ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

পাহাড়ে হেডম্যানদের অনিয়মের প্রতিবাদে নীরব বার্তা “খক তুত বন”

মেহেদী হাসান রানা, আলীকদম-লামা,বান্দরবান

প্রকাশিত: ২১:০৫, ৬ মার্চ ২০২৬

পাহাড়ে হেডম্যানদের অনিয়মের প্রতিবাদে নীরব বার্তা “খক তুত বন”

পাবত্য অঞ্চলের মৌজা ব্যবস্থাপনা ও ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কিছু হেডম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয়রা। পাহাড়ের সাধারণ জুমচাষী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দাবি, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে জমি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার ফলে প্রকৃত ভোগদখলকারীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হেডম্যান রিপোর্ট দেওয়ার বিষয়টি পাহাড়ি এলাকায় জমি সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই রিপোর্টকে কেন্দ্র করেই অনেক সময় নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে টাকা নিয়ে খাস জমির জন্য হেডম্যান রিপোর্ট দেওয়া হয় পর্যটকদের জন্য রিসোর্ট বানানোর জন্য। 

আবার একই জায়গা একাধিক ব্যক্তির নামে বণ্টন করার ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়দের দাবি। এমনকি কারও কাছে জমি বিক্রি করার পরও পরে সেই জমির ওপর আবার দাবি করা বা হেডম্যানের প্রভাব দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে চাপ প্রয়োগ করার ঘটনাও শোনা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কারণে অনেক দুর্বল ও দরিদ্র জুমচাষী তাদের জমি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। অনেক সময় তারা নিজেদের অধিকার রক্ষায় প্রতিবাদ করার মতো অবস্থাতেও থাকেন না। ফলে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নীরব ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।

এমন বাস্তবতা তুলে ধরতে এবং জনসাধারণকে সচেতন করার লক্ষ্যে আলীকদমের ম্রো সম্প্রদায়ের কিছু শিক্ষিত তরুণ অভিনয়ের মাধ্যমে এক ধরনের নীরব প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছেন। তারা একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও নির্মাণ করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে “খক তুত বন”। 

ভিডিওটির মাধ্যমে পাহাড়ে বসবাসকারী সাধারণ জুমচাষীদের জীবনসংগ্রাম, জমি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ভিডিওটিতে অভিনয় করেছেন সেথং ম্রো, মেনথাব ম্রো, পারিং ম্রো, সাকনাও ম্রো, মাংইন ম্রো, পংক্লিম ম্রো, সিনতুই ম্রো, মাংরুম ম্রো, পারাও ম্রো, মেনরিং ম্রো, পুষা ম্রো এবং লাওলি ম্রো (মেশা)। জানা গেছে, তাদের অনেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও ডিগ্রি পর্যায়ে অধ্যয়নরত। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজ নিজ সম্প্রদায়ের সামাজিক বিষয়গুলো নিয়েও তারা সচেতনভাবে কাজ করার চেষ্টা করছেন।

এই ভিডিওটি নির্মাণে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকলেও তরুণরা নিজেদের উদ্যোগে এবং নিজস্ব অর্থায়নে এটি তৈরি করেছেন। তাদের মতে, সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে অভিনয় ও গল্পের মাধ্যমে বাস্তব সমস্যাগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।

ভিডিও নির্মাণে যুক্ত তরুণদের একজন জানান, পাহাড়ে অনেক বিষয় আছে যেগুলো সাধারণ মানুষ বলতে চান, কিন্তু নানা কারণে প্রকাশ করতে পারেন না। তাই তারা অভিনয়ের মাধ্যমে সেই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে চেয়েছেন, যাতে মানুষ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে পারেন।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, পাহাড়ে ভূমি ও মৌজা প্রশাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে বিভিন্ন অভিযোগ ও অসন্তোষ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও স্বচ্ছতা জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়তে পারে।

তাদের মতে, তরুণদের এমন সচেতনতামূলক উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং পাহাড়ের বাস্তব সমস্যাগুলো বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরতেও সহায়তা করতে পারে। 

রাজু

×