২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

পাঁচ দেশের মহামিলন ॥ ভবিষ্যতে মিয়ানমারও যুক্ত হবে

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০২০
পাঁচ দেশের মহামিলন ॥  ভবিষ্যতে মিয়ানমারও যুক্ত হবে
  • ’২১ সালেই চলবে বাংলাদেশ ভারত নেপাল ও ভুটানের যানবাহন
  • চার লেনের এলেঙ্গা-হাঁটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণে প্রতি কিমিতে ব্যয় হবে ৬৩ কোটি টাকারও বেশি
  • ১৯০ কিমি সড়কের নির্মাণ ব্যয় বারো হাজার কোটি টাকা
  • আগামী বছরের আগস্টেই কাজ শেষ হওয়ার কথা

রাজন ভট্টাচার্য ॥ প্রায় বারো হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চার লেনে উন্নীত হতে যাচ্ছে ১৯০ কিমি দীর্ঘ এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক। প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হবে ৬৩ কোটি টাকার বেশি। দ্বিতীয় সাউথ এশিয়া সাবরিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক) সড়ক সংযোগ প্রকল্পের আওতায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এডিবির আর্থিক সহযোগিতায় এ কাজ সম্পন্ন হবে। তেরোটি প্যাকেজের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ এ জাতীয় মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান। প্রকল্পটি টাঙ্গাইল-সিরাজগঞ্জ-বগুড়া-গাইবান্ধা ও রংপুর এ পাঁচ জেলাকে যুক্ত করবে। এরপর রংপুর থেকে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা পর্যন্ত সাসেক প্রকল্প-৩ কাজ শেষ হলে পাঁচ দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে এই মহাসড়ক।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ’২১ সালের আগস্টে কাজ শেষ হওয়ার পর গোটা উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র। যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসবে ব্যাপক উন্নতি। তবে এ বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ১১ দশমিক ৫৩ ভাগ। বাকি দশ মাসে প্রায় ৮৯ ভাগ কাজ শেষ করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই প্রকল্পটি অন্তত আরও এক বছর পেছানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে প্রকল্প পরিচালক কাজী শাহরিয়ার হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের আওতায় চলমান সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্পটি বাংলাদেশে এডিবির অর্থায়নে চলমান ৫৩টি প্রকল্পের মধ্যে বর্ষসেরা প্রকল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মোট আট ক্যাটাগরির মধ্যে সামাজিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তাসহ অনুকরণীয় এই দুই ক্যাটাগরিতে সেরা প্রকল্পের স্বীকৃতি পায় এটি। নতুনত্ব ও উন্নত প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে প্রকল্পটি পেয়েছে দ্বিতীয় সেরার মর্যাদা। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সামগ্রিক সেরা প্রকল্প হিসেবে বর্ষসেরার স্বীকৃতি দেয়া হয় এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক প্রকল্প। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এশিয়ান হাইওয়ে

’২১ সাল নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এরপর শুরু হবে সাসেক প্রকল্প-৩ বা শেষ ধাপের কাজ। রংপুর থেকে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা পর্যন্ত সাসেক প্রকল্প-৩ এর কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক রূপ পাবে। তখন এ মহাসড়ক দিয়ে বাংলাদেশ ভারত নেপাল ও ভুটানের যানবাহন চলাচল করবে। যদিও ভবিষ্যতে এ মহাসড়কে মিয়ানমারেরও যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। সাসেক মহাসড়ক প্রকল্প মূলত দক্ষিণ এশিয়ায় যোগাযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠার একটি প্রকল্প, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়েও ভূমিকা রাখবে। ছয় লেনের এই মহাসড়কটি হবে এশিয়ান হাইওয়ে বিমসটেক করিডর ও সার্ক হাইওয়ে করিডরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এতে পাল্টে যাবে রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতির চিরচেনা দৃশ্যপট। নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিতের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে রংপুরে। চলাচলের ধারণ সক্ষমতা বাড়ানোসহ অনেকাংশে কমে আসবে সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট। এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন তথা উন্নয়নের আরও একটি মাইলস্টোন হবে এই মহাসড়ক।

রংপুর অঞ্চলের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের গৃহীত মহাপ্রকল্পগুলোর একটি হচ্ছে এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্প (সাসেক প্রকল্প-২)। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল হয়ে বগুড়ার ওপর দিয়ে সাসেক-২ প্রকল্প শেষ হবে রংপুরের মডার্ন মোড়ে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চারলেনের পাশাপাশি মহাসড়কের দুপাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য মূল সড়ক থেকে সামান্য নিচুতে দুটি সংরক্ষিত লেন থাকবে। চুক্তির আওতায় সাতটি সেতু, ১৭টি কালভার্ট, কড্ডা এলাকায় একটি ফ্লাইওভার, পাঁচটি আন্ডারপাস এবং ১২টি বাস-বে নির্মাণ করা হবে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্যাকেজ-৬-এর চুক্তির আওতায় ৬৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপ্রান্ত থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত প্রায় ২০ কিমি মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করা হবে। ’১৮ সালের ৮ নবেম্বর দুই হাজার ১১০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সরকার ও এডিবির অর্থায়নে সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেয় সরকারী ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

ছয় ধরনের জটিলতা

প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম চ্যালেঞ্জ ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, প্রকল্প এলাকার মধ্যে বিদ্যমান বৈধ-অবৈধ ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো অপসারণ, স্থানীয় পর্যায়ের মামলা, ইউটিলিটি শিফটিং, উন্নয়ন সংস্থা হতে ধাপে ধাপে সম্মতি গ্রহণ ও বৃক্ষ অপসারণসহ বেশকিছু জটিলতা রয়েছে। যদিও এলেঙ্গা হাটিকুমরুল-রংপুর জাতীয় মহাসড়ক ২০১৯-২০ অর্থবছরেই চারলেন প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনের কথা রয়েছে। সাসেক-২ সড়ক সংযোগ প্রকল্পের আওতায় এডিবির আর্থিক সহযোগিতা ও সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। ১৯০ কিমি দীর্ঘ চার লেনের এ প্রকল্প পাঁচ জেলার ১৪ উপজেলায় মহাসড়কজুড়ে বিস্তৃত।

এর মধ্যে টাঙ্গাইল সড়ক বিভাগের-১৪ কিমি, সিরাজগঞ্জ-৩৬ কিমি, বগুড়া-৬৫ কিমি, গাইবান্ধা-৩৩ কিমিসহ রংপুর সড়ক বিভাগের ৪২ কিমি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হবে। চারলেনের পাশাপাশি মহাসড়কের দুই পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য মূল সড়ক থেকে সামান্য নিচুতে তিন দশমিক ৭ মিটার সংরক্ষিত লেনও থাকবে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপ্রান্ত থেকে হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত প্রায় ২০ কিমি চারলেন মহাসড়কের এ অংশে থাকছে ২৪ সেতু ও কালভার্ট, কড্ডা এলাকায় একটি ফ্লাইওভার, ১২ বাস- বেসহ পাঁচটি আন্ডারপাস। প্যাকেজ ৬ বাস্তবায়নের কাজ পেয়েছে যৌথ নির্মাণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনের হিগো ও বাংলাদেশের মীর আকতার হোসেন লিমিটেড। চুক্তি বাস্তবায়নে সময় লাগবে ৩২ মাস।

সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড় থেকে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর পর্যন্ত প্রায় ২৮ কিমি চারলেন প্রকল্পের কাজ পেয়ছে নির্মাণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড। প্যাকেজ-৭ এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আটশ’ কোটি টাকা। এ প্যাকেজের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান রাসেল বলেন, প্যাকেজ-৭ এর আওতায় একটি ফুটওভারব্রিজ, ৩৭ সেতু ও কালভার্ট, চারটি বাস-বে ও ৬ আন্ডারপাস নির্মাণ হবে। মাটি ভরাটের মধ্য দিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, দ্রুতম সময়ে সেতু ও কালভার্টের কাজ ধরা হবে।

তবে প্যাকেজ-৮ ও ৯ এর আওতায় মির্জাপুর থেকে শিবগঞ্জের মোকামতলা, বগুড়া অংশের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব ও মিন্টু রঞ্জন দেবনাথ জানান, মাধ্যমে প্রকল্পের এ অংশের ভূমি অধিগ্রহণ চলছে। দুটি প্যাকেজের আওতায় প্রায় এক হাজার দুইশ’ কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়ার তিন মাথায় একটি রেলওয়ে আন্ডারপাসসহ মোট ৩০ সেতু-কালভার্ট, ২৮ বাস-বেসহ পাঁচটি ফুটওভারব্রিজ ও মহাসড়কের ব্যস্ততম এলাকায় নয়টি আন্ডারপাসসহ প্রায় ৫৫ কিমি সড়ক চারলেনে উন্নীত করা হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি হয়েছে নির্মাণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিপিসি-তানতিয়া জয়েন্টভে›চার এবং মনিকো-কেএনসি জয়েন্টভেঞ্চার লিমিটেড। সওজ গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী আশাদুজ্জামান বলেন, জেলার মহাসড়কের এ অংশে সাসেক-২ প্রকল্পের ফ্লাইওভার নির্মাণসহ দুটি প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ হয়ে গেছে, তারা মাঠ পর্যায়ে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন বৃক্ষ অপসারণ, ভূমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য কার্যক্রম শেষ হলেই ঠিকাদারদের ভূমি বুঝিয়ে দেয়া হবে। সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২ এর সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে ডেপুটি প্রকল্প পরিচালক জয় প্রকাশ চৌধুরী বলেন, প্যাকেজ-৫ এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পর্যন্ত প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। প্যাকেজ-৬ এর সার্ভে ও সেতুর কাজ এবং প্যাকেজ-৭ এর মাটি ভরাট কাজ দৃশ্যমান হয়েছে। মোকামতলা থেকে রংপুর মর্ডান মোড় পর্যন্ত তিনটি প্যাকেজসহ অন্যান্য প্যাকেজের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের কাজ স্ব-স্ব জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, বড় ধরনের জটিলতা বা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন না হলে উল্লেখিত বাজেটেই কাজ শেষ হতে পারে।

রংপুর সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ কে এম শফিকুজ্জামান বলেন, রংপুর জাতীয় মহাসড়ক ছয়লেনের পাশাপাশি দুপাশে বাইলেন সড়ক হবে। ছয়লেন হওয়ার পর সব ক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলের দৃশ্যপটই পাল্টে যাবে। রংপুর সওজর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন ২০২১ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। তখনই প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকৃত বয়ে আনবে। উপকৃত হবে রাজশাহী রংপুর অঞ্চলের মানুষ। থাকবে না যানজট। কমে আসবে সড়ক দুর্ঘটনা। পাল্টে যাবে অর্থনীতির চিরচেনা দৃশ্যপট।

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০২০

১৮/০১/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: