ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২১ এপ্রিল ২০২৪, ৮ বৈশাখ ১৪৩১

নীলফামারীতে কবিতা ও ছড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী

২৪ হাজার খুদে কবির আলোর মেলা, স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন

তাহমিন হক ববী, নীলফামারী

প্রকাশিত: ০০:১৯, ৩ মার্চ ২০২৪

২৪ হাজার খুদে কবির আলোর মেলা, স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন

নীলফামারী শহরের শহীদ মিনার চত্বরে শনিবার খুদে কবিদের আলোর মেলা

শনিবার সকাল ১০টা। সূর্যের আলো পড়েছে লাল-সবুজ পতাকার ওপর। সেই আলোয় আলোকিত শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। শহরের প্রাণকেন্দ্র শহীদ মিনার চত্বরে হাজির হয়েছে ২৪ হাজার শিশু-কিশোর। তাদের সঙ্গে আছেন আড়াই-তিন হাজার শিক্ষক-অভিভাবক। মানুষের মাথা ছাপিয়ে শুধুই দেখা যাচ্ছে প্রিয় জাতীয় পতাকা। শিশু-কিশোররা হাতে পতাকা নিয়ে সেগুলো নাড়ছে।

গলা ফাটিয়ে খুদে কবিরা স্লোগান তোলে ‘জয় বাংলা’। শুধু শহীদ মিনার চত্বর নয়, মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো নীলফামারী জেলা শহর। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। এরপর শিশুরা গেয়ে ওঠে ‘আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী/সাথী মোদের ফুলপরী’, আবার গেয়ে ওঠে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়।’
অতিমারি করোনার কারণে তারা থমকে গিয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক বছর পর ফিরে এসেই  খুদে কবিরা আগামীর নতুন এক বাংলাদেশের কথা বলছে। লিখেছে ‘আমাদের জাতির পিতা, আমাদের শ্রেষ্ঠ মিতা।’ সেখানে তারা কবিতায় তুলে ধরেছে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার কথা। আবার তারা নিজেদের তুলে ধরেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভোর হলো দোর খোলো’র আদলে নিজের মতো করে ছড়া কবিতা। এসব খুদে কবিকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন স্মার্ট বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

আর বঙ্গবন্ধুকন্যার স্বপ্নের বার্তা তাদের কাছে পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন সদর আসনের টানা পাঁচবারের সংসদ সদস্য, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় স¤পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দেশবরেণ্য অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। তাকে সহায়তা করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ভিশন-২০৪১ নীলফামারী’। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ছড়া ও কবিতা লিখন প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছিল। জেলার ৪৪৫টি বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে ১০ম শ্রেণির ২৪ হাজার শিক্ষার্থী জমা দিয়েছিল তাদের স্বরচিত ছড়া-কবিতা। সেই প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ছিল শনিবার। কবিতা, ছড়া লিখনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খুদে শিক্ষার্থীদের লেখা থেকে বাছাই করে দুটি সংকলন তৈরি করা হয়। 
‘আমাদের জাতির পিতা- আমাদের শ্রেষ্ঠ মিতা’ শিরোনামে সংকলনে বঙ্গবন্ধু নিয়ে ২৫০টি ছড়া ও কবিতা ও ‘ভোর হলো দোর খোলো’ শিরোনামের সংকলনে ৫০০ জন খুদে কবির লেখা ছাপানো হয়। তবে ছড়া ও কবিতা লিখনে অংশ নেন ২৪ হাজার। অনুষ্ঠানে সংকলন দুটির মোড়ক উন্মোচন করেন আসাদুজ্জামান নূর।
অনুষ্ঠান উদ্বোধক ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি ও শিশু কথাসাহিত্যিক যথাক্রমে আখতার হুসেন, সুজন বড়ুয়া, অভিনয় ও সংগীত শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পৌর মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহিদ মাহমুদ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ‘ভিশন-২০৪১’র সমন্বয়কারী ওয়াদুদ রহমান জানালেন, স্কুল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা ও প্রতিভা বিকাশে ছড়া ও কবিতা প্রতিযোগিতার আয়োজন শুরু ২০১৫ সালে। এরপর  ২০১৯ সাল পর্যন্ত জেলার খুদে কবিদের লেখা নিয়ে চারটি সংকলন প্রকাশ করা হয়। প্রথম সংকলনটি ছিল ‘আমার দেশ আমার মাটি’। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় সংকলনটির নাম ‘ছন্দে ছন্দে দুল আনন্দে’।

তৃতীয় সংকলনের নাম ছিল ‘আমার সোনার বাংলা’। চতুর্থ সংকলনটির নাম ‘আমরা করব জয়’। পঞ্চমবার খুদে কবিদের নিয়ে দুটি সংকলন বের করা হয়েছে। একটি ‘আমাদের জাতির পিতা- আমাদের শ্রেষ্ঠ মিতা’ ও দ্বিতীয়টি ‘ভোর হলো দোর খোলো’।
খুদে কবিরা দেশ, মাটি ও মায়ের কথা বলছে। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে উঠে আসা এই খুদে কবিদের প্রত্যেককে পুরস্কৃত করা হয়। অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আবৃত্তি, গান, নৃত্যসহ নানা আয়োজন।
আসাদুজ্জামান নূর নীলফামারীতে মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে অহর্নিশ লড়ে যাচ্ছেন। এ লড়াইয়ে তিনি হাতিয়ার করেছেন সংস্কৃতিকেই। আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সামনে থেকে তারা কাজ করলেও, নেপথ্যে ছায়া হয়ে আছেন আসাদুজ্জামান নূর। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এটি তার সচেতন প্রয়াস। 
‘আমাদের জাতির পিতা- আমাদের শ্রেষ্ঠ মিতা’ সংকলনে ঠাঁই পেয়েছে তরনীবাড়ি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড নার্সারির ছাত্রী রিতু রায়ের ছড়া। বঙ্গবন্ধু শিরোনামের ছড়ায় সে লিখেছে ‘বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু তুমি জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু তুমি সকল শিশুর মিতা।’ নতুন বাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী রিয়া লিখেছে, ‘বঙ্গবন্ধু’ তুমি আমাদের মহান পিতা, তুমি আমাদের জাতির পিতা, তোমার কারণে পেয়েছি স্বাধীনতা, তুমি আমাদের বাঙালির নেতা শেখ মুজিব।’

‘ভোর হলো দোর খোলো’ শিরোনামে সংকলনে অগ্রযাত্রা শিশু বিকাশ স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সুমি লিখেছে, ‘বাংলা ভাষা- ভাষার জন্য অনেক মানুষ দিয়ে গেছেন প্রাণ- কেমন করে খুলব আমরা তাদের অবদান।’
প্রোণ কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ববিতা লিখেছে কন্যা- জাতির পিতার যোগ্য কন্যা নামটি যে তার শেখ হাসিনা, ছোটো থেকে স্বপ্ন দেখতে, বাসত খুবই ভালো/বড় হয়ে আনল সে যে, দেশের জন্য আলো।’
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আসাদুজ্জামান নূর খুদে কবিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ছড়া কবিতা লিখে সবাই কবি হবে না। তবে নিজেকে গড়ে নেওয়া জরুরি। এজন্য সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে হবে। এটা আসলে আন্দোলনের মতো।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, আমি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর কথা বলব। নীলফামারীর খুদে কবিদের এই আসর একদিন গিনেস বুকে নাম লেখাবে। নীলফামারী এগিয়ে যাবে, যাবে এখানকার শিশুরা অনেকদূর।
তিনি বলেন, পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্য দিয়ে একটি অনেক বড় বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই। 
অনুষ্ঠানে কবিতা বাছাইয়ের সঙ্গে যুক্ত কবি আখতার হুসেন বলেন, এত কবিতা পাওয়া হয়েছে যে, বিস্মিত না হয়ে পারিনি। তাদের কবিতা পড়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিশুরা অকৃত্রিম মানুষ। নিজের মনের কথা লেখে। তাদের সুযোগ করে দিন।
এদিন স্বরচিত ছড়া শোনান সুজন বড়ুয়া। তার ছড়ায় উৎসবেরই কথা ছিল। এই যেমন, আজকে যেন নীলফামারী/কবিতা আর ছড়ার বাড়ি/এক হয়েছে ছেলে বুড়ো/ পিতা-মাতা শিষ্য-গুরু।
অভিনয় ও সংগীত শিল্পী ফজলুর রহমান বাবু অনুষ্ঠানে দুটি গান পরিবেশ করে মাত করে দেন। তার গানের সঙ্গে শিশুরাও মঞ্চে নেচে ওঠে।

×