীবনযাপন করতে হয় হাওড়বাসীকে। ধান আর মাছে সমৃদ্ধ হাওড় এলাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিময় করতে বিশাল ভূমিকা রাখলেও সে তুলনায় হাওড়াঞ্চলের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের দৃষ্টি অনেক কম। হাওড়ের কৃষকদের অভিবাবদন জানাতেই হয়। গত বছর অকালবন্যায় বোরো ফসল, হাস, গবাদিপশু, মাছ সব হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব কৃষকরা ঋণদারী করে, শরীরের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে আবারও ফলিয়েছেন সোনার ফসল। যদিও এই চিত্র প্রায় প্রতি বছরের একই রকম। গত বছরের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পর এবার বোরো ধানের ব্যাপক উৎপাদন হলেও শেষ দিকে প্রকৃতির বৈরিতা যেন আর ছাড় দিল না হাওড়বাসীকে। বৃষ্টি, ঝড়, শিলাবৃষ্টি আর বজ্রপাতের কারণে অনেকের জীবন গেছে, জমি থেকে কেটে আনা ধান মাড়াই আর শুকানোর বিলম্বের কারণে নষ্ট হয়ে গেছে ধানের রং। এ কারণে হাওড়ের কৃষকরা পাচ্ছেন না ধানের নায্য দাম। অপরদিকে খরকুটো পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্য সঙ্কটের দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে হাওড়বাসীর। এবার ফলন খুব ভাল হলেও ফসল কাটার মৌসুমের শেষ সময়টা যেন তাদের অনুকূলে ছিল না। গোলা ভরে ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন থাকলেও বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশের বৈরী প্রভাব দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। যে সময়ে প্রয়োজন ছিল কাঠফাটা রোদের এমন সময় ঘন ঘন বৃষ্টি কৃষকের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে প্রকৃতির বৈরিতায় শুকাতে পারছেন না খলা (ধান কেটে মাড়াই ও শুকানো জায়গা) ভরা ধান। অপরদিকে এখনও যে পরিমাণ জমির ধান কাটা বাকি সে তুলনায় শ্রমিকের তীব্র সঙ্কট। আবার বজ্রপাতে মৃত্যুর আতঙ্কে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটতেও যেতে চায় না। কেননা গত বিশ দিনে হাওড়াঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণ দিয়েছে অনেক কৃষক ও কৃষি শ্রমিক। এসব কারণে হাওড়ের ফলন ভাল হলেও শ্রমিক সঙ্কট ও বজ্রপাতের কারণে ধান কাটায় দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। সুনামগঞ্জের জয়শ্রী এলাকার শিক্ষক আজহারুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে- হাওড়ে ধান কাটার শুরুতে প্রথমে দেখা দেয় শ্রমিকের অভাব। তারপর বৃষ্টির কারণে সেই ধান শুকিয়ে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষক। ধানের রং নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। বৃষ্টি-বাদলের কারণে খর শুকাতে না পারায় গো-খাদ্যেরও সঙ্কট দেখা দেবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এ নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন হাওড়ের কৃষকরা। এদিকে জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বজ্রপাতে হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে তাহিরপুর উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রফিকুল হক চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর অকাল বন্যায় হাওড়ের ফসল তলিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয় কৃষকের। এবারের ফসল খুবই ভাল হয়েছে। তবে শ্রমিক সঙ্কট আর বৃষ্টির কারণে কৃষকরা এখন ফসল গোলায় ওঠাতে পারছেন না। নেত্রকোনা মোহনগঞ্জের সাংবাদিক আবুল কাশেম আজাদ জানান- ‘হাওড়াঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, আশঙ্কাজনক হারে বজ্রপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওড়ের কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আকাশে কালো মেঘ দেখলেই আতঙ্কে কাজ ফেলে নিরাপদে আশ্রয় নিতে ছুটে যান কৃষক-কৃষাণীরা। তিনি আরও জানান, হাওড়াঞ্চলে খবর নিয়ে জানা গেছে বজ্রপাতে পুরুষ কৃষি শ্রমিকরা হাওড়ে ধান কাটতে গিয়ে এবং নারীরা খলায় ধান মাড়াইয়ের সময় প্রাণ হারাচ্ছেন। বজ্রপাতের এমন ভয়াবহতায় কৃষক ও শ্রমিকদের মাঝে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ‘মাছ আর ধান হাওড়ের প্রাণ’- হাওড়াঞ্চলের মানুষ একসময় গর্ব করে বলত। বর্ষার ছয় মাস হাওড়ের অথৈ পানিতে বেড়ে ওঠে দেশীয় প্রজাতির মাছ। আবার পানি যখন শুকিয়ে যায় তখন বাহারি প্রজাতির দেশীয় মাছ সব গিয়ে জমা হয় হাওড়ের নিম্নাঞ্চল জলমহালে। হাওড়াঞ্চলের জলরাশিতে পাওয়া যায় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নানা জাতের মাছ যেমন- কৈ, শরপুঁটি, পুঁটি, তিতপুঁটি, কাতলা, মাগুর, খৈলসা, বাঁশপাতা, আইড়, টেংরা, বাইম, চিতল, ভেদা, পাবদা, গজার, শোল, মহাশোল, চাপিলা, কাকিলা, বোয়াল, মৃগেল, রুই, কালবাউস প্রভৃতি। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বাংলাদেশে ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে হাওড়গুলোতে ১৩০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। তবে গত প্রায় এক দশকে বাঘাড়, তিলা শোল, ঘাউড়া, বাচা, ঘোড়া মুইখ্যা, পাঙ্গাশ, রিটা, মহাশোল, বামোশ, রানি, গজার, কাশ খাউড়া, কালাবাটা, ঘইন্যা, শাল বাইম, গুইজ্জা, চিতল, কানি পাবদা, গুজি আইড়, হলুদ-সোনালি দেহের নয়ন জুড়ানো রানি মাছসহ প্রায় ৬২ প্রজাতি মাছ বিলুপ্তির পথে। হাওড় শুধু মাছ আর ধান নয় পাখির জন্য অভয়ারণ্য এলাকা। শুকনো মৌসুমে বিশেষত শীতকালে দেশের বিরল প্রজাতির বহু পাখির দেখা মিলবে হাওড়ের বদ্ধ জলাশয়ে। হাওড়ের হিজল বাগে বসে পাখিদের মিলনমেলা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাওড় এলাকায় বজ্রপাতের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা এবং জনমনে ভয় বেড়ে গেছে। যদিও বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মূল পদক্ষেপ হিসেবে দেশের ৬৪ জেলায় তালগাছ লাগানো হচ্ছে। ইতোমধ্যেই সরকারী উদ্যোগে ১০ লাখ তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। সরকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, বজ্রপাত যেহেতু সাধারণত উঁচু কোন কিছুতে আঘাত করে, বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকানোর জন্য এটাই সবচেয়ে কার্যকর স্থানীয় প্রযুক্তি। সন্দেহ নেই দীর্ঘ মেয়াদে বজ্ররোধক তালগাছের ভূমিকা অনন্য। কিন্তু তালগাছ বেড়ে উঠতে অনেক বছর সময় লাগে। তাছাড়া হাওরে ৬ মাস থাকে পানি। এ কারণে বিশেষত হাওর এলাকায় বজ্ররোধক টাওয়ার নির্মাণে সরকারের গৃহীত পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ক করা দরকার। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আসাদুল হক বলেন, বজ্রপাত যেহেতু উঁচু জায়গায় আঘাত করে, সে হিসেবে তাল গাছ মৃত্যু কমাতে সহায়ক হবে। কিন্তু বজ্রপাতের আঘাত পাওয়া গাছটি নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি বলেন, হাওড় এলাকায় টাওয়ার নির্মাণ করা হলে বজ্রনিরোধক স্থায়ী ব্যবস্থা হবে। আশার খবর হচ্ছে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হাওর এতদিন ছিল দৃষ্টির আড়ালে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর হাওড়র সম্ভাবনা নিয়ে গ্রহণ করা হয় হাওড় উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক আগ্রহে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমরা জানি, শেখ হাসিনার আগ্রহে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা এলাকায় এখন ফসল ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় হাওড়বাসীর অকাল বন্যায় ফসলহানির অনিশ্চয়তাও ঘোচানো সম্ভব হবে। হাওড় নিয়ে এখন একটি আশাবাদের জায়গা তৈরি হয়েছে। হাওড়বাসীর প্রত্যাশা সমন্বিত ও পরিকল্পিত উপায়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ১০ বছরে পাল্টে যাবে হাওড়ের অর্থনৈতিক চেহারা। কম সময়ে উচ্চ ফলনশীল ধান ও হাওড়ের উপযোগী রবিশস্য উৎপাদন এনে দিতে পারে নতুন দিগন্ত। হাওড়াঞ্চলে একটিমাত্র ফসল বোরো ধান। দুঃখ কিংবা গর্ব যাই হোক- বলা হয়ে থাকে- ‘এক ফসলি ধান; হাওড়বাসীর প্রাণ।’ বছরে একটিমাত্র ফসল হলেও বিরল বিচিত্র দেশি জাতের অনেক ধান এখনো হাওড়াঞ্চলে উৎপাদিত হয়। দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে ধান ও আমিষ চাহিদা পূরণে মাছের অন্যতম উৎস হাওড়। কৃষিবিদদের মতে, দেশে আবাদযোগ্য পতিত জমিসহ উপকূল ও হাওড়াঞ্চলের জলাবদ্ধ এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত করতে পারলে বছরে ৫০ লাখ টন বাড়তি খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব। অনেকের ধারণা, হাওড়ের সোনার ফসল প্রতিবছর ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারলে ১০ বছরে পাল্টে যাবে হাওড়াঞ্চলে অর্থনৈতিক চেহারা।