২৮ জানুয়ারী ২০২০, ১৫ মাঘ ১৪২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

নিউইয়র্কে এখন উৎসব বৃক্ষের বিসর্জনকাল

প্রকাশিত : ১২ জানুয়ারী ২০২০
  • শরীফা খন্দকার

অতলান্তিক নগরে এ সময়টিতে এখন একটু একটু করে উৎসবের আলোকমালা নিভে যাবার পালা। বছরের সর্ববৃহৎ হলিডে সিজন থ্যাংকস গিভিং, ক্রিসমাস আর নিউইয়ার শেষে নগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানুষ ঘরে ফিরে এলো যার যার সময়মতো। ছাত্রছাত্রীদের কলতানে তেমন মুখরিত না হলেও একটু একটু করে তাদেরও উপস্থিতি ঘটছে স্কুলের ক্লাসরুমে। আমাদের আশ্চর্য নির্ঘুম বাণিজ্যিক নগর ম্যানহাটনের সুবিশাল কর্মযজ্ঞ তো কখনও থেমে থাকে না। তারপরও বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিসমাস উৎসবের পটভূমিতে কটা দিন ছিল কিছু আনমনা, কিছুবা মন্থর। পর্ব শেষে নিউইয়র্ক নগর তার চিরাচরিত বেগে পূর্ণোদ্যমে ছুটছে দিনরাত। কিন্তু পর্ব ফুরোবার পরও একদিকে যেমন বিশ্ব বাণিজ্যের রাজধানীতে হেথা-হোথা উঁকি দিচ্ছে নগরসজ্জা ও আলো ঝলমল উৎসব বৃক্ষ এবং সেই আলো জ্বলবে আরও কিছুদিন, অন্যদিকে এরই মাঝে দৃষ্টি চলে যায় এতদিন যাদের পাতায় পাতায় ছিল আলোর নাচন, সেইসব বৃক্ষদল নিক্ষিপ্ত হবার জন্য আবর্জনা ফেলার ট্রাকে করে চলে যাচ্ছে দূরের কোন ভাগাড়ে। এগুলো থেকে পার্ক কিংবা অন্যান্য গাছপালা যাতে সংক্রমিত না হয় সে বিষয়ে নগর কর্তারা সতর্ক। স্যানিটেশন কর্মীরা এগুলোকে গার্বেজ হিসেবে তুলে নিয়ে যাওয়া শুরু করেছেন ৫ জানুয়ারি থেকে।

শৈশবে, কৈশোরে আমার কাছে ক্রিসমাস পর্ব ছিল গল্পে শোনা, বইয়ে পড়া আর ছবিতে দেখা দিন। রংপুরের দিনগুলো পেরিয়ে ঢাকার জীবনে এসে বড়দিনের উৎসব আমায় ডেকে না নিলেও আলোকিত দুটি ক্রিসমাস ট্রির সঙ্গে দেখা হতো- তাও কাছ থেকে নয়, বেশ কিছু দূর থেকে। ডিসেম্বর মাসে কখনও কাকরাইলের আর্চ বিশপ চার্চের পাশ দিয়ে অথবা তদানীন্তন নীড় বেইলি রোড ধরে রমনার দিকে রিক্সায় চেপে যেতে যেতে চোখ পড়ত ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্রাঙ্গণে আলোকমালায় সেজে ওঠা দুটি ক্রিসমাস ট্রি।

বড় ইচ্ছে হতো দূরের কোন গির্জার এক শেষ আসনে বসে খ্রিস্ট ধর্মের মানুষের অন্তরের প্রার্থনার কোন সুর শুনি! বাল্য, কৈশোরে যেমন আকাশবাণী রেডিও থেকে শুনতাম ভোর ৪টায় বেজে ওঠা বীরেণ ভদ্রের কণ্ঠে মহিষাসুর মর্দিনী চণ্ডি পাঠ। তার অসাধারণ সেই পাঠের ছন্দ ও সুরে আমি আর আমার নানা মিলে দু’জনের মুগ্ধ হওয়ার দিন আজও ভুলিনি। মাতামহীর প্রিয় এক গান ছিল– ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে।’ তাই পরিণত বয়সে খ্রিস্ট উৎসবেও মনে হতো এর রঙেও যেন একটুখানি একাকার হয়ে যাই। ছোটবেলার গল্পে শোনা কেক, কুকিজের স্বাদ গ্রহণ করি, আজও না ভোলা ইন্দিরা মাসিমার লুচি নাড়ুর সুস্বাদের মতো।

ইমিগ্রেশন পেয়ে নব্বই দশকের শুরুতে অতলান্তিক সাগর তীরে পৌঁছে যাবার কিছুদিন পর অভাবিতভাবেই সামনে এলো স্বপ্নের মতো উৎসবের রাশি রাশি চকোলেট, কুকিজ, কেক, আরও কত কি! কারণ ভাগ্য আমাকে জীবিকা নির্বাহের জন্য টেনে নিয়ে গিয়েছিল নগরের স্বনামখ্যাত এক প্রতিষ্ঠানে। আর সেখানেই মাসাধিককালব্যাপী অনুষ্ঠিত হলিডে সিজনে একনাগাড়ে জীবনের দু’যুগ ধরে ঘটে গেল এমন ব্যাপার। ক্রিসমাস অবশ্য আমেরিকার অসংখ্য মানুষের কাছে শুধু ধর্মীয় নয়, সেটি কেনাকাটা, উপহার, আহার নানা কিছু মিলিয়ে একটি সামাজিক উৎসবও বটে। সবাই না হলেও অন্য ধর্মে বিশ্বাসী উদার মানুষ, এমনকি ঈশ্বরহীন মানুষগুলোও এ উপলক্ষে আনন্দে মেতে ওঠে।

ক্যালেন্ডারে নবেম্বর মাস পড়তেই সর্বত্র যেন বেজে উঠেছিল ক্রিসমাসের জিঙ্গেল বেলের গান। রকফেলার সেন্টার থেকে প্রতিটি শপিং মল, এমনকি ক্ষুদে দোকানগুলোও সেজে উঠল আলোকমালায় সজ্জিত সেই বড়দিন বৃক্ষ। শুধু গির্জা নয়, মানুষ সেই আলো দিয়ে সাজাচ্ছে আপন গৃহের বাহির-অন্দর। বিস্ময়ের সঙ্গে আরও দেখলাম অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসহ আমাদের অফিস প্রাঙ্গণের সুপ্রশস্ত লবিটি ঝলমল করে উঠল লম্বা ডালপালাসমেত দীর্ঘ ক্রিসমাস ট্রির আলোর রোশনাইয়ে।

শুধু অফিস বিল্ডিয়ের লবিতেই নয়, ২০টির মতো ডিপার্টমেন্টের করিডরে কিংবা হলওয়েতে এসে গেল আলোয় সাজানো মাঝারি আকারের গাছ। অবশ্য এসব হয় এমপ্লয়ীদের নিজ উদ্যোগে। আমাদের বিভাগে উদ্যোগী ক’জন মিলে কিনে আনল একটি আর্টিফিসিয়াল ট্রি, লাইট এবং অর্নামেন্ট। এগুলো কেনার জন্য ডিরেক্টরসহ যে যার ইচ্ছেমতো চাঁদা দিল। আমি নিজেও এর থেকে বঞ্চিত যেমন থাকতে চাইনি, তেমনি ভাগ নিতে চেয়েছি সবার বড়দিনের সবটুকু আনন্দে। যাকে বলে ট্রি ট্রিমিং। সেই কাজে সানন্দে নিজে থেকেই হাত লাগিয়েছি অন্যতম ভূমিকায়। ভিন্নধর্মী বলে আমার হাতের ছোঁয়ায় এই গাছ অপবিত্র হয়ে যাবে সেটা সহকর্মীদের কেউ বলেনি।

এদেশে ক্রিসমাস একদিনের উৎসব নয়, বিশেষ ধর্মের ভেতরও কঠিনভাবে আবদ্ধ থাকেনি। আমার অফিসে মাসাধিকব্যাপী বড়দিন উৎসব শুরু হতো ট্রি সাজানোর পর থেকে। এরপর দেখা যেত প্রতিদিন কেউ না কেউ হয়তো বস কিংবা শুভাকাক্সক্ষী, বন্ধু, সহকর্মীরা নিয়ে আসছে ব্রেকফাস্টের জন্য বেগেল আর চিজ কিংবা নিজ হাতে বানিয়ে আনছে এটা-সেটা খাবার। কারও হাত দিয়ে আসছে কুকিজ, নাটস, ক্যান্ডি ইত্যদি। আমিও বাদ যেতাম না সেই দল থেকে। একটা ছোট টেবিলে সাজিয়ে রাখা হতো এসব, যে যার মর্জিমতো সময় করে সেসবে ভাগ বসাত।

ক্রিসমাস উৎসব উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একই দিনে আয়োজন করা হতো এক লাঞ্চ পার্টি। বিল্ডিংসুদ্ধ এমপ্লয়ীকে আপ্যায়িত করা হতো, যাদের সংখ্যা ছিল প্রায় হাজার। তাদের সবাইকে সেদিন খাবার পরিবেশন করতেন সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তিসহ প্রত্যেক বিভাগের শীর্ষস্থানীয়রা। কিন্তু আমাদের কাছে আনন্দময় হতো আমাদের নিজস্ব ডিপার্টমেন্টাল পার্টি। ডিসেম্বর আসবার আগেই এর জন্য নির্ধারণ করা হতো কোন একটা দিন। সাধারণত ৭ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে কোন একটি দিন। কারণ এরপর থেকেই এমপ্লয়ীরা লম্বা ছুটি নিতে শুরু করে। এর ব্যয়ভার কখনও ওপরওয়ালা স্পন্সর করত যেমন, তেমনি অনেক পার্টিতেই আমরা নিজ নিজ ঐতিহ্য অনুসারে রান্না করে নিয়ে যেতাম। সেদিন আমি সবার সপ্রশংস দৃষ্টির সামনে অফিসে পরে যেতাম লাল-সবুজ রঙে মেশানো শাড়ি, বরাবর পরতাম শাড়ি। অতঃপর দুপুর ১টার দিকে ধর্ম-বর্ণ মিলে হাতে হাত ধরে বিশাল এক টেবিলে যেখানে প্রার্থনা করত সহকর্মী ক্যাথরিন- ‘গড ইজ গুড গড ইজ গ্রেট- লেট্ আস থ্যাংক গড ফর আওয়ার ফুড, বাই হিস্ ব্লেসিং উই আর ফিড, গিভ আস লর্ড আওয়ার ডেইলি ব্রেড।’

এই পার্টির আগেই আমরা সবাই উপহারের জন্য কেনাকাটা শেষ করতাম। সেদিন যার যার বন্ধু অথবা প্রিয়জন, বসদের জন্য উপহার আনা হতো। তারপর কিছু গিফট নিয়ে একটা সারপ্রাইজ খেলাও হতো, যা ছিল মজার এক লটারি খেলা। লটারিতে যার নাম উঠবে সেই পাবে সেই উপহার। এরপর নেচে,-গেয়ে আসর মাত হতো প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত। উৎসব আনন্দের প্রতীক ক্রিসমাস বৃক্ষটি বিধিমোতাবেক আলো খুলে নেয়া হতো জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখে।

ইতিহাসের কথা বললে বলতে হয় জার্মান থেকে যেসব প্রটেস্টান্ট খ্রিস্টান সেটেলার আমেরিকায় এসে ষোড়শ শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত পেনসিলভেনিয়ায় বসতি গড়েছিলেন সর্বপ্রথম তারা তাদের ঐতিহ্য অনুসারে ক্রিসমাস উপলক্ষে তাদের আমেরিকান বাড়ির বহিরাঙ্গনে ক্রিসমাস ট্রি দিয়ে সাজাতে শুরু করেছিলেন। জার্মান ঐতিহ্যের এমন সৌন্দর্যে মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৩২ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক চার্লস ফোলেন প্রথম আমেরিকান হিসেবে মোমবাতি দ্বারা সজ্জিত করে ক্রিসমাস ট্রি আলোকিত করেছিলেন। ১৮৫১ সালে মার্ক কার নামের এক ব্যক্তি প্রথম ক্রিসমাস ট্রি ব্যবসা চালু করেছিলেন ক্যাটসিল পর্বতমালা থেকে চিরসবুজ চূড়াধারী গাছ কেটে এনে নিউইয়র্ক সিটির ওয়াশিংটন মার্কেটে বিক্রি করে। কিছু অর্থবান মানুষ সেসব কিনে সেই সময় থেকে ক্রিসমাস ট্রি দিয়ে সাজাতে শুরু করলেন বাড়ির হলিডে সজ্জা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন পিয়েরস বড়দিন উপলক্ষে ১৮৫৬ সালে যেদিন একটি ক্রিসমাস ট্রি মোমবাতিতে সজ্জিত করে আলোকিত করে তুললেন হোয়াইট হাউস সেদিন থেকেই বিষয়টি আলোড়ন তুলল সারাদেশে। আর সেই সময় থেকেই একটি সবুজ বৃক্ষ হয়ে গেল পার্ট অব আমেরিকান ক্রিসমাস সেলিব্রেশন।

ম্যানহাটনের ৬ এভিনিউতে অবস্থিত রকফেলার সেন্টারের বিখ্যাত ট্রিটি প্রতিবার রয়ে যায় জানুয়ারির শেষ ভাগ পর্যন্ত। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকি সারা দুনিয়া থেকে যার আলোর সৌন্দর্য দেখতে দলে দলে এখনও ছুটে আসে হাজারও মানুষ। ২০২০তে এটির বিসর্জনের দিন ১৭ জানুয়ারি।

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী

প্রকাশিত : ১২ জানুয়ারী ২০২০

১২/০১/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: