ছবি: জনকণ্ঠ
রেলকারখানা স্থাপনের সময় নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষার জন্য খনন করা হয়েছিল ১১টি পুকুর বা জলাধার। সে সময় বলা হয়েছিল, অগ্নিকাণ্ডের সময় এসব পুকুরের সংরক্ষিত পানি আগুন নেভাতে সহায়তা করবে। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী পুকুরগুলো এখন অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দখলের কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে। অথচ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও জরুরি অবস্থায় পানির উৎস হিসেবে এসব পুকুর গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আজ সোমবার (২ মার্চ) দুপুরে সৈয়দপুর শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়। নীলফামারীর সৈয়দপুর, দিনাজপুরের পার্বতিপুর, রংপুরের তারাগঞ্জসহ মোট আটটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিটের পানিবাহী রিজার্ভ গাড়ির সীমিত পানিই ছিল একমাত্র ভরসা। যা দিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
জানা গেছে, শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কে তুলা ঘরের পেছনের একটি গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে তা সৈয়দপুর তুলা ঘর, একরামুল হক কটন শপ, ফেরদৌস কটন শপ এবং ঢাকা ব্যাংক পিএলসি ও ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক সৈয়দপুর শাখায় ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটির মালিক আলতাফ হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, ওয়েল্ডিং মেশিন দিয়ে ঝালাইয়ের কাজ করার সময় আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে তুলার গুদামে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এতে চারটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দুটি ব্যাংকের প্রায় কোটি টাকার মালামাল, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে যায়। তবে ব্যাংকের ভল্টে থাকা নগদ টাকার কোনো ক্ষতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আবুল হাশেম জানান, আশপাশে কোনো পুকুর বা জলাধার পাওয়া যায়নি। রিজার্ভ গাড়ির সীমিত পানিতেই কাজ চালাতে হয়েছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। কোনো প্রাণহানি হয়নি। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যায়নি।
সৈয়দপুরবাসীর অভিযোগ, অবৈধ দখল ও ভরাটের কারণে পুকুরগুলো হারিয়ে গেছে। রেলওয়ের মালিকানাধীন বহু জলাশয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে। স্থানীয়দের মতে, পৌর কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে কারখানা বিভাগের ভূমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় রেলওয়ের সম্পত্তি বেদখল হয়েছে। ফলে শহরটি প্রায় পুকুর শূন্য হয়ে পড়েছে।
১৮৭০ সালে রেলওয়ের বিশাল কারখানা গড়ে ওঠে সৈয়দপুরে। সে সময় প্রায় সাড়ে ৮০০ একর ভূমি অ্যাকোয়ার করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বহু জমি ও ১ হাজার ৬০০ কোয়ার্টার দখলে চলে যায়। ২০২৪ সালে ফিদালী ইনস্টিটিউট সংলগ্ন রেলওয়ের একটি বড় পুকুরের অর্ধশত কোটি টাকার জমিও দখলকারীরা দখলে নেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন রেলকর্মচারী বলেন, এ কারণেই রেলওয়ের মূল্যবান সম্পত্তি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে গেছে শহরের ১১টি পুকুর।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই দাবি করেছেন, খাল-বিল ও ডোবা পুকুর উদ্ধার করে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে আবারও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হলে শহর রক্ষা করা কঠিন হবে।
আজকের অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, এটি পরিকল্পনাহীন নগরায়নের প্রতিচ্ছবি। পরিকল্পিত নগরায়ন, প্রশস্ত রাস্তা ও পর্যাপ্ত পানির উৎস নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
শহীদ








