৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

অনেক পাবলিক ভার্সিটি দিনে সরকারী, রাতে বেসরকারী

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৯
অনেক পাবলিক ভার্সিটি দিনে সরকারী, রাতে বেসরকারী
  • ঢাবি সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি
  • কোন কোন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কী তা ভুলে গেছেন
  • ছাত্ররা লেখাপড়া করে জ্ঞানার্জনের জন্য ভর্তি হয়, লাশ হয়ে বা বহিষ্কৃত হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য নয়

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রম চালুর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিনে সরকারী আর রাতে বেসরকারী চরিত্র ধারণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। তিনি আরও বলেন, ডাকসু নেতাদের বিষয়ে এমন সব কথা শুনি যা আমার ভাল লাগে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের কর্মকা-কে প্রশ্নবিদ্ধ করে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, তাদের কর্মকা- দেখলে মনে হয়, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কী, তা ভুলে গেছেন।

সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের কসমিক রে রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. তাকাকি কাজিতা। এছাড়া ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, রেজিস্ট্রার এনামউজ্জামানসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে সরকারী আর রাতে বেসরকারী চরিত্র ধারণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যায় মেলায় পরিণত হয়। এটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। কিছু শিক্ষকের নিয়মিত কোর্সের প্রতি উদাসীনতা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, কিছু শিক্ষক নিয়মিত কোর্সের বিষয়ে অনেকটা উদাসীন। কিন্তু ইভিনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার বিষয়ে তারা খুবই সিরিয়াস। কারণ, এগুলোতে নগদ প্রাপ্তি থাকে। তারা নিয়মিত নগদ সুবিধা পাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন।

সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রমের অনিয়ম তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি শুনেছি তাদের একটা বিষয় ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস। এতে তাদের ২২টা কোর্স। প্রতি কোর্সে সাড়ে ১০ হাজার টাকা। এতে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকার ওপরে হয়। এর অর্ধেক শিক্ষকরা পায়, আর অর্ধেক বিভাগ পায়। বিভাগের টাকা কী হয় জানি না, কিন্তু শিক্ষকরা পাচ্ছেন। আমি এটাও জানি, যাদের শুধু পিএইচডি আছে, শুধু তারাই ক্লাস নেয়। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক ও একাডেমিক লিডার। কিন্তু কোন কোন উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকা- দেখলে মনে হয়, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কী, তা ভুলে গেছেন। অনেক শিক্ষকই প্রশাসনিক পদ-পদবি পেয়ে নিজে যে একজন শিক্ষক, সেই পরিচয় ভুলে যান।

তিনি বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া করে জ্ঞানার্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, লাশ হয়ে বা বহিষ্কৃত হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য নয়। কর্তৃপক্ষ সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে অপ্রত্যাশিত ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হতো। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারে না। আমি আশা করি, কর্তৃপক্ষ এরপর থেকে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জবাবদিহিতার কথা স্মরণ করিয়ে আবদুল হামিদ বলেন, মনে রাখবেন বিশ্ববিদ্যালয় চলে জনগণের টাকায়। সুতরাং এর জবাবদিহিও জনগণের কাছে। জনগণের এই অর্থে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের যেমন ভাগ আছে তেমনি ভাগ আছে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা পয়সা সততার সঙ্গে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব উপাচার্য ও শিক্ষকদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু জ্ঞানদান করা নয়। বরং অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোই হচ্ছে আসল কাজ। গবেষণা হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কাজ। গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্নœ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, পদোন্নতির জন্য গবেষণা, না মৌলিক গবেষণা তাও বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক বিভাগেই এখন অন্যান্য পদের শিক্ষকের চেয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা বেশি। অনেক শিক্ষকই প্রশাসনিক পদ-পদবি পেয়ে নিজে যে একজন শিক্ষক সে পরিচয় ভুলে যান।

উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে অহেতুক অর্থ ব্যয় থেকে শিক্ষার্থী ও পরিবারকে রেহাই দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘সমন্বিত গুচ্ছভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা’ পদ্ধতি চালু করার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রথম যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রেজাল্ট দিয়ে দেয়, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে চান্স পাবে কী পাবে না এই চিন্তা থেকে আগে কলেজে ভর্তি হয়ে যায়। সরকারী কলেজে ভর্তি হতে গেলে প্রায় ৫ হাজার টাকা লাগে বেসরকারী কলেজে ২০-২৫-৩০ হাজার টাকা লাগে। পরে অনেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যায়। পরে যেখানে ভর্তি হয়ে আছে, সেখানকার ভর্তি বাতিল করতে টাকা লাগে। অনেকে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় অনেক টাকা দিয়ে। ওই ছেলে বা মেয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় তখন সেটা বাতিল করে আসে। তখন মূল মার্কশীট, সনদ ফেরত আনতে ২০-২৫ হাজার দিতে হয়।

তাই ডিসেম্বরের মধ্যে সব পরীক্ষা শেষ করে ১ থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ভর্তির ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা তাদের চান্স পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দ মতো ভর্তি হবে। অনর্থক অর্থ ব্যয় থেকে মুক্তি পাবে। হয়রানি থেকে রক্ষা পাবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ডাকসু নির্বাচন হলো আশা করছিলাম এই ডাকসু নেতারা কথাগুলো বলবে। দাবি-দাওয়া করবে। আমি কেন বলব? আমি চ্যান্সেলর। আমাকে কেন বলতে হবে? ছাত্র নেতাদের এসব কথা বলা উচিত। তারা তো এ ব্যাপারে কোন কথা বলে না। বরং তাদের ব্যাপারে অন্য এমন সব কথা শুনি, যেগুলো আমার ভাল লাগে না। এর বেশি বলে আমি কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চাই না। তবে তাদের কর্মকা- আমার ভাল লাগে না। তাদের এমন কিছু করা উচিত, যা সাধারণ ছাত্রদের কল্যাণে কাজ করে।

ভেজাল ওষুধ রোধে ছাত্রদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, আজকে এমবিবিএস আর ফার্মেসি সার্টিফিকেট দিছি। ডাক্তার সাহেবরা সমানে প্রেসক্রিপশন দেয়। মফস্বলে যে মেডিসিন দেয় তা মেয়াদ উত্তীর্ণ থাকে। আমি অনুরোধ করব, ডাক্তার-ফার্মাসিস্ট এ বিষয়টি দেখবেন। নিজে ওষুধগুলো পরীক্ষা করে দেখবেন। মেয়াদ পার হয়ে গেলে বিষ হয়ে যায়। ওষুধ নাকি ২-৩ রকমের হয়, বেস্ট কোয়ালিটি বিদেশে যায়। এক প্রকার ঢাকায় আর মফস্বলে খারাপ কোয়ালিটিরটা যায়। ছাত্র সমাজকে এ বিষয়টি রুখে দিতে হবে। এ নিয়ে সজাগ থাকা দরকার। ভেজাল ওষুধ নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। জাতি হিসেবে না হয় পঙ্গু হয়ে যাব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, আমাদের সন্তানদের আমরা সেই শিক্ষা দানের চেষ্টা করি, যে শিক্ষা তাদের মধ্যে যুক্তিবাদিতা, বিবেক ও মানবতাবোধকে জাগ্রত করবে। ফলে তারা ভাল চিন্তা ও কাক্সিক্ষত মানবোচিত কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে।

ভিসি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মানুষ অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানসহ তথাকথিত উন্নত জীবনের বস্তুগত সামগ্রী অর্জনের নিমিত্তে অধিক মুনাফা লাভের প্রয়োজনীয় বিদ্যালাভের পেছনে যতটা ছুটছে, মানবিকতা উন্নয়নমূলক শিক্ষা বিষয়ে ততটা নয়। আমাদের সামাজিক জীবনের যে অস্থিরতা, তরুণ সমাজের একাংশের যে বিপদগামিতার কথা আজ বলা হচ্ছে, এর অন্যতম কারণ এটি।

প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

১০/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: