ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৬ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক শিল্পীর খবর কেউ রাখে না ॥ তিমির নন্দী

প্রকাশিত: ০৬:৩৬, ৬ ডিসেম্বর ২০১৬

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক শিল্পীর খবর কেউ রাখে না ॥ তিমির নন্দী

স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক শিল্পী তিমির নন্দী। কিশোর বয়স থেকে এখনও পর্যন্ত সমান জনপ্রিয়তায় সঙ্গীতাঙ্গনকে আলোকিত করে চলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দলবেঁধে গান গেয়ে উজ্জীবিত করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের, সংগঠিত করেছিলেন লাখ লাখ শরণার্থীসহ সাধারণ মানুষদের। বসুন্ধরায় জিপি ভবনে আজ বিকেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন গুণী এই শিল্পী। আজকের পরিবেশনা ও তার দেখা সে সময়ের ঘটনাবলী বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। আজকের পরিবেশনা সম্পর্কে বলুন তিমির নন্দী ॥ অনুষ্ঠানটি যেহেতু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে আমার জীবনের অনেকখানি জড়িয়ে আছে। আজকের অনুষ্ঠানে আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানই পরিবেশন করব। কিভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন? তিমির নন্দী ॥ খুব ছোটবেলা থেকেই গানের জগতে আছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ১৫ বছর। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আমাকে দেশপ্রেমে নতুনভাবে উজ্জীবিত করে। সে সময় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এলাকায় গিয়েছিলাম বেড়াতে, কিন্তু দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিলীতার কারণে সেখানে থেকে একটি সংঘবন্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় গণসঙ্গীত গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করতাম। সেখান থেকে ১২ মাইল দূরে বাগুয়া গ্রামে অবস্থান নিলাম। প্রতি রাতে অনেকের সঙ্গে লাঠি হাতে গ্রাম পাহারা দিতাম। রেডিওতে সে সময়ে পাকিস্তানীদের বর্বরতা ও নিষ্ঠুর হত্যার খবর শুনে ক্রোধে জলতাম। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারেরও বিভিন্ন অনুষ্ঠান শুনে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অদম্য নেশা চেপে বসে। জীবন বাজি রেখে অনেক কষ্টে কলকাতায় পৌঁছি। সেখানে সেখানে গিয়ে দেখি চিত্রনায়ক উত্তম কুমারসহ পশ্চিমবাংলার অনেক মহান শিল্পীরা শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য রাস্তায় নেমেছে। মুক্তিযুদ্ধের জন্য তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখে আমি দারুণভাবে যুদ্ধে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেলাম। আমার মাকে বলেছিলাম মুক্তিযুদ্ধে যাব। মা বলল, যুদ্ধেই যদি যাবে, তাহলে তোমার কণ্ঠ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়, যোগ দাও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে খুঁজতে লাগলাম কোথায় স্বাধীন বাংলা বেতারের কেন্দ্র। আমার মেজদার কাছে শুনে কলকাতার ৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সন্ধান পেলাম। সেখানে গিয়ে অজিত রায়, সূজেয় শ্যাম, আপেল মাহমুদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, সমর দাশ, সব পরিচিত মুখের সন্ধান পাই। যারা চিনত না তারা সবাই টেনে নিল আমাকে। সেখানে নিয়মিত গান রচনা, সুর ও রেকর্ড হতো এবং স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচার হতো। সে সময়ের কোন স্মৃতির কথা বলুন তিমির নন্দী ॥ সে সময়ের সবই এক একটা স্মৃতি। স্বল্প পরিসরের একটি বাড়িতে সবাই খুব কষ্ট করে থাকত। প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় যেতাম গণসঙ্গীত গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ সব মানুষের প্রেরণা যোগাতাম। ‘শরণার্থী শিল্পীগোষ্ঠী’ নামে একটি সংগঠনও করেছিলাম আমরা কয়েকজন। এতে অভিনেতা মামুনুর রশীদ, আসাদুজ্জামান নূর, মিতালী মুখার্জী, ফকির আলমগীর, সুব্রত সেন গুপ্ত, কমল সরকার, শুক্লা দেসহ অনেকে ছিলেন। বিভিন্ন জায়গান অনুষ্ঠান করে আমরা যে অর্থ পেতাম সেগুলো মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ তহবিলে জমা দিয়ে দিতাম। সে সময় আকাশ বাণী কলকাতার বিশিষ্ট সংবাদ পাঠক দেব দুলাল বন্দোপাধ্যায় একটা অনুষ্ঠানে আমার নাম উল্লেখ করে আমার গাওয়া একটি গান প্রচার করেছিলেন। গানটির প্রথম চরণ হলো ‘ধ্বংসের পরোয়ানা শোন কি, টাইফুন হাইফুন আকাশে, মরা-পচা বারুদের গন্ধ ভাসে আজ পৃথিবীর বাতাসে’। আমি গানটি শুনে দারুণভাবে গর্ব অনুভব করতে লাগলাম। এছাড়া সে সময় ১৬ ডিসেম্বর সকালে স্বাধীন বাংলা বেতারে যখন একটি গানের রিহার্সাল করছি, তখন খবর এলো ঢাকায় পাকিস্তনীরা আত্মসমর্পণ করেছে। তখন স্বজন হারানো বেদনা আর বিজয়ের আনন্দ একাকার হয়ে নতুন এক অনুভবের জন্ম দিল। স্বাধীন বাংলা বেতারের সবশেষ গানটি কি ছিল? তিমির নন্দী ॥ যখন খবর এলো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই মুহূর্তে শহীদুল ইসলামের রচনা ও সূজেয় শ্যামের সুরে ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ গানটি তখনই রিহার্সাল করা ও রেকর্ড করা হয়। গানটির লিড করেছিলেন অজিত রায়। এটি ছিল স্বাধীন বাংলা বেতারের সর্বশেষ এবং মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গান। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের নিয়ে আপনার কাজের অগ্রগতি কেমন? তিমির নন্দী ॥ আমি মূলত যে সব শিল্পীরা জীবন বাজি রেখে তাদের কণ্ঠ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, কিন্তু তাদের অনেককেই এখনো পর্যন্ত কেউ চিনে না তাদের পরিচিত করানোর জন্যই কাজটি হাতে নিয়েছি। এ কাজের জন্য আমাকে কেউই দায়িত্ব দেননি। আমি আমার কর্তব্যবোধ থেকেই এ কাজটি করার চেষ্টা করছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক শিল্পীদের খবর কেউ রাখে না। বিটিভিতে ‘হৃদি কল্লোলে’ নামে প্রতিমাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বেলা ১১টায় আমার একটি অনুষ্ঠান প্রচার হয়। এতে আমি স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের এই সব অপরিচিত শিল্পীদের তুলে এনে মানুষের কাছে পরিচিত করানোর চেষ্টা করি। কারণ তারাও এক একজন মুক্তিযোদ্ধা। এবার চট্টগ্রামের শিল্পীদের নিয়ে এ আয়োজন করার চেষ্টা করছি। -গৌতম পাণ্ডে
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২