৬ এপ্রিল ২০২০, ২৩ চৈত্র ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

ভাষার মিনারে বিনম্র শ্রদ্ধা জাতির

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ অনেক দীর্ঘলাইন। শত শত সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে হাজার হাজার মানুষ। সেখানে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ-সকল বয়স-ধর্মের মানুষ নিজের ভাষার জন্য আত্মত্যাগী শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন। ভোরের আলো যত বাড়তে থাকে, ততই বাড়তে থাকে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়। শুধু নির্দিষ্ট পরিচয়ের ব্যানারে নয়, অনেকে ফুল হাতে এসেছেন একা, পরিবার-পরিজন কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে।

ঠিক এভাবেই একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর থেকে শুক্রবার সারাদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলা ভাষার প্রশ্নে প্রাণ দেয়া সূর্যসন্তানদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছে লাখো মানুষ। আজ থেকে ঠিক ৬৮ বছর আগে ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রাণ দিয়েছিল সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত, রফিকসহ অনেকে। মায়ের ভাষাকে ছিনিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দিয়েছিল তারা। তাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল রাষ্ট্রভাষার অধিকার, মাতৃভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা।

তাদেরই স্মরণে লাখো মানুষের জনস্রোত নেমেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। মানুষের দীপ্ত পথ চলায় রাজধানীর সব পথ যেন গিয়ে মিশেছে শহীদ মিনারে। ফুল হাতে, কারও গালে লেখা রঙিন বর্ণমালা অথবা শুধু ২১, খালি পায়ে ছুটে এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। শহীদ মিনারের ঘোষণা মঞ্চে অনবরত বাজানো হচ্ছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি। গানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে ধীর পায়ে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নানা সংগঠন ও শ্রেণী পেশার মানুষ।

একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটায় রাত বারোটা এক মিনিটে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতির পক্ষে বায়ান্নর ভাষা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর নীরবে দাঁড়িয়ে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। জাতির পক্ষে শ্রদ্ধা অর্পণের পর দলের পক্ষে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও জ্যেষ্ঠ নেতারা শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ডেপুটি স্পীকার ফজলে রাব্বী মিয়া শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তারপর বিরোধী দলের পক্ষে জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ, চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার নেতৃত্বে নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান ভাইস এ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারী শ্রদ্ধা জানান।

ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিকরা শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এরপর একে একে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সহযোগী সংগঠন, ছাত্র, যুব, শ্রমিক, কৃষক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় সংগঠন, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, সর্বস্তরের জনতা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এছাড়াও আনসার ও ভিডিপি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। তারা ফুল দিয়ে অমর শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়। এছাড়া শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি-জেপি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণজাগরণ মঞ্চ, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় প্রেসক্লাব, জাসদ, বাসদ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্রফ্রন্ট, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন। রাত বারোটায় শহীদ মিনারে মানুষের যে ঢল নামে তা অবিরতভাবে চলে প্রভাত ফেরি পর্যন্ত।

এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে। একুশের প্রথম প্রহরের ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা অতিথিদের স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের পক্ষে তিনি শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোঃ কামাল উদ্দীন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোঃ নিজামুল হক ভূইয়া, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষের নেতৃত্বে ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ, অফিসার্স এ্যাসোসিয়েশন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সর্বস্তরের জনগণ একে একে শহীদ বেদিতে পু®পস্তবক অর্পণ করেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৬টায় উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি প্রভাতফেরি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে শুরু হয়। প্রভাতফেরিসহকারে তারা আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবরে পু®পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। বাদ জুমা মসজিদুল জামিয়াসহ সকল হলের মসজিদ এবং বিশ^বিদ্যালয় আবাসিক এলাকার মসজিদে ভাষা শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এছাড়া, অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য প্রমিত ও পরিশীলিত ভাষার উন্নয়ন খুব জরুরী। বাংলা যেন শুধু সাহিত্যের ভাষা না হয়, এই ভাষা হবে বিজ্ঞানের ভাষা, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষা, প্রকৌশল বিজ্ঞানের ভাষা। তাহলেই বাংলা আরও সমৃদ্ধ হবে।

তিনি বলেন, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের একটি মৌলিক দর্শন হলো যেকোন জাতিসত্তার মানুষের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সেটা সংরক্ষণ করা এবং সব জাতিসত্তার মানুষকে সুরক্ষা দেয়া। এটিই হলো বিশ্ব সভ্যতার জন্য বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের অবদান। যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হয়। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন বিশ্ববাসীকে অনুপ্রাণিত করে।

এদিকে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও টিএসসির সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সঙ্গীত বিভাগের উদ্যোগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় টিএসসি মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। অন্যদিকে থিয়েটার এ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের উদ্যোগে সন্ধ্যা ৭টায় নাটম-ল মিলনায়তনে জহির রায়হান রচিত ‘একুশের গল্প’ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।

কলকাতা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছেন ১৬ জনের একটি দল। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শহীদ মিনারে প্রবেশের সময় তাদের কপালে লেখা ২১ ফেব্রুয়ারি, ফুল হাতে ‘জয় বাংলা-বাংলার জয়’ গানটি গাইতে থাকেন। এছাড়াও কয়েকটি দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হিন্দ’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জয় বিদ্যাসাগর’ স্লোগান দেন তারা।

গত নয় বছর ধরে সাইকেল চালিয়ে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করতে করতে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছেন সৌরজিৎ রায়ের নেতৃত্বে এই ১৬ জনের দলটি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় বিদ্যসাগরের বাড়ি থেকে শুরু হয়ে শুক্রবার ঢাকায় এসে পৌঁছে এই ভারত-বাংলাদেশ মেত্রী বন্ধন সাইকেল র‌্যালি।

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২০

২২/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: