ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

গোয়েন্দা জালে শীর্ষ জঙ্গী মারজান ও রাজীব গান্ধী!

প্রকাশিত: ০৬:০৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

গোয়েন্দা জালে শীর্ষ জঙ্গী মারজান ও রাজীব গান্ধী!

শংকর কুমার দে ॥ নব্য জেএমবির শীর্ষ জঙ্গী নূরুল ইসলাম মারজান ও রাজীব গান্ধী কি গোয়েন্দা জালে আটকা! আজিমপুর জঙ্গী আস্তানা থেকে কিশোর জঙ্গী তাহরীম কাদেরী রাসেলকে উদ্ধারের পর গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গী সংগঠনটির সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। আজিমপুর জঙ্গী আস্তানা থেকে মিরপুরের রূপনগরে যাওয়ার পর পুলিশ অভিযানে মেজর (অব) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ নিহত হন বলে জবানবন্দীতে বলেছে চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোর জঙ্গী রাসেল। তাকে আজ বৃহস্পতিবার তিন দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে পাঠানো হবে। তদন্তকারীরা আজিমপুরের জঙ্গী আস্তানা থেকে উদ্ধার করেছে নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় নিহত নব্য জেএমবির প্রধান তামিম আহমেদ চৌধুরীর হাতের লেখা একটি চিরকুট। এই চিরকুটে লেখা রয়েছে নব্য জেএমবির পরবর্তীতে সাংগঠনিক হাল কে ধরবে, কিভাবে কাজ করবে তার দিকনির্দেশনা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় নিহত নব্য জেএমবির প্রধান তামিম আহমেদ চৌধুরী, মিরপুর রূপনগরে নিহত মেজর (অব) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, পলাতক নুরুল ইসলাম মারজান, বাসারুজ্জামান চকোলেটসহ শীর্ষ স্থানীয় ‘জঙ্গী আঙ্কেলদের’ আজিমপুর জঙ্গী আস্তানায় যাতায়াত ছিল বলে জবানবন্দীতে জানিয়েছে কিশোর জঙ্গী রাসেল। মেজর জাহিদ ওরফে মুরাদ নিহত হওয়ার আগে সপরিবারেই থাকতেন আজিমপুর জঙ্গী আস্তানায়। আজিমপুর জঙ্গী আস্তানা থেকে মেজর জাহিদের এক সন্তান পিংকিকে উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও তার স্ত্রী জেবুন্নাহার শীলা দশ মাস বয়সী এক শিশুসন্তানকে নিয়ে পলাতক। আজিমপুর জঙ্গী আস্তানায় আসার আগে কিশোর জঙ্গীর পরিবারটি উত্তরা, মিরপুর, শ্যামলী, পল্লবী, বসুন্ধরায় ছিল বলে পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দীতে জানিয়েছে রাসেল। এসব বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল তামিম, মারজান, মেজর জাহিদসহ নব্য জেএমবির অনেক শীর্ষ পর্যায়ের নেতার। শীর্ষ জঙ্গীদের সঙ্গে দেখাও হয়েছে তার। শীর্ষ জঙ্গীদের আঙ্কেল বলে সম্বোধন করত রাসেল। আজিমপুর জঙ্গী আস্তানায় পুলিশের অভিযানে কিশোর জঙ্গী রাসেলের বাবা আবদুল করিম ওরফে তানভীর কাদেরী নিহত হয়েছে ও তার মা আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা আহত অবস্থায় আটক হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আজিমপুরের জঙ্গী আস্তানা থেকে উদ্ধারের পর গ্রেফতার হওয়া তানভীর কাদেরীর ছেলে চৌদ্দ বছর বয়সী তাহরীম কাদেরী রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তদন্তের স্বার্থে তার দেয়া জবানবন্দীতে যেসব তথ্যের কথা উল্লেখ করেছে সেই ব্যাপারে মুখ খুলছেন না কর্মকর্তারা। এই কিশোর জঙ্গী কাউন্টার টেররিজম ইউনিট হেফাজতে আছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর লালবাগ থানায় করা মামলায় কিশোরকে তিন দিন পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয় ঢাকার একটি আদালত। নিহত জঙ্গী তানভীর কাদেরীর ছেলে কিশোর জঙ্গীকে হেফাজতে নেয়া হয় সোমবার। এই কিশোর জঙ্গীকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদনে বলা হয়, আজিমপুরের বাসায় যাতায়াতকারী কয়েক অজ্ঞাত পুরুষ ও নারী জঙ্গী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করেছে। জঙ্গী আস্তানার সন্ধান ও জঙ্গীর নাম-ঠিকানা জানার জন্য কিশোরকে নিয়ে অভিযান চালানো প্রয়োজন। আজ বৃহস্পতিবার তার দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হবে বলে জানা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, রাজধানীর বসুন্ধরায় তানভীর কাদেরী যে ভাড়া বাসায় ছিলেন সেখানেই থাকত গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী পাঁচ জঙ্গী। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী হামলার প্রধান সমন্বয়ক তামিম চৌধুরী তাদের ওই বসুন্ধরার বাসায় এসেছিলেন। বসুন্ধরার ভাড়া করা বাসার আলাদ একটি কক্ষে থাকতেন গুলশানে হামলাকারী পাঁচ জঙ্গী। তার মা আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা যিনি আহত অবস্থায় আটক হয়ে চিকিৎসাধীন তিনি পাঁচ জঙ্গীর খাবার রান্না করে দিতেন এবং সে (রাসেল) তাদের খাবার দিয়ে আসত। গুলশান হামলার দিন রাতেই বসুন্ধরার ওই বাসা ছাড়েন তামিম চৌধুরী আর তার পরের দিন সকালে বাসা ছেড়ে যায় তানভীর কাদেরীর পরিবার। এই বাসাটি আবদুল করিম নামে ভাড়া নিয়েছিল তার বাবা আজিমপুরে নিহত তানভীর কাদেরী। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর আজিমপুরের ২০৯/৫ নম্বর ছয় তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় জঙ্গী আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশ অভিযানের পর ওই বাসা থেকে পুলিশ উদ্ধার করে তানভীর কাদেরীর (৪২) লাশ। ওই বাসা (জঙ্গী আস্তানা) থেকে তানভীর কাদেরীর ছেলে কিশোর জঙ্গী রাসেলকে উদ্ধারের পর গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিশোর জঙ্গী রাসেল ছাড়াও ওই বাসা থেকে তিন নারী জঙ্গী গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে, নিহত তানভীর কাদেরীর স্ত্রী অর্থাৎ গ্রেফতার হওয়া রাসেলের মা আবেদা তুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা (৩৫), পলাতক শীর্ষ জঙ্গী নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তি (২৫) ও পলাতক আরেক শীর্ষ জঙ্গী বাশারুজ্জামান ওরফে চকোলেটের স্ত্রী শায়লা আফরিন (২৫)। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গ্রেফতার হওয়া এই তিন নারী জঙ্গী। পলাতক শীর্ষ জঙ্গী মারজান ও বাশারুজ্জামানÑ এই দুইজনের স্ত্রী গ্রেফতার হলেও তারা গ্রেফতার এড়িয়ে অন্য জঙ্গী আস্তানায় আত্মগোপন করে আছে, গ্রেফতারের জন্য পুলিশ খুঁজছে। কিশোর জঙ্গী রাসেল জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, তার এক যমজ ভাই আছে। মিরপুর বাসায় তারা যখন ছিল তখন আরেক শীর্ষ জঙ্গীর কাছে তাকে দেয়া হয়েছে। সেও জঙ্গী। তার যমজ ভাইকেও খুঁজছে পুলিশ। তাদের বাসায় আসতেন গুলশান হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত জঙ্গী বাসারুজ্জামান। সে (রাসেল) তাকে চকোলেট ‘আংকেল’ নামে ডাকত। মিরপুর, বসুন্ধরা, পল্লবী ও আজিমপুরের বাসায় এসে বাশারুজ্জামান তার বাবা নিহত তানভীর কাদেরীর সঙ্গে দেখা করতেন। তার যমজ ভাইটি বাসারুজ্জামানের কাছেই রয়েছে বলে পুলিশকে জানিয়েছে রাসেল। রাসেল জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, বসুন্ধরার বাসায় তারা যখন ছিল তখনই সে জানত যে, বড় ধরনের একটি হামলার প্রস্তুতি চলছে, যা পরে গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা হয়। এই হামলার খবরটি অনলাইনে ও টিভিতে দেখে সে। হামলার পরের দিন সকালেই তারা বসুন্ধরার বাসাটি ছেড়ে চলে যায়। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, আজিমপুরের জঙ্গী আস্তানা থেকে চারটি পিস্তল, চারটি ল্যাপটপ, পেনড্রাইভ, চার লাখ টাকা, মেজর জাহিদের একটি ডায়েরি, তার স্ত্রী জেবুননাহার ইসলাম নামের আরেক নারীর পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র উদ্ধারের পাশাপাশি একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় নিহত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী হামলার প্রধান সমন্বয়ক ও নব্য জেএমবির প্রধান তানভীর আহমেদ চৌধুরীর হাতের লেখা চিরকুট। এই চিরকুটটিতে লেখা রয়েছে তার (তামিম) অনুপস্থিতিতে জঙ্গী সংগঠনটির হাল ধরার জন্য পর্যায়ক্রমে মেজর জাহিদ ওরফে মুরাদ (মিরপুরে নিহত), নুরুল ইসলাম মারজান, রাজীব গান্ধীর নাম উল্লেখ রয়েছে। শীর্ষস্থানীয় এসব জঙ্গী নেতা যাতে ধরা না পড়ে এবং আত্মগোপনে থেকে জঙ্গী সংগঠনটির হাল ধরে। তার হাতের লেখা চিরকুটের লেখায় তদন্তকারীদের ধারণা, তামিম আহমেদ চৌধুরী যে ধরা পড়বে, মারা যাবে তা সম্ভবত নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় নিহত হওয়ার আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন।