মঙ্গলবার ১৪ আশ্বিন ১৪২৭, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী

  • ডা. কামরুল হাসান কখান

স্মৃতি চারণ

একজন মানুষ যিনি কেবল শিক্ষাগত যোগ্যতার মাধ্যমেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে চান বা প্রতিষ্ঠা পান তার জন্য মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষা জীবনের স্তম্ভস্বরূপ। এছাড়া সকল ছাত্রের জন্যও এসএসসি জীবনের প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাদের টেস্ট পরীক্ষার পর এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা হয়ে গেছে। ১৯৭১-এর ২২ এপ্রিল এসএসসি পরীক্ষা। আমি টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী সরকারী বিদ্যালয় থেকে প্রার্থী। পরীক্ষার জন্য জোর প্রস্তুতি চলছে আমাদের মতো প্রার্থীদের। অন্যদিকে তৎকালীন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে চলছে স্বাধীকার আদায়ের আন্দোলন। ইয়াহিয়া সরকার সংসদ অধিবেশন বসা নিয়ে টালবাহানা করছে। প্রতিদিন মিছিল-মিটিং চলছে সারা বাংলায়। মন কিছুতেই বসে থাকতে চায় না পড়ালেখায় কিন্তু জীবনের বড় পরীক্ষা আমাকে যে কাক্সিক্ষতভাবে অতিক্রম করতে হবেÑ আমার আত্মীয়স্বজন, স্কুলের শিক্ষক-ছাত্র সবাই আশা করছে আমরা কয়েকজন এবার স্কুলের জন্য গৌরব বয়ে নিয়ে আসব।

আগাগোড়াই টাঙ্গাইল শহর রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর। তখন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য দলের নেতৃবৃন্দ প্রায় প্রতিদিনই বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে সভার আয়োজন করতেন। যদিও আমি কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। তবুও প্রতিদিন বিন্দুবাসিনী মাঠের সভার নিয়মিত শ্রোতা ছিলাম। টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী মাঠ তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি ক্ষেত্র। সভা ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রশিক্ষণ হতো প্রতিদিন। প্রতিদিন পাড়ায় পাড়ায় মিছিল-মিটিং, দলে দলে বসে জল্পনা-কল্পনা হতো সংসদ অধিবেশন নিয়ে, ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে।

১৯৭১-এর ১ মার্চ হঠাৎ করেই জেনারেল ইয়াহিয়া ৩ মার্চের সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করল। এই ঘোষণায় গর্জে উঠল বাংলাদেশ। সত্যিকার অর্থে মুক্তির আন্দোলন তখন থেকেই রণযুদ্ধে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে যায় নিরস্ত্র মানুষের উপর পুলিশ, আধা সামরিক আর সামরিক বাহিনীর আক্রমণ।

৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। সমগ্র বাঙালী জাতি এই ভাষণ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দিকনির্দেশনা পাওয়ার আশা নিয়ে। কথা ছিল এই ভাষণ সরাসরি রেডিওতে প্রচার করা হবে। আমরা রেডিওর পাশে বসে থাকলাম উৎকণ্ঠা নিয়ে কিন্তু সরকার প্রচার করতে দেয়নি যদিও পরের দিন সকালে প্রচারিত হয়েছিল।

একদিকে সামনের মাসে পরীক্ষা অন্যদিকে দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন- কিছুতেই ঘরে বসে থাকতে চায় না মন।

২৫ মার্চের ভয়াল কালো রাত্রিতে ঢাকায় পাক হানাদার বাহিনীর আকস্মিক পৈশাচিক আক্রমণে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল সমগ্র বাঙালী জাতি। হাজার হাজার মানুষ যে যেভাবে সম্ভব ঢাকা ছেড়ে চলে আসছে গ্রামের দিকে। আমরাও টাঙ্গাইল ছেড়ে মামার বাড়ি পাইকড়া চলে গেলাম শুধু আব্বা রয়ে গেলেন যিনি তখন টাঙ্গাইলের পোস্ট মাস্টার। ৩ এপ্রিল পাকবাহিনী মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে টাঙ্গাইল দখল করে নেয়।

মাসখানেক পর পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলে আমরা আবার টাঙ্গাইল শহরে চলে আসি। ইতোমধ্যে আমাদের এসএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে জুলাই মাসে চলে গেছে।

টাঙ্গাইল এসে আবার পড়ালেখায় মনোযোগী হবার চেষ্টা করলাম। কিছুতেই মন বসে না। তখন মুক্তিযুদ্ধ কতদিন চলবে তার কোন ধারণা করা যাচ্ছে নাÑ সবাই ভিয়েতনামের দীর্ঘযুদ্ধের কথা ভাবছিÑ এছাড়া বিশ্বের সকল মুক্তিযুদ্ধই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। পড়তে বসে শুধু আঁকিঝুঁকি করি, টেস্ট পেপার বইয়ের প্রতি পাতায় পাতায় লিখি বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আর জয় বাংলা। মে মাসের দিকে কাদেরিয়া বাহিনী নতুন করে সংগঠিত হওয়ার খবর পেলাম। কোথাও কোথাও ছোটখাটো যুদ্ধের খবরও শোনা যাচ্ছে। যুদ্ধে যাবার জন্য মন তখন প্রস্তুত- কিন্তু এই বয়সে বাবা-মা কোনভাবেই যেতে দেবেন না অন্যদিকে সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এমনি একটি মহান সংগ্রামে কোন ভূমিকা রাখব না?

বড় ভাই (নাট্যকার মামুনুর রশীদ) কিছুদিন কাদেরিয়া বাহিনীতে থেকে তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে, মেজ ভাই (সাংবাদিক রেজাউল হাসান) আব্বার অফিসের সাইক্লোস্টাইল মেশিন নিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইশতেহার ছাপাতে ব্যস্ত, ভগ্নীপতি (আওয়ামী লীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন খান) কাদেরিয়া বাহিনীর বেসামরিক উপপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। মোয়াজ্জেম ভাইয়ের বাড়ি পুড়িয়ে ফেলায় আপা তার দুধের শিশুকে নিয়ে বনে-জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর আমি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। না এভাবে চলতে পারে না। একদিন শফির বাসায় শফি (বর্তমানে টাঙ্গাইলে ব্যবসায়ী), শরীফ (বর্তমানে ডেন্টাল সার্জন) আর আমি বসলাম। ভেবে চিন্তে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম টাঙ্গাইলে এসএসসি পরীক্ষা বানচাল করব। পরিকল্পনা করলাম- প্রথমে বিন্দুবাসিনী স্কুলের যারা ভাল ছাত্র তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে হবে। এদের বিরত রাখতে পারলে ওই স্কুলের অন্য ছাত্ররাও পরীক্ষা দেবে না। বিন্দুবাসিনীর ছাত্ররা পরীক্ষা না দিলে টাঙ্গাইলের অন্যান্য স্কুলের ছাত্ররাও অংশগ্রহণ করবে না বলে আমাদের বিশ্বাস। প্রথমে ভাল ছাত্রদের মুক্তিযোদ্ধাদের বরাত দিয়ে ডাকযোগে মৃত্যুর হুমকি দিয়ে চিঠি ছাড়লাম। যেহেতু ওরা আমাদের ঘনিষ্ঠজন তাই হাতের লেখা চিনে ফেলতে পারে বিধায় কার্বন কাগজ ব্যবহার করে মাত্রাবিহীন অক্ষর দিয়ে চিঠি লিখলাম। চিঠি ছাড়ার কয়েকদিন পর ওদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিলাম চিঠি পেয়েছে কিনা। দেখলাম চিঠি তো পেয়েছেই উপর্যুপরি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেÑ ভাবছে পরীক্ষা দেবে কি দেবে না। আমরা আরও ইন্ধন জোগালাম পরীক্ষা না দেয়ার পক্ষে। ওরা বলল কিন্তু যুদ্ধ কতদিন চলবে তার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই আর আমাদের জীবন তো নির্ভর করছে এই পরীক্ষার উপরই। অবশেষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার পক্ষে মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত হলো কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে পরীক্ষার আগের দিন। অন্যদিকে পাকবাহিনী এবং তাদের গোয়েন্দা বাহিনী পরীক্ষা সফলভাবে অনুষ্ঠিত করার জন্য সকল ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১৫ জুলাই পরীক্ষা শুরু হবে। আমরাও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি পাশাপাশি যদি বানচাল না করতে পারি। পরীক্ষা শুরুর আগের দিন আমরা সবাই স্কুলে গিয়ে প্রবেশপত্র গ্রহণ করলাম। প্রবেশপত্র নিয়ে আমরা স্কুলের পেছনে গেলাম যেখানে তখন একটা সুন্দর ছোট বাগান ছিল। যে প্রবেশপত্র আমাদের সুন্দর জীবনের দুয়ার খুলে দেবার কথা সেই প্রবেশপত্র প্রতিবাদ হিসেবে কেউ ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে, কেউ একটু-আধটু ছিঁড়ে ফেলছে। আমরা বিন্দুবাসিনী স্কুলের বেশ কিছু ছাত্র সেদিন ওই বাগানে সবাই হাতে হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করলাম যে, আগামীকাল থেকে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষায় আমরা কেউ অংশগ্রহণ করব না। তবে আমরা সবাই হলে যাব তারপর একসঙ্গে বেরিয়ে আসব।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা সবাই নির্দিষ্ট তারিখে বিন্দুবাসিনী বালিকা বিদ্যালয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকে গেলাম কড়া পাহারার মধ্যে। আব্বা আমাকে গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেলেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেবার ঠিক আগ মুহূর্তে আমরা জোট বেঁধে বেরিয়ে পড়লাম সেনাবাহিনীর কড়া পাহারার ফাঁক গলিয়ে। হল থেকে বেরিয়ে অন্য ছাত্রদের যখন বাধা দেবার চেষ্টা করছি তখন মাসুমের চাচা জানালেন পুলিশ আর গোয়েন্দা বাহিনী আমাদের খুঁজছে। আমরা সবাই রতীশের আদালত পাড়ার বাসায় একত্রিত হলাম। রতীশের মায়ের আপ্যায়নের পর যার যার বাসায় চলে গেলাম।

আমার বাসায় গিয়ে দেখি আব্বা তো রেগে আগুন হয়ে আছেনÑ আমার জন্য টিফিন নিয়ে গিয়ে অনেকক্ষণ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর পোস্টাল সুপার একজন অবাঙালী যিনি আমার পরীক্ষার খোঁজ জানেন। আমরা তখন টাঙ্গাইলের বিশ্বাস বেতকার একই কলোনিতে থাকতাম। আমি তখনই বাসার পেছনের দেয়াল টপকে চলে গেলাম মেজ খালার গ্রামের বাড়ি তারটিয়া। আমরা হয়ত সম্পূর্ণ পরীক্ষা বানচাল করতে পারিনি কিন্তু আংশিক যতটুকু করতে পেরেছিলাম তাতে সুসংগঠিত মুক্তিবাহিনীর কোন যোগাযোগ ছিল না। আমাদের কয়েকজনেরই ক্ষুদ্র প্রয়াস তৎকালীন পাক সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ এবং অচলাবস্থা সৃষ্টির নিমিত্তে। তারটিয়া খালার বাড়িতে একদিন থেকে পরের দিন চলে গেলাম মামার বাড়ি পাইকড়া। মন তখন আমার যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু কোথায় পাব তাদের আমার জানা নেই।

কয়েকদিন পর ফুফুর বাড়ি ঝনঝনিয়া গেলাম। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাত মিলছে না। কোন পথও খুঁজে পাচ্ছি না জীবনের এমনি একটি মহান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার।

একদিন দুপুরের পর ফুফুর বাড়ির বাইরে বসে আছি হঠাৎই দেখলাম পাশের চেয়ারম্যান বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর বীর সন্তানদের। তখন ভরা বর্ষাকাল। নৌকা ছাড়া ওই বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ নেই। দূর থেকে দেখলাম আমাদের টাঙ্গাইলের আকুর টাকুর পাড়ার মুসা ভাইকে। কিছুক্ষণ পর একটা নৌকা পেয়ে চেয়ারম্যান বাড়ি গেলাম। মুসা ভাই আমার বয়সে বেশ বড় হলেও আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। দেখে বললেন তুমি না এলে আমি লোক পাঠিয়ে তোমাকে ধরিয়ে আনতামÑ ভিন্ন কণ্ঠস্বর, ভিন্ন অভিব্যক্তি অথচ কি আদরই না করতেন মাত্র কয়েকদিন আগে। প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরে বুঝলাম এই বলাটাও আদরেরই ছিল- অনেকদিন পর দেখা।

আমাদের সঙ্গে যাবে? আমাকে বললেন।

আমি তো এক বাক্যে রাজি- এই সুযোগের জন্যই তো এতদিন অপেক্ষা করছি। মুসা ভাই প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি সত্যি সত্যি আমি ওনাদের সঙ্গে যাব। উনি বললেন, তাহলে যাও তোমার ফুফুর অনুমতি নিয়ে এসো। ফুফুকে বলতেই উনি তো কেঁদে কেটে অস্থির। তোর বাবা-মাকে আমি কি জবাব দেব? আমি তো নাছোড় বান্দা। ফুফুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি চড়ে বসলাম মুসা ভাইয়ের নৌকার বহরে। মুসা ভাই (টাঙ্গাইলের তৎকালীন বিশিষ্ট ছাত্রনেতা- মওলানা ভাসানীর অনুসারী) তখন কাদেরিয়া বাহিনীর দ্বিতীয় ব্যক্তি। ওনারা সেদিন বহেরাতৈল যাবেন নৌকায়। আমিও সঙ্গী হলাম- অনেক দূরের পথ। সারারাত ভরে নৌকার বহর এগিয়ে চলল বহেরাতৈলের দিকে। গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে আর মুসা ভাই আমার সঙ্গে নানা রসিকতা করতে লাগলেন। ওনার ছোট ভাই ছিল, আমার বন্ধু (বর্তমানে বিএনপি নেতা বাবুল চৌধুরী) যাকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে নির্মমভাবে অত্যাচার করেছিল। মুসা ভাই আমাকে বললেন, তুমিই তো বাবুলকে ধরিয়ে দিয়েছিলে, ঠিক আছে আগামীকাল তোমাকে নকুল বিলে গুলি করে হত্যা করা হবে। তোমার কি কি খেতে ইচ্ছে করে আজ খেয়ে নিও। যদিও বুঝতে পারছি রসিকতা করছেন তবুও মনে মনে কিছুটা ভয়ও পাচ্ছি। সবার হাতেই অস্ত্র। একজন লোক না বুঝে আমাকে মারার জন্য তেড়েই আসছিলেন, মুসা ভাই-ই হেসে তাকে থামিয়েছেন। মাঝরাতের পর আমাদের নৌকার বহর বহেরাতৈলের নকুল বিলে পৌঁছল। দূর থেকে সেন্ট্রির সিগনাল শুনলাম- বেশ শিহরিত হলাম।

মুক্তিবাহিনীর মধ্যে তখন তেমন নিয়মিত সেনাবাহিনীর লোক না থাকলেও নিয়ম-কানুন সব নিয়মিত সামরিক বাহিনীর মতো হয়ে গেছে। নৌকা থেকে পাল্টা সিগনাল দেয়া হলো। আমরা বহেরাতৈলের মাটিতে পা রাখলাম। কিছুক্ষণ পর পর হল্ট শুনতে হচ্ছে- দাঁড়াচ্ছি সবাই- চেক করে ছেড়ে দিচ্ছে। রাতে তেমন কিছু বুঝতে পারলাম না। খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। মাঝে মাঝেই সেন্ট্রিদের হল্ট শব্দ রাত্রির নিস্তব্ধতা খান খান করে দিচ্ছে। মায়ের আঁচল ছেড়ে তখন আমি টাঙ্গাইল থেকে বহুদূরে এক অজানা পাহাড়ের ক্যাম্পে শুয়ে যুদ্ধে যাবার স্বপ্নে বিভোর। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি অদ্ভুত মনোরম এক জায়গা বহেরাতৈল। যে জায়গাটায় কাদেরিয়া বাহিনীর ক্যাম্প মানে সেকেন্ড হেড কোয়ার্টার করা হয়েছে সেটি আসলে বিরাট এলাকা জুড়ে ফরেস্টার সাহেবদের অফিস, বাসস্থান, বাগান, বাংলো। পাশে একটা বাজার, একটা স্কুলও রয়েছে। সকালের নাস্তা খেয়ে সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মুসা ভাই ছাড়া আমার পরিচিত কেউ ছিল না। আমার বয়সী একজনই ছিল যার সঙ্গে সখ্যতা হয়ে গেল সহজেই। সেদিন থেকেই সকাল বিকেল ট্রেনিং শুরু করলাম। পনেরো বছর বয়স তখন আমার।

সেদিনই মুসা ভাই আমার হাতে তুলে দিলেন সুদৃশ্য এক পিস্তল যার শীতল স্পর্শে আমি আন্দোলিত হতে থাকলাম বারবার- সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। পিস্তলটি একবার হাতে রাখি, একবার কোমরে, আরেকবার পকেটে। সামনে সমুদ্রের মতো নকুল বিল, চারদিকে গজারির বন, মাঝখানে চমৎকার সাজানো বাংলো- বাগান, তার মধ্যে আমাদের যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি- সকাল বিকেল লেফট-রাইট আর বন্দুক তাক করা।

সন্ধ্যার সময় মুসা ভাই দাফতরিক কাজে বসতেন- বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসেছে নানা সংবাদ দিতে, খাজনা পরিশোধ করতে, দাফতরিক কাজের পর বসত আদালত। বন্দী রাজাকার আর দালালদের বিচার। বিচার শেষে শুরু হতো সাংস্কৃতিক কর্মকা-। কমান্ডার যাকে যা বলবেন তাকে তাই করতে হবে। কেউ নাটকের অভিনয় দেখালেন, কেউ কৌতুক পরিবেশন করলেন আবার কেউ গলা ছেড়ে গান গাইলেন। সবই খুব আনন্দদায়ক। সবশেষে কমান্ডারের নির্দেশ- আদেশমূলক বক্তব্য। সবই এত সুশৃঙ্খল যা নিজে না দেখলে বোঝা বা অনুভব করা যাবে না। আসর শেষে রাতের খাবার খেয়ে কেউ কেউ আড্ডা দিচ্ছে আবার কেউ শুয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে মাঝে সেন্ট্রিদের হাঁকডাক আর টর্চের আলো। এভাবেই চলছিল ক্যাম্পের জীবনযুদ্ধে যাবার আকাক্সক্ষা বুকে নিয়ে। একদিন দুপুরে হঠাৎ দেখি কমান্ডারের অফিসের বারান্দায় বসে আছে আমাদের স্কুলের মেধাবী ছাত্র সালাউদ্দীন ভাই, সবুর ভাই, হিলালী ভাই আর খয়ের। প্রথম ৩ জন ইন্টারমিডিয়ের ছাত্র আর খয়ের স্কুলের। আমি তো অবাক তাদের মতো মানুষ মুক্তিযুদ্ধে আসছে। তাদের কখনও কোন রাজনৈতিক কর্মকা- দেখিনি, কেবল লেখাপড়া আর খেলাধুলা। সবাই লুঙ্গীপরা আর সঙ্গে কাপড়ের ব্যাগ। ব্যাগ ভর্তি গ্রেনেড। আমি তো প্রিয় মানুষদের পেয়ে উৎফুল। উনারা হেডকোয়ার্টার থেকে গোলাবারুদ, গ্রেনেড নিয়ে টাঙ্গাইল শহরে যাচ্ছেন। উনারা চলে যাবার পর আবার একা হয়ে গেলাম। এর কিছুদিন পর শুনতে পেলাম অমায়িক মেধাবী সালউদ্দীন ভাইকে রাজাকাররা ধরে জবাই করে মেরেছে। এর মধ্যে আকবর ভাই একদিন এলেন হেডকোয়ার্টার থেকে পাইকড়া যাবেন বলে। মুসা ভাই আমাকে বললেন তুমি আকবরের সঙ্গে যাও, বাবা-মাকে বলে আবার এসো। আমি মনে কষ্ট নিয়ে পরের দিন আকবর ভাইয়ের সঙ্গে পাইকড়া মামার বাড়ি এলাম। এর মাঝে বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী ধলাপাড়ার যুদ্ধে আহত হলে কাদেরিয়া বাহিনী কিছুদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাজাকার আর দালালরা গ্রামে গ্রামে ঢুকে কিশোর-যুবকদের ধরে নিয়ে যেতে লাগল। আমি ফুফাত ভাইদের সঙ্গে আত্মরক্ষার্থে আবার সখীপুরের বড় চওনা পাহাড়ে চলে গেলাম। মাসখানেক পর খবর পেলাম আব্বা-মা আমার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছেন। আমি দীর্ঘ পাহাড়ী পথ হেঁটে শালগ্রামপুর হয়ে পরে নৌকায় কয়েকদিন পর টাঙ্গাইল শহরে পৌঁছলাম। বড় ভাই তখন স্বনামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করছেন, ভগ্নীপতি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে, মেজ ভাই পাকবাহিনীর ভয়ে পালিয়ে আর চাচা দালালদের ষড়যন্ত্রে জেলখানায়। আব্বাকে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। মা পাকবাহিনীর দোসরদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে কোন সাহায্য পাননি। অবশেষে আব্বার অফিসের অবাঙালী পোস্টাল সুপার আব্বাকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন নইলে হয় তো আমরা পিতৃহীন হয়ে পড়তাম। আমরা আবার শহরে সংগঠিত হলাম। বিশ্বাস বেতকা মুকুল (বর্তমানে টাঙ্গাইলের বিশিষ্ট শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ) দের বাসায় আমরা প্রতিদিন বসতাম দিনের বেলায়। হিলালী ভাই, মুকুল, বাবলু, ডাব্লুদা আর আমি। অন্যদিকে ফিরোজ- পল্টু নজরুলদের একটি দল ছিল থানাপাড়ায়। প্রতিদিন সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসলেই গ্রেনেড আর বোমা হামলায় প্রকম্পিত হতো টাঙ্গাইল শহর। আর এই হামলা করত আমাদের মতো সব তরুণ-কিশোর মুক্তিযোদ্ধারা। সারাদিন আমরা ঘুরে ঘুরে শহরের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতাম। আমরা এতটাই ছোট ছিলাম যে কেউ আমাদের সন্দেহ করত না। এভাবে বিভিন্ন ছোট ছোট দলে শহরের তরুণ-কিশোররা বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত ছিল। এক দল অন্য দলকে জানত না। বন্ধু সেলিম মধ্য আগস্ট টাঙ্গাইল এসেই গ্রেফতার হয়ে গেল। পরে আমার ছোট চাচা আর সেলিম টাঙ্গাইল মুক্ত হলে জেলখানা ভেঙ্গে অন্যদের সঙ্গে মুক্ত হলো।

যুদ্ধের সময় আমাদের সবাইকে প্রতিরাতে গ্রেনেড আর গুলির শব্দের নেশায় পেয়েছিল। প্রতিরাতে গুলির শব্দ না শুনলে ঘুমই হতো না। তখন আমরা বুঝতে পারতাম কোন গুলি কোন আগ্নেয়াস্ত্রের। তখন সেভাবেই চিনেছিলাম থ্রি নট থ্রি, এসএলআর, এলএমজি, বেটা গান, লেন্সার, মর্টারসহ সকল আগ্নেয়াস্ত্রের নাম।

আমার এই ঘটনাপ্রবাহ হয়ত মুক্তিযুদ্ধের জন্য তেমন তাৎপর্যপূর্ণ কিছুই নয় কিন্তু আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে আমার জীবন। আমার তখন কোন রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা ছিল না তবুও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কাছে সপে দিয়েছিলাম আমার জীবনকে, আমার জীবনের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষাকে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের মতো। যুদ্ধ শেষে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছি লেখাপড়ায় একজন সাধারণ ছাত্র হয়ে- মুক্তিযোদ্ধা হয়ে নয়।

শীর্ষ সংবাদ:
মালির নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা         আজারবাইজান- আর্মেনিয়া যুদ্ধ ॥ নিহত বেড়ে ৯৫         মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর করে ফের ভেনিজুয়েলায় ইরানি ট্যাংকার         যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২২৯০ কোটি টাকার অস্ত্র কিনছে ভারত         সাহেদের যাবজ্জীবন ॥ আড়াই মাসেই অস্ত্র মামলায় রায়         আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই শেখ হাসিনার জন্মদিন পালন         বেসরকারী মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজ আইনের খসড়া অনুমোদন         এ পর্যন্ত ৭ জন গ্রেফতার ৩ জন রিমান্ডে বিক্ষোভ, সমাবেশ         বিদেশী ঋণে জর্জরিত ঢাকা ওয়াসা         সুপ্রীমকোর্ট প্রাঙ্গণে মাহবুবে আলমকে শেষ শ্রদ্ধা         দেশে করোনা রোগী শনাক্তের হার বেড়েছে         দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না সৌদি প্রবাসীদের         মুজিববর্ষে গৃহহীনদের ৯ লাখ ঘর দেবে সরকার         তদারকির অভাব নৌ যোগাযোগ খাতে         আজন্ম উন্নয়ন যোদ্ধার অপর নাম শেখ হাসিনা ॥ কাদের         অসময়ের বন্যায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে কৃষক         মৌজা ও প্লটভিত্তিক ডিজিটাল ভূমি জোনিং ম্যাপ হচ্ছে         শেখ হাসিনার জন্মদিনে স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত         নবেম্বরে আসতে পারে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন ॥ স্বাস্থ্যমন্ত্রী