ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা এইচএএম রোডের ‘ফ্রাইডে মার্কেট

সাজেদ রহমান, যশোর অফিস

প্রকাশিত: ০০:৪২, ২৭ মে ২০২৩

স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা এইচএএম রোডের ‘ফ্রাইডে মার্কেট

প্রতি শুক্রবার শহরের এইচএএম রোডের ফুটপাতে ভিড় করেন ক্রেতারা

যশোর শহরে ছোট বড় অনেক মার্কেটই রয়েছে। তবে সব মার্কেটে কেনাকাটার সামর্থ থাকে না অনেকেরই। সেই সঙ্গে অনেকেরই চাহিদা থাকে সাধ্যের মধ্যে কম দামে কেনাকাটা করার। আর এজন্য সাধ্যের মধ্যে কাপড় পেতে প্রতি শুক্রবার শহরের এইচএএম রোডের ফুটপাতে ভিড় করেন ক্রেতারা। প্রতি শুক্রবার এখানে কেনাবেচা হওয়ায় অনেকের কাছে এটি ফ্রাইডে মার্কেট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তার পাশ ঘেঁষে ফেলে রেখেছেন পণ্য। জুতা থেকে শুরু করে শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, শাড়ি, থ্রি পিস, ছোটদের বই-খাতা, মশারি, পর্দা, গজ কাপড়, চশমা, কমসেটিক্স, পারফিউম কি নেই এখানে। দেইখ্যা লন দুইশো, বাইছা লন দুইশো, যেইটাই লইবেন দুইশ। কিছুক্ষণ থেমে থেমেই হকারদের এমন হাকডাক। ক্রেতারাও ঝুঁকে ঝুঁকে কেনাকাটা করছেন এখানে।
যদিও এখানে সারি সারি দোকান নেই, এসি নেই, নেই কোনো ঝলমলে আলোকসজ্জা। এমনকি ক্রেতা আকর্ষণে নেই র‌্যাফেল ড্র। তবে তুলনামূলক কম দাম হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা বলা যায় এসব অস্থায়ী দোকানগুলো। অবশ্য এখন শুধু স্বল্প আয় বা নি¤œবিত্তরাই নন, বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী বাজার দরের কারণে মধ্যবিত্তরাও কেনাকাটার ঠিকানা খুঁজছেন ফুটপাতেই। তবে হ্যাঁ, জিনিসপত্রের চড়া দামে মধ্য আয়ের মানুষের সাদ আর সাধ্যের সমন্বয় করা কঠিন। তাই নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কেনাকাটা নির্ভর করছে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারে ফুটপাতের ভাসমান ওই দোকানগুলোর ওপর। ওই রোডে ঘুরে তারা কিনে নিচ্ছেন পছন্দের পোশাক। দিনের শুরুতে এসব দোকান রাস্তায় কাপড় বিছিয়ে বসানো হয়। আর রাতে বেচাকেনা শেষে এগুলো আবার বাড়ি নিয়ে যায় বিক্রেতারা।

সারা সপ্তাহ নির্দিষ্ট স্থানে বেচাবিক্রি করলেও শুক্রবার এই রোডে তাদের বেচাকেনার ধুম পড়ে। দোকানিরা বলছেন মেলার মতোই আমেজ এখানে। এ সকল অস্থায়ী দোকানগুলোতে বিকেলের পর থেকে নি¤œ আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তরা ভিড় জমাচ্ছে। সাধারণ মানুষের হাটার কোনো উপায়ই থাকে না। তারা বাধ্য হয়েই ঠেলাঠেলি করে রাস্তা পার হয়। ফুটপাত থেকে কাপড় কিনতে আসা কারখানা শ্রমিক কামরুল হাসান জানান, অল্প বেতনে চাকরি করি। যে বেতন পাই সেই বেতনের টাকা দিয়ে মার্কেটে গিয়ে কাপড় কেনার সামর্থ নেই। তাই সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বের হয়েছি ফুটপাতের দোকান থেকে কাপড় কেনার জন্য। সেই সঙ্গে পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে একটু ঘুরাও হয়ে গেল। আমার খরচও কিছুটা কমল পরিবারের সদস্যরাও খুশি হলো, একসঙ্গে দুই কাজ হয়ে গেল।

শুধু তিনি নয় রাবেয়া বেগম, শহিদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন ক্রেতারা জানান, তারা দামদর করে চাহিদা অনুযায়ী পছন্দমতো পণ্য কিনতে পারছেন এখান থেকে। যা বড় বড় দোকান থেকে সম্ভব নয়। রবিউল ইসলাম, বিধান চন্দ্র সাহা, ইলিয়াস হোসেনসহ বেশ কয়েকজন বিক্রেতা জানান, শহরের অন্যান্য মার্কেটের চাইতে এখানে পণ্যের দাম যেমন কম, তেমনি এক্সপোর্ট আইটেম জিন্স প্যান্ট, শার্ট, টি-শার্টসহ রকমারি আইটেম ক্রেতা তার পছন্দমতো বেছে নিতে পারেন। জিন্স প্যান্ট, জিন্স শার্ট, টি-শার্ট, বাচ্চাদের সব ধরনের কাপড়, মহিলাদের শাড়ি, মেয়েদের জন্য রকমারি সালোয়ার কামিজ, ফ্রগ, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, পলো শার্ট, শার্ট, এক্সপোর্টের টুইল প্যান্ট ও শার্ট, স্যান্ডেল, বিভিন্ন ধরনের কেডস, ব্যাগ ও মহিলাদের প্রসাধনীসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় পণ্য এখানে পাওয়া যায় বলে জানান তারা।

টি-শার্ট বিক্রেতা রবিউল ইসলাম বলেন, অন্যান্য দিন চিত্রার মোড়ে বসলেও তিনি সপ্তাহে একদিন বসেন এই রোডে। সারা সপ্তাহের যে বেচাকেনা হয় ওই রোডে এখানে বিকেলেই সেই বেচাকেনা হয় বলে জানান তিনি। ফুটপাতের জুতা ব্যবসায়ী বসুন্দিয়ার বাসিন্দা আদিত্য দাস জানান, সপ্তাহের ৬ দিন নড়াইলের মুচিরপোল বুস্তামি কমপ্লেক্সের সামনে বসলেও সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার শহরের এই রোডে মেলার আমেজ থাকায় তিনি এখানে আসেন জুতা বেচাবিক্রি করতে। তিনি এই রোডে গত ১৬ বছর যাবৎ শুক্রবারে জুতা বেচাকেনা করেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতি কানু দাস তার সহযোগী হিসেবে সঙ্গে আছে। একসময় তার দুই ছেলে সহযোগী হিসেবে সঙ্গে থাকলেও এখন তারা নিজেরাই আলাদা আলাদা দোকান খুলে বসেছেন।

কয়েক গজ দূরে তার বড় ছেলে তাপস দাসকে পাওয়া গেল। তিনি বলেন, সারা সপ্তাহ অভায়নগরের নওয়াপাড়া বাজারে ফুটপাতে জুতা বিক্রি করি। বাকি একদিন এখানে আসি। এখানে আসার কারণ হিসেবে তিনি জানান, এই রোডে তার বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন আসা। এখানে পৌরসভা ৩০ টাকা খাজনা ছাড়া অন্যান্য বাজারের মতো কোনো চাঁদাবাজি নেই। পুলিশের হয়রানি নেই, এছাড়াও এখানকার মানুষ বন্ধুসুলভ বলে তিনি জানান।
যশোর পৌরসভার পশ্চিম হাটবাজারের ইজারাদার আনিকা ইন্টারন্যাশনালের খাজনা আদায়কারী এক সদস্য জানান, নির্ধারিত টিকিটের মাধ্যমে খাজনা আদায় করা হয়। স্থানভেদে ১০ থেকে ৫০ টাকা নেওয়া হয়। তবে তিনি নিজের নাম বলতে রাজি হননি। এদিকে সাধ্যের মধ্যে ফুটপাতে এসে সাধ পূরণের সুযোগ পাওয়ায় ক্রেতাদের পণ্য কিনে খুশি মুখে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে।

×