২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধ নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিষদের ওপর


মোয়াজ্জেমুল হক ॥ রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করে আসা সংখ্যালঘু একটি জাতিগোষ্ঠীর নাম। এরা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু ’৮২ সালে জান্তা সরকার তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার পর তারা হয়েছে নিজ দেশে পরবাসী। দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় পূর্ব থেকে মিয়ানমার সরকার এবং সে দেশের সংখ্যাগুরুরা উগ্র সদস্যরা রোহিঙ্গাদের বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে। আর তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের এ অঞ্চলে আগমন শুরু। গড়তে থাকে বসতি। সময় যতই গড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-নিপীড়ন এবং বর্বরোচিত হামলাসহ এমন কোন হামলা নেই যা চলেনি। ফলে রোহিঙ্গাদের সে দেশের বিশেষ রাখাইন রাজ্যে বেঁচে থাকার সংগ্রামের সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতম দিকে ধাবিত হয়েছে।

দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সামরিক শাসনের কবল থেকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা নিধনে যে ছক কষেছে বর্তমান গণতন্ত্রের লেবাসধারী নোবেল বিজয়ী আউং সান সুচির এনএলডি সরকার তা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন শুরু করেছে বর্বরোচিত কায়দায়। গণহত্যা ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে তাদের দেশান্তরি হতে বাধ্য করার মাধ্যমে। ফলে রোহিঙ্গারা কেবলই নিজেদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়েছে। বিশেষ করে আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী নিকটবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কক্সবাজার অঞ্চলে। ফলে বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ পড়েছে। যা অসহনীয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয়ের দিকটি বিবেচনা করে বরাবরই বাংলাদেশ অসহায় এই জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আশ্রয়দানের মানবিক দিকটি অনুসরণ করে চলেছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার এ ঘটনা উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি ডেকে আনার সমূহ সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। এরপরও অসহায় রোহিঙ্গাদের গণহত্যা বন্ধ ও পালিয়ে এসে আশ্রিতদের ইস্যুতে বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনা করে মানবিকতার চ্যালেঞ্জিং অভিযাত্রায় নেমেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের একার পক্ষে কখনও সম্ভব নয় বলে সরকার পক্ষে ইতোমধ্যে জাতিসংঘসহ বিশ্বের সকল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া জাতিসংঘসহ সারাবিশ্ব এখন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিধনযজ্ঞ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্ত কোন এ্যাকশন প্ল্যান লক্ষণীয় নয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা বন্ধ ও বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে প্রত্যাবাসনে সুযোগ দেয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি।

মিয়ানমার সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। শিক্ষা-দীক্ষা, উন্নয়ন, বাণিজ্য, নিরাপদ বসতি প্রতিষ্ঠা এমনকি অবাধ চলাফেরার ক্ষেত্রেও সামরিক জান্তা বাহিনীর নানামুখী নির্দেশনা আরোপিত হয়ে আছে। ফলে রাখাইন রাজ্যটি সে দেশের একটি অনগ্রসর এলাকায় পরিণত হয়ে আছে। এর ওপর বছর বছর দফায় দফায় চালানো হচ্ছে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান। এ অভিযান কখনও সেনা নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী, আবার কখনও এককভাবে সেনাবাহিনী, আবার কখনও রাখাইন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যদের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। এ প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু হয়েছে গত আগস্ট মাসের মধ্যরাত থেকে। এর আগে রাজ্যজুড়ে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনীর হিংস্র সদস্যদের। মগের মুল্লুকের দেশ হিসেবে খ্যাত মিয়ানমার সরকারের এ হিংস্র বাহিনীর রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের চিত্র এখন সারাবিশ্বের দৃষ্টি কেড়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বশেষ ধাপটিও পার করেছে সেখানকার সেনা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উগ্র গোষ্ঠীর সদস্যরা।

সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট রাত থেকে রাখাইন রাজ্যে সেনা মোতায়েনের পর যে অভিযান শুরু হয়েছে তাতে সেখানকার চারটি টাউনশিপ মংডু, সিটওয়ে, বুচিদং, রাচিদং শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চল জ্বলন্ত আগ্নেগিরিতে পরিণত করে ভয়াল মৃত্যুকূপ বানিয়েও জান্তা সমর্থিত মিয়ানমার সরকার তাদের পূর্ববর্তী সরকারের প্রণীত রোহিঙ্গা নিধনের নীতি বাস্তবায়নে হিংস্রতার অটল অবস্থানে রয়েছে।

রাখাইন রাজ্য থেকে সংখ্যালঘু মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা কেন দলে দলে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তা নিয়ে মিয়ানমার সরকার নাটকীয়তা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানকার এনএলডি সরকারের নেতৃত্বাদানকারী স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী নোবেল বিজয়ী আউং সান সুচি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীপ্রধান এ পর্যন্ত রাখাইন রাজ্য নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা জঘণ্য মিথ্যাচার বলে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের হাতেগোনা তিনটি শক্তিশালী দেশ ছাড়া এমন কোন দেশ নেই যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, বর্বর নির্যাতন, বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া ও দেশান্তরি হতে বাধ্য করার বিষয়ে সোচ্চার হয়নি। কিন্তু মিয়ানমার সরকার কয়েকটি শক্তিশালী দেশের সহযোগিতা নিয়ে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান অব্যাহত রেখেছে। যে অভিযান রুয়ান্ডা, বসনিয়ার গণহত্যাকেও হার মানিয়েছে বলে জাতিসংঘে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে। এরপরও মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে রাখাইন রাজ্যে মুসলমানরা যারা দলে দলে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তা তারা জানে না। এ বিষয়ে তারা এক ধাপ আগ বাড়িয়ে বলেছে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমানদের মধ্যে যে সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে, যারা আরসা নামে পরিচিত। তারাই গত ২৪ আগস্ট একটি সেনাসহ পুলিশের ৩৪ চৌকিতে একযোগে হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট ও ৯ সেনা সদস্যকে হত্যা করার ঘটনার পর সন্ত্রাসী ও জঙ্গী তৎপরতা রোধে রাখাইন রাজ্যে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারের এ বক্তব্য শতাব্দীর সেরা মিথ্যাচার বলে চিহ্নিত হয়েছে। মূলত, বিষয়টি রোহিঙ্গা মুসলমানদের সমূলে রাখাইন রাজ্য থেকে উৎখাতের পরিকল্পিত নীলনক্সারