ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২০ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াফতে আইন হচ্ছে ॥ আইনমন্ত্রী

প্রকাশিত: ০৬:১৩, ১২ ডিসেম্বর ২০১৬

যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াফতে আইন হচ্ছে ॥ আইনমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ-িতদের সম্পদ বাজেয়াফত করার আইনের খসড়ার কাজ চলছে। মানবাধিকার ও আইনের শাসন মানুষের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুদৃঢ় করার জন্য সরকার সব রকম সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। সংবিধানের ২২ ও ১১২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সরকার কাজ করে যাচ্ছেন। আজকের বাস্তবতা হচ্ছে সরকার বিচার বিভাগের কোন বিচারিক কাজেই হস্তক্ষেপ করে না। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিচারিক কাজে বিচারক এবং বিচারপতিবৃন্দকে কোনভাবেই নির্বাহী বিভাগ কোন হস্তক্ষেপ করে না। এটা আমরা করি না। এটা বাংলাদেশের কালচারে আগে যা ছিল, তার আমূল পরিবর্তন কিন্তু হয়েছে এবং সেজন্যই আমি মনে করি ১১৬(ক) আমরা সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগ বলেন, অন্যান্য বিভাগ বলেন, আমরা সম্পূর্ণ মেনে চলছি, সম্মান করে যাচ্ছি এবং সম্মান করে যাব।’, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সংবিধানে যেসব অনুচ্ছেদ রয়েছে সরকার তা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলছে। রবিবার বাংলা একাডেমির অডিটোরিয়ামে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তৃর্ণমূল পর্যায়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১০ জন মানবাধিকারকর্মীকে পদক প্রদান করা হয়। মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মানবাধিকার রক্ষায় অত্যন্ত আন্তরিক এবং দেশে আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যে কোন ধরনের সহিংসতা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান এবং এ ধরনের সহিংসতাকারী অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার বিষয় নিশ্চিত করেছে। মানবাধিকার রক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালীকরণে সরকার কাজ করছে। অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে আইনী সহায়তা প্রদানের জন্য জাতীয় আইনগত সহায়তা আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে বিচার ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে। জনগণ যেন তার জানার অধিকার পায় এজন্য দ্রুততম সময়ে সরকার তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গণমাধ্যম এখন পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে, জনগণ স্বাধীনভাবে তাঁদের মতামত প্রকাশ করছে। মানুষের অধিকার রক্ষায় যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ সবই মানবাধিকার রক্ষার আবশ্যিক উপাদান। তবে পূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের যেতে হবে আরও অনেকদূর। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মানবতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হচ্ছে মানবাধিকার ঘোষণার মূল মন্ত্র। তাই মানবাধিকার রক্ষার দ্বায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি মানুষের! সমাজের প্রতিটি বিভাগে প্রত্যেকটি মানুষের রয়েছে দায়িত্ব, তার অধিকার বুঝে নেয়ার। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার বুঝে নেয়া দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মানবাধিকার একদিকে যেমন মানুষের সচেতনতার ওপর নির্ভরশীল অন্যদিকে তেমনি পরস্পরের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমেও অন্যের অধিকার তথা মানবাধিকার সুচারুভাবে প্রতিপালিত হয়ে থাকে। আনিসুল হক বলেন, অপ্রিয় হলেও এ কথা সত্য যে আমাদের সমাজে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি দরিদ্রতা ও প্রান্তিকতার কারণেও মানুষ সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে ও আইনগতভাবে বঞ্চিত হয়। আমাদের সরকার সব সময় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের পাশাপাশি বৈষম্য ও বঞ্চনার হাত থেকে জনগণকে রক্ষা করতে। সরকারের এই উদ্যোগের সঙ্গে বেসরকারী সংস্থা ও বিদেশী উন্নয়ন সংস্থাগুলো হাত মেলালে, সেই হাত আরও বেশি শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, সকলে মিলে কাজ করলে অচিরেই আমরা বাংলাদেশকে মানবাধিকার চর্চার ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারব। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে বিশেষ বিধান রাখার সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, বিশেষ বিধানের আলোচনায় গিয়ে আমরা আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যকেই ভুলে যাচ্ছি। এ আইনের মূল কথা হচ্ছে ১৮ বছরের আগে কোন কন্যাকে এবং ২১ বছরের আগে কোন পুরুষকে বিয়ে দেয়া যাবে না বা তারা বিয়ে করতে পারবে না। কেবল বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব হলে পিতা-মাতার সম্মতিতে এবং আদালত অনুমতি দিলে ১৮ বছরের আগে কোন কন্যাকে বিয়ে দেয়া যাবে। তিনি বলেন, আমাদের আজকের যে বাস্তবতা, আমাদের গ্রামের যে অবস্থা সেই অবস্থার নিরিখেই বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে এই বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তাই ওই আইনে এই বিশেষ বিধানযুক্ত থাকাতে আইনের মূল উদ্দেশ্য নস্যাত বা ব্যহত হয়নি বলে তিনি মনে করেন। অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাজাপ্রাপ্ত ও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে এ সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া প্রস্তুতকরণে কাজ চলছে। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ এর গবর্নিং বোর্ড চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল এবং বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান সেলিনা হোসেন বক্তব্য রাখেন। যা যা প্রয়োজন দেব, আপনারা ন্যায়বিচার দিন ॥ কোর্ট রিপোর্টার জানান, আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক আইনজীবী ও বিচারকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা আপনাদের যা যা প্রয়োজন দেব, বিনিময়ে আপনারা বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দিবেন’। গতকাল রোববার বিকেলে ঢাকা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত মিলনায়তনের উদ্বোধন এবং আইন পেশায় ৫০ বছর পূর্তি ১৭ জন আইনজীবীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সমিতির সভাপতি এ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান মানিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী প্রধান অতিথি এবং খাদ্য মন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইমলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান, মহানগর দায়রা জজ মোঃ কামরুল হোসেন মোল্লাসহ জেলা ও দায়রা জজ, মহানর দায়রা জজ, সিএমএম, সিজেএম আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারক এবং ঢাকা বারের সিনিয়র আইনজীবীবৃন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বিজ্ঞ আইনজীবীদের সংবর্ধনায় এসে আমি আজ আমার পিতাকে (মরহুম এ্যাডভোকেট সিরাজুল হক) মিস করছি। কারণ তিনি আজ যারা সংবর্ধিত হচ্ছেন তাদের সঙ্গে মিশেছেন। তাই আজ আমি এখানে আসতে পেরে ধন্য হয়েছি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সবার শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। তার নামে মিলনায়তনের নামকরণও গর্বের বলে আমি মনে করি। উল্লেখ্য প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ্যাডভোকেট মোঃ জিল্লুর রহমানের নামে মিলনায়তনটির নামকরণ করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বার ও বেঞ্চের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকতে হবে তেমনি বিচার প্রার্থীদেরও ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে আপনাদের কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আপনাদের বার ভবন করার জন্য ঢাকা দিয়েছেন, লাইব্রেরির বই কেনার জন্য টাকা দিয়েছেন। সমিতির ফান্ডের জন্য আরও ১০ কোটি টাকা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী জেলা জজদের বেতন ৪০ হাজার থেকে ৭৮ হাজার টাকা করেছেন। একজন সহকারী জজের বেতন ৪০ হাজার টাকা করেছেন। আপনাদের যা যা প্রয়োজন আমরা করছি এবং করব বিনিময়ে শুধু আপনারা বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে কাজ করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা এবং এটা বঙ্গবন্ধুরও প্রত্যাশা ছিল। আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে খাদ্য মন্ত্রী কামরুল ইমলাম বলেন, যেখানে উন্নয়নের বিষয় জড়িত সেখানে দলমত নির্বিশেষে আমরা সকল আইনজীবী উপস্থিত থাকি। আজ উপস্থিতি তা প্রমাণ করে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় দেশে আইনের শাসন বিদ্যমান। তিনি আরও বলেন, ১/১১ সরকার বিচার বিভাগ শুধু কাগজকলমে পৃথকীকরণ করে। কিন্তু এর সাংবিধানিক রূপ দিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথির বক্তব্যের আগে আইন পেশায় ৫০ বছর পূর্তি ১৭ জন আইনজীবীকে ক্রেস্ট এবং কাশ্মীরী চাদর দিয়ে সংবর্ধিত করা হয়। সংবর্ধিতরা হলেন, এ্যাডভোকেট লুৎফে আলম, সরদার মোঃ সুরুজ্জামান, আফছার উদ্দিন আহমেদ খান, এনায়েত হোসেন খান, ফকির দেলোয়ার হাসেন, এএফএম আব্দুল ওয়াদুদ, এসএম নুরুল হক, সৈয়দ আহমেদ, মোঃ আব্দুল আজিজ, ব্যারিস্টার এম আমিরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, ড. রফিকুর রহমান, আফতাব উদ্দিন আহমেদ, মোঃ মঞ্জুর উর রহিম, এবিএম রফিক উল্লাহ, আব্দুল হক খান ও খন্দকার আবুল হাশেম। সংবর্ধিতদের মধ্যে প্রথম ১০ জন উপস্থিত থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেন।