ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

রাজধানীর চারপাশে নদ-নদীর ৬০ ভাগ দূষণ শিল্প বর্জ্যে

তুরাগ দূষণে বার্ষিক ক্ষতি ২৮৩ কোটি ডলার

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

প্রকাশিত: ২২:৫৭, ৩ জুন ২০২৩

তুরাগ দূষণে বার্ষিক ক্ষতি ২৮৩ কোটি ডলার

তুরাগ নদের তলদেশের আবর্জনা অপসারণ করছে বিআইডব্লিউটিএ

‘তুরাগে এখন আর মাছ মেলে না। অবশ্য তুরাগও সেই আগের মতো নেই। বিশ-ত্রিশ বছর আগে এর তীরে বসলে মনটা জুড়িয়ে যেত। এখন পানির দুর্গন্ধে এর পাশ দিয়ে হাঁটতেও চায় না লোকে। তুরাগ এখন পচা, ময়লা ও বিষাক্ত পানির নদ।’ 
এভাবে তুরাগ নদ নিয়ে কষ্টের কথাগুলো বললেন গাজীপুরের টঙ্গী বাজার এলাকার আজিজুর রহমান। ষাটোর্ধ্ব আজিজুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় গত শুক্রবার তুরাগ নদের তীরে। তিনি জানান, ২০ বছর বয়সে তিনি টঙ্গীতে আসেন তার বাবার সঙ্গে। নেত্রকোনায় তাদের বাড়ি। যুবক বয়সে তিনি তুরাগে মাছ ধরতেন। দিন দিন নদের পানি খারাপ হয়ে যাওয়ায় মাছ ধরার পেশা ছেড়ে কাঁচা বাজারে ব্যবসা করেন। তুরাগ এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তার বেশ খারাপ লাগে। 
শুধু আজিজুর নয়। তুরাগের পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তীরের সব মানুষের মনে কষ্ট রয়েছে। কারণ একসময় এই নদই ছিল তাদের অনেকের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। এখন দুর্গন্ধে এর কাছে আসাও কঠিন। তুরাগের এই দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশগত, স্বাস্থ্যগত এবং অর্থনৈতিক বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২৮৩ কোটি ডলার। এই অবস্থা চলতে থাকলে, নদের পানি দূষণের কারণে মোট আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক আগামী ২০ বছরে ৫ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছবে বলে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ নদের পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এখন আর এখানে মাছ পাওয়া যায় না। মাছ একেবারেই পাওয়া যায় না বললে ভুল হবে। পাওয়া যায় শুধু সাকার ফিশ। এই মাছ কম অক্সিজেনই বাঁচতে পারে। যে সব নদ-নদীর পানি পচে ও বিষাক্ত হয়ে গেছে, সেখানে এ সব মাছ পাওয়া যায়। ঢাকার চারপাশের নদীসহ দেশের ১৮ নদ-নদীর এই করুণ অবস্থা বলে জানিয়েছেন নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী। 

তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ‘সে সব নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানে এই সাকার মাছ পাওয়া যাচ্ছে। কারণ এই সাকার মাছের তেমন অক্সিজেন লাগে না। পচা ও ময়লা খেয়ে এরা বেঁচে থাকে। এই মাছের কারণে অন্যান্য মাছ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। এরা অন্য মাছের পোনা খেয়ে ফেলে। নদীতে সাকার মাছ পাওয়া মানে সেই নদীর পানি নষ্ট হয়ে গেছে। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু ও ধলেশ^রীসহ সারাদেশের ১৮টি নদী আজ হুমকির মুখে। বিভিন্ন কলখানা ও নগরীর বর্জ্যে এসব নদী আজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নদীরগুলো ধ্বংসের জন্য প্রধানত দায়ী ওয়াসা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা। কারণ ময়লা-আবর্জনা সকল ড্রেন ও নালারমুখ দেওয়া হয়েছে নদীর দিকে। তাই সব দূষিত বর্জ্য এসে পড়ছে নদীতে। এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।’ এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার বলার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলে জানান তিনি।    
নদীর ৬০ শতাংশ দূষণ হয় শিল্প বর্জ্যে ॥ ঢাকার চারপাশে নদীগুলোর ৬০ শতাংশই দূষণ হয় শিল্প বর্জ্যরে কারণে। এছাড়া গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন পয়ঃনিষ্কাশন নালার মাধ্যমে ১৫ শতাংশ দূষণ হয়। পাশাপাশি ১০ শতাংশ নদীর পানি জাহাজ, লঞ্চ ও অন্যান্য নৌযানের পেট্রোলিয়াম জ্বালানি এবং মলমূত্রের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে। নদ-নদীর পানি দূষণ রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। দূষণের কারণে কমে গেছে নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ। বিষাক্ত পানির কারণে মাছ ও পোকামাকড়সহ কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারছে না।

