২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

হরেক রান্নায় ব্যবহৃত যার কোন কিছুই ফেলনা নয়


হরেক রান্নায় ব্যবহৃত যার কোন কিছুই ফেলনা নয়

সমুদ্র হক ॥ এক সময় শিশুরা বলত- কচি বা শিশু ডাবের বৃদ্ধ অবস্থা নারিকেল। যার কোন কিছুই ফেলনা নয়। উপকূলীয় এলাকার অন্যতম ফল দেশের প্রতিটি এলাকায় ফলছে। দূর অতীতে গ্রামের ও শহরের কোন বাড়ির সামনে থাকা ডাব গাছ দিকনিদের্শক ও পরিচিতি বহন করত। ডাবই পূর্ণতা পায় নারিকেলে।

বৃক্ষরোপণ মৌসুমে নারিকেলের গাছ রোপণ হয় কম। যে কারণে উপকূলীয় অঞ্চল ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে নারিকেলের গাছ সহজে চোখে পড়ে না। কথ্য ভাষায় নারিকেল, নারকোল নারকেল এ ভাবে বলা হয়। নারিকেলের ছোবড়া, খুলি, তার ভিতরের পানি, শাঁস সবই কাজে লাগে। নারিকেল থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ভোজ্য তেল, খাদ্য, কসমেটিকস তেল। নারিকেলের দুধ, নারিকেলের শুষ্ক শাঁস সুস্বাদু খাবারের বড় রেসিপি। পিঠা পুলিতে নারিকেলের শুষ্ক শাঁস স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। তরকারিতেও কম যায় না নারিকেল। খাবারের নতুন রেসিপিতে নারিকেলের দুধ স্বাদ এতটাই বাড়িয়ে দিচ্ছে যে চেটেপুটে খেতে হয়। খাওয়ার শেষে বলতে হয় ‘আর নেই, থাকলে পাতে আরেকটু দিলে কি মজা।’

বর্তমান প্রজন্ম নারিকেলের দুধ সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। অনেকে তা দেখেওনি। নারিকেলের ছোবড়া ছেড়ে নেয়ার পর বের হয় শক্ত খুলি। তার মাথায় ছিদ্র করার পর তা ঢেলে পানি বের করে পান করা হয়। সেই খুলি ভাঙ্গার পর বের হয় নারিকেলের শুষ্ক শাঁস। এই শাঁস বের করে কুচি কুচি করে কেটে ব্লেন্ডারে দিয়ে পিষে নেয়ার পর তা ছেঁকে বের হয়ে আসে সাদা রঙের দুধ। নারিকেলের এই দুধ খাবারের বাড়তি স্বাদ এনে দেয়।

নারিকেলের এই শুষ্ক শাঁস ঝুরে নাড়ু, পাটিসাপটা, পুলি পিঠা কুসলি পিঠাসহ নানা ধরনের পিঠা বানানো হয়। শুষ্ক শাঁস ঝুরে নিয়ে গোশতের কোর্মাতেও ব্যবহার করা হয়। মুরগির গোশত ও মাছের ঝাল তরকারিতেও ব্যবহার হয় নারিকেলের শুষ্ক শাঁস। নারিকেলের শুষ্ক শাঁস রিফাইন করে তৈরি হয় দুই ধরনের তেল। ভোজ্য তেল ব্যবহার হয় রান্নার কাজে। আরেকটি তেল ব্যবহার হয় মাথার তেল হিসাবে। নারিকেলের তেল নানা রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে। এক ধরনের চর্ম রোগ সারাতে নারিকেলের তেল ব্যবহার করা হয়।

নারিকেলের কোন কিছুই ফেলে দেয়ার নয়। নারিকেলের ছোবড়া ব্যবহার হয় সোফাসেট ও তোষক তৈরির কাছে। নারিকেলের খুলি দিয়ে গ্রামীণ নারী তৈরি করে রান্না করার মালই। যা গোল চামুচের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে এবং মারোয়ারি সম্প্রদায় তাদের অনেক অনুষ্ঠানে নারিকেলের খুলি ভাঙ্গে। বলা হয় শুভ কাজের সূচনায় নারিকেলের খুলি ভাঙতে হয়।

এই নারিকেল গাছের উৎপত্তি ১৫শ’ শতকে। পর্তুগীজ ও স্পেনে নারিকেলের গাছের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন জাহাজ নিয়ে প্যাসেফিক সাগরে পরিভ্রমণরত একজন নাবিক। পরে তিনি ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের তীরে লক্ষ্য করেন পাম গাছের মতো এক ধরনের গাছ। এই গাছই যে নারিকেল পরে তা আবিষ্কৃত হয়। নারিকেলের গাছ পাম জাত ভুক্ত। পাম গাছের জাতের একটি অংশ কোকো। এর বিজ্ঞান নাম ককোস নিউসিফিরা। এই ককোস আরাসিয়া গোত্রের।

নারিকেলের গাছ সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ মিটার উচ্চতার। বেলে দোঁআশ মাটি, উর্বর ভূমিসহ সাগর পাড়ে উপকূলীয় এলাকায় নারিকেল গাছ বেশি জন্মে। নারিকেলের গাছ রোপণের পর তাতে ফল ধরতে ৬ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। পরবর্তী বিশ বছর পর্যন্ত নারিকেল ধরে। সাগর পাড় ও উপকূলীয় এলাকার নারিকেল দিয়ে দেশের চাহিদা মেটে। উত্তরাঞ্চলে নারিকেল বেশি আসে ভোলা বরিশাল খুলনা থেকে। উপকূলীয় এলাকার নারিকেলের সাইজ ও ওজন সবচেয়ে বেশি। একেকটি নারিকেলের ওজন এক কেজি থেকে দুই কেজি পর্যন্ত হয়। দেশের প্রতিটি জেলায় নারিকেল বিক্রির আলাদা আড়ত আছে।

দেশে নারিকেলের চাহিদা সকল মৌসুমেই আছে। বেড়ে যায় শীত মৌসুমে। এছাড়াও রমজান মাস ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় উৎসবে দুর্গাপূজার সময় নারিকেলের দরকার হয় বেশি। এই দুই সময়ে নারিকেলের দাম বেড়ে যায়।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: