ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ২২ অগ্রাহায়ণ ১৪৩০

ঢাকা-৮

আসন দখলে রাখতে তীব্র প্রতিযোগিতা

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০০:১৭, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

আসন দখলে রাখতে তীব্র প্রতিযোগিতা

রাশেদ খান মেনন, মির্জা আব্বাস, শাহে আলম মুরাদ ও জহিরুল আলম রুবেল

জাতীয় সংসদের ১৮১ (ঢাকা-৮) আসনটি ঢাকার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রমনা, মতিঝিল, শাহবাগ, পল্টন ও শাহজাহানপুর এই পাঁচটি থানা এই আসনের আওতাধীন। তাই প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগেই এই আসনটি নিজেদের দখলে রাখতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। 
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যেই ঢাকা-৮ আসন সংশ্লিষ্ট এলাকায় গণসংযোগ জোরদার করেছেন। এর মধ্যে রয়েছেন দুইজন ভিআইপি প্রার্থী। ভোটারসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেও জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। কোনো দল বা কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হলে তারা বেশি উপকৃত  হবেন এ নিয়ে চলছে নানা হিসেব-নিকেশ। 
সরেজমিন জাতীয় সংসদের ১৮১ (ঢাকা-৮) আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এর কারণ, দেশের আন্দোলন সংগ্রাম এ এলাকা থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এ ছাড়া বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলসহ রমনা, শাহবাগ, পল্টন ও শাহজাহানপুর নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় এলাকাটি দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি,  রাজনীতি ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বড় দুই দলই এ আসনটি নিজেদের দখলে রাখার চেষ্টা করছে। সরাসরি দলের প্রার্থী না হলেও জোটের প্রার্থীকে বিজয়ী করার মাধ্যমে এ এলাকার আধিপত্য ধরে রাখতে চায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। 
সরেজমিন এলাকার বিভিন্ন স্তরের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ এলাকায় বড় দুই দলেরই দুইজন হেভিওয়েট প্রার্থী রয়েছেন। আর তাদের পক্ষে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন নিজ নিজ দলের সর্বস্তরের নেতকর্মীরা। এ এলাকার বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। আওয়ামী লীগের আশীর্বাদ নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে পর পর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন রাশেদ খান মেনন। এর মধ্যে একবার মন্ত্রীও ছিলেন। দক্ষিণ বঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান সাবেক ডাকসু ভিপি রাশেদ খান মেনন ছাত্রজীবন থেকেই ব্যাপক জনপ্রিয়। দেশের রাজনীতি ও বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তার অবদান রয়েছে। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগ রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ আসনটি পর পর তিনবার তাকে পছন্দের তালিকায় রাখেন এবং নির্বাচিত করার বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। 
বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ঢাকা-৮ আসন থেকে এবার বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র, যুবদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের কাছেও তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। এছাড়া শাহজাহানপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে এই এলাকায় পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। তিনি নিয়মিত এলাকাবাসীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। কোনো কারণে তিনি নির্বাচন করতে না পারলে তার স্ত্রী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস নির্বাচন করবেন।  
ঢাকা-৮ আসন সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী রাশেদ খান মেনন ও বিএনপি থেকে মির্জা আব্বাস প্রার্থী হলে জমজমাট নির্বাচন হবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। তবে এ দুই হেভিওয়েট প্রার্থী সরাসরি নির্বাচনী প্রচার শুরু না করলেও তাদের পক্ষে নিজ নিজ অনুসারী নেতাকর্মীরা নির্বাচনী গণসংযোগ শুরু করেছেন। 
এ ছাড়াও ঢাকা-৮ আসন থেকে আরও যারা নির্বাচন করতে আগ্রহী তাদের মধ্যে রয়েছেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, দলের স্থানীয় নেতা তারিক সাঈদ, মাসুদ সেরনিয়াবাদ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাইল হোসেন স¤্রাট। জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করতে চান দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য জহিরুল আলম রুবেল। আরও ক’টি ছোট দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও এ এলাকা থেকে নির্বাচন করতে চুপি চুপি প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে এলাকাবাসী জানায়। 
ঢাকা-৮ আসন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৯, ২০ ও ২১নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১ নং ওয়ার্ডটি প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ভাই স্থানীয় বিএনপির নেতা মির্জা আসলাম। আর বাকি আটটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আওয়ামী লীগের। সবগুলো ওয়ার্ডেই বর্তমান সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। যে কারণে এসব এলাকায় এখন তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা নিধন করতে না পারা ও ভারি বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা হওয়ায় জনমনে কিছুটা ক্ষোভ রয়েছে। 
ঢাকা-৮ আসন থেকে এর আগে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তারা হলেন- ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোরবান আলী, ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে  পরপর দুইবার জাতীয় পার্টির আবদুর রহিম, ১৯৯১ সালে বিএনপির মির্জা আব্বাস, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরী ও ২০০১ সালে বিএনপির মির্জা আব্বাস। এর পর ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা জানিয়েছেন, রাশেদ খান মেনন টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এই এলাকার ব্যাপক উন্নয়নে কাজ করেছেন। তবে তিনি অন্য দলের হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকা-ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পারছেন না স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। এ কারণে এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাই এবার যদি আওয়ামী লীগের কোনো একজনকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হয় তাহলে এলাকার সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দলীয় কর্মকা-ে আরও বেশি গতি আসবে। তবে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায় থেকে বৃহত্তর স্বার্থে এবারও যদি রাশেদ খান মেননকে মনোনয়ন দেয়া হয় তাহলে তাকে বিজয়ী করার চেষ্টা করা হবে। 
নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ অনুসারে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল হওয়ার কথা নভেম্বরের প্রথমভাগে। আর নির্বাচন হবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। তাই সময় ঘনিয়ে আসতে থাকায় দেশের অন্যান্য এলাকার মতো ঢাকা-৮ আসন সংশ্লিষ্ট এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে চায়। সরকারের বিপক্ষে অবস্থানকারী রাজপথের বিরোধী দল এখন আন্দোলনে মাঠে সক্রিয়। তারপরও তলে তলে নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে তারা। 
মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা সরকারি কর্মকর্তা মামুনুর রহমান জানান, এ সরকারের আমলে ঢাকা-৮ আসন এলাকাসহ সারাদেশের সকল পর্যায়ে যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে অতীতে কোনো সরকারের আমলে তা হয়নি। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যেভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত রাখতে বর্তমান সরকারকে আবারও ক্ষমতায় আনতে হবে। এ জন্য এ এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বা অন্য যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয় তাকেই নির্বাচিত করতে প্রস্তুত এলাকাবাসী। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা চান এবার সরাসরি দলের কোনো নেতা নির্বাচনে অংশ নিক। কারণ, ১৫ বছর ধরে ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্য থাকায় এলাকার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা বিরাজ করছে। দলের সংসদ সদস্য থাকলে যেভাবে কাছে গিয়ে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও প্রয়োজনীয় কাজ করিয়ে নিতে পারেন এখন তারা সেভাবে পারছেন না। 
শাহজাহানপুর এলাকার ভোটার সাংবাদিক কাজী হাবিব জানান, বর্তমান সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন এ এলাকা থেকে পর পর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে এখনো তার সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তিনি কোথায় বসেন এলাকার অধিকাংশ মানুষই জানেন না। এছাড়া এলাকার কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা যায় না। কিন্তু ঢাকা-৮ আসনের বিএনপির একক প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি অতীতে এ এলাকা থেকে কাউন্সিলর ও মেয়র নির্বাচিত হন। এছাড়া এ এলাকা থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দুইবারই মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে তিনি এলাকার ব্যাপক উন্নয়নে কাজ করেছেন। তার রাজনীতি শুরু এ এলাকা থেকেই। এ ছাড়া জন্মের পর থেকেই তিনি এ এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করছেন। এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্যে অধিকাংশই তার পরিচিত। তাই দল-মত নির্বিশেষে অনেকেরই পছন্দের প্রার্থী মির্জা আব্বাস।
 সেগুনবাগিচা এলাকার বাসিন্দা সোলায়মান হোসেন জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ ক’জন সম্ভাব্য প্রার্থী বিভিন্নভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ এলাকায় পোস্টার ও ব্যানার সাঁটিয়ে প্রচার চালালেও কেউ কেউ নীরবে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে বর্তমান সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ভোটের চিত্র পাল্টে যেতে পারে। কারণ, এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে বর্তমান সংসদ সদস্যের তেমন যোগাযোগ নেই। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে যোগ্য কোনো প্রার্থীকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হলে এ আসনটি পাওয়া সহজ হতে পারে। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা-৮ আসনের একজন বাসিন্দা জানান, বর্তমান সরকার এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছে। সরকারের পক্ষে এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি করেছেন সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের হাওয়া শুরু হয়ে গেছে। এবার কোন পরিবেশ-পরিস্থিতিতে ভোট হয় তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তাই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে যারা এখন বিভিন্নভাবে গণসংযোগ করছেন তাদের মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যাবেন তা বলার সময় এখনো আসেনি।