ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

জামালপুর-৩

মির্জা আজমের বিপরীতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা বিএনপির

আজিজুর রহমান ডল, জামালপুর

প্রকাশিত: ২৩:৩১, ৩১ মে ২০২৩

মির্জা আজমের বিপরীতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা বিএনপির

জামালপুর জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আসন হলো জামালপুর-৩

জামালপুর জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আসন হলো জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসন। নৌকার ঘাঁটি বলে পরিচিত এই আসন থেকে টানা ছয়বার নৌকা প্রতীকে বিজয়ী মির্জা আজম এমপির বিপরীতে বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল ভোটের মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আসছে নির্বাচনেও গত ৩৫ বছর ধরে জাতীয় সংসদে জামালপুর জেলার প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে আসা মির্জা আজমের প্রার্থিতা অনেকটাই নিশ্চিত। তাকে সপ্তমবারের মতো এমপি বানাতে মুখিয়ে আছে এলাকার দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার।  
অপরদিকে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে এই আসনে গতবার পরাজিত বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবারও ধানের শীষ প্রতীকে লড়তে পারেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীর মধ্যেই এই আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এই আসনে জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কোনো তৎপরতা খুব একটা নেই বললেই চলে। 
জামালপুর-৩ আসনটি মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। মেলান্দহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় মোট ভোটার রয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৪১ জন। অন্যদিকে মাদারগঞ্জ উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার রয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ২৮৪ জন। এই দুই উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা মিলে এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৭ হাজার ২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৮ জন। আর নারী ভোটার রয়েছেন ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬৩২ জন। 
জানা গেছে, জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনে জাতীয় নির্বাচনে যত প্রার্থীই হোক না কেন এই আসনটিকে বলা হয় ‘নৌকার ঘাঁটি’। মির্জা আজম এমপি এই আসন থেকে ১৯৯১ সালে প্রথম সংসদ সদস্য  নির্বাচিত হন। তখন বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮  সালের নির্বাচনে এ আসন থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম। তিনি এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন।
এই  আসনে টানা ছয়বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা আজমের নিরলস পরিশ্রমে এই আসনের দুটি উপজেলায় অভাবনীয় উন্নয়ন এবং তারই নেতৃত্বে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি সারাদেশে মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এসব কারণে এই আসনটি এখন ‘মির্জা আজমের ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত। 
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমানে এই মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মির্জা আজম এমপির মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে আছে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও এই আসনের দুটি উপজেলা আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনকে গতিশীল রাখতে তিনি নিয়মিত এলাকায় দলীয়সভা-সমাবেশ ও জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপিকে সপ্তমবারের মতো এমপি হিসেবে দেখতে চায় দুই উপজেলার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটাররা। মির্জা আজম এপির নির্দেশনা ও সরাসরি দল পরিচালনার কারণে এই দুই উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সকল অঙ্গসহযোগী সংগঠন সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই শক্তিশালী। রাজনৈতিক ভিত্তির পাশাপাশি মির্জা আজম এমপির প্রচেষ্টায় এ আসনের দুই উপজেলার যোগাযোগ ও শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সর্বক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। 
এ আসনে সংসদ সদস্য মির্জা আজম বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাট গবেষণা উন্নয়ন কেন্দ্র, মাদারগঞ্জ-সারিয়াকান্দি ফেরি সার্ভিস, কম্পোজিট জুট টেক্সটাইলস মিল, গ্যাস ফিল্ড অনুসন্ধান প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রত্যন্ত গ্রামের রাস্তা পাকাকরণ ও সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। 
শত ব্যস্ততার মাঝেও মির্জা আজম এমপি তার নির্বাচনী এলাকার দুটি উপজেলার আওয়ামী লীগসহ সকল অঙ্গসংগঠনের দলীয় সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিয়ে জামালপুর জেলাসহ সারাদেশে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে নৌকার বিজয়ের জন্য কাজ করতে নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটার জনতার প্রতি নিবেদন জানিয়ে আসছেন। 
অপরদিকে বিএনপি নির্বাচনে গেলে এই আসনে আগামী নির্বাচনেও ভোটের মূল লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে পারেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক সহ-সম্পাদক, নব্বইয়ের গণআন্দোলনের সাবেক ছাত্রনেতা ও মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ২০০১ সালে বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘দেয়াল ঘড়ি’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে লক্ষাধিক ভোট পেয়েও তিনি নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মির্জা আজমের কাছে পরাজিত হন। 
২০০৮ সালের নির্বাচনে মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়েও পরাজিত হন। খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি আন্দোলনে থাকলেও বিএনপি নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল আগাম মাঠ গোছাতে এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও আন্দোলন সংগ্রাম, জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। মেলান্দহ-মাদারগঞ্জে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকটা শূন্যের কোঠায় বিরাজমান থাকায় এই আসনে বিএনপি নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ছাড়া দলের অন্য কোনো নেতার এমপি মনোনয়ন নিয়ে কোনোরূপ রাজনৈতিক তৎপরতা নেই।

ফলে এই আসনে মির্জা আজমের ঘাঁটিতে হানা দিতে বিএনপি নেতা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলই বিএনপি নেতাকর্মীদের শেষ ভরসা। সেই দিক বিবেচনায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মূলত মির্জা আজম এমপি ও মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল আবারও ভোটের লড়াই মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন বলে সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন।  আওয়ামী লীগের মির্জা আজম ও বিএনপির মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ছাড়া এ আসনে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে কেন্দ্রীয় জাতীয় মৎস্যজীবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মীর শামছুল আলম লিফটন মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে এলাকায় জনসংযোগ করছেন। এ ছাড়া এ আসনে সিপিবি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কোনো তৎপরতা এখনো শুরু হয়নি। 
টানা ছয়বারের সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা আজম জনকণ্ঠকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে আমার প্রিয় দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বিগত ১৫ বছরে মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ উপজেলাবাসীর কল্যাণে অনেক উন্নয়নমূলক কর্মকা- বাস্তবায়ন করেছি। অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছি। শুধু এই দুই উপজেলাতেই নয়, জামালপুর জেলাকে উন্নত জেলায় রূপান্তরে কাজ করে যাচ্ছি। 
তিনি বলেন, শুধু এই জামালপুর জেলাতেই নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারাদেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামী নির্বাচনে নৌকার বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই। আমি  এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়ে ৩৫ বছর ধরে জাতীয় সংসদে জামালপুরবাসীর প্রতিনিধিত্ব করছি। এই আসনের দুই উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সকল অঙ্গ সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক ভিত্তি আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী। এই আসন থেকে আগামী নির্বাচনেও আমি নির্বাচনে অংশ নেব। 
এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জনকণ্ঠকে বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না দিলে বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না। বর্তমান সরকারের আমলে ভোটের কোনো পরিস্থিতি নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বাধ্য করতে বিএনপি বর্তমানে রাজপথে আন্দোলনে রয়েছে। তাই আসছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে বিএনপি আন্দোলনে সফল হলে, নির্বাচনে অংশ নিলে আমি এই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে এবারও নির্বাচনে অংশ  নেব।

×