প্রকৃতপক্ষে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী এবং টঙ্গী খালে প্রায় ৬০ হাজার ঘনমিটার বিষাক্ত বর্জ্য প্রধানত নয়টি শিল্পঘন এলাকা- টঙ্গী, হাজারীবাগ, তেজগাঁও, তারাবো, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, ডিইপিজেড ও ঘোড়াশাল থেকে আসে। ঢাকার চারপাশে ৬৩১ পয়েন্টের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু। এর মধ্যে ২৫৮টি পয়েন্ট দিয়ে গৃহস্থালি, শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য সরাসরি পড়ছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এছাড়া তুরাগ নদে ২৬৯টি ও বালু নদীতে ১০৪ পয়েন্ট দিয়ে কঠিন বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য পড়ছে। 
এর মধ্যে টঙ্গীর কামাড়পাড়ার প্রত্যাশা ব্রিজ থেকে পাগাড় পর্যন্ত প্রায় ২২টি ডায়িং ও ওয়াশিং কোম্পানির কারখানা থেকে বিষাক্ত রং মিশ্রিত পানি সরাসরি পড়ছে তুরাগ নদে। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পয়েন্টগুলো সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার তৈরি। নদী তীরে গড়ে ওঠা অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে দূষিত ঢাকার নদীগুলো। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে ইটিপি ব্যবস্থা থাকলেও তা সচল নেই। এ সব ডায়িং ও ওয়াশিং কোম্পানির দূষিত পানি সরাসরি নদীতে পড়ছে বলে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ গত বছর ফেব্রুয়ারিতে পরিবেশ অধিদপ্তরে দেওয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর মধ্যে টঙ্গীতে তুরাগের দূষণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তরল ও কঠিন বর্জ্য সরাসরি নদের পানিতে মিশছে। এতে নদী দূষণ তথা পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। ২০০৯ সালে আদালতের এক আদেশে তুরাগ নদকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে গণ্য করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে টঙ্গী নদী বন্দরের কামারপাড়া প্রত্যাশা ব্রিজ থেকে পাগাড় পর্যন্ত এলাকায় বিভিন্ন ডায়িং ও ওয়াশিং কারখানার কেমিক্যালযুক্ত রঙিন তরল বর্জ্য, বিভিন্ন সংস্থার স্যুয়ারেজ, লাইন তুরাগ নদে পড়ছে। অধিকাংশ ফ্যাক্টরির ইটিপি প্ল্যান্ট নামে মাত্র থাকলেও কার্যকারিতা নেই। কামারপাড়া প্রত্যাশা ব্রিজ থেকে পাগাড় পর্যন্ত প্রায় ২৫টি ড্রেন লাইন দিয়ে বিষাক্ত বর্জ্য নদে পড়ছে। তাই তুরাগ নদ রক্ষায় এ সব ড্রেন বন্ধ করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু গত এক বছরেও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে বিআইডব্লিউটিএ’র সূত্র জানায়।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) রকিবুল ইসলাম তালুকদার জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা চারপাশের নদ-নদী দূষণের কারণ ও উৎসমুখ চিহ্নিত করে একাধিকবার পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অন্যান্য সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তাই ডিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব অর্থায়নে তুরাগের তলদেশ থেকে ময়লা, পলিথিন ও আবর্জনা অপসারণের কাজ শুরু করেছে। গত বছর ডিসেম্বর থেকে তুরাগ নদীর কামারপাড়া ব্রিজ থেকে ত্রিমুখ পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশে বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ ঘনমিটার বর্জ্য উত্তোলন করা হয়েছে। নদীর বিভিন্ন স্থানে চারটি এক্সকেভেটর দিয়ে এ সব ময়লা-আবর্জনা উত্তোলন করা হচ্ছে। এ সব আবর্জনার বেশিরভাগই গার্মেন্টস পণ্য। বিভিন্ন শিল্প-কারখানার বর্জ্য নদটিতে ফেলায় তলদেশে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাই বর্জ্যরে উৎসমুখ বন্ধ করা ও নিয়মিত আবর্জনা অপসারণ না করা হলে তুরাগের তলদেশ আবার ভরাট হয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
সরেজমিনে টঙ্গীর তুরাগ নদের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, টঙ্গীর রেলব্রিজের একটু সমানে তুরাগ নদের কালো পানি থেকে এক্সকেভেটর দিয়ে আবর্জনা তুলে বালুবাহী জাহাজে রাখা হচ্ছে। এ সব আবর্জনার মধ্যে রিক্সার টায়ার, গার্মেন্টস পণ্য, পলিথিন ও কাদামাটিসহ বিভিন্ন বর্জ্য ওঠানো হচ্ছে। আবর্জনা তোলার পর তা বালুবাহী জাহাজে করে তুরাগের পাশে নিচু জমিতে ফেলা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ ঘনমিটার বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়।

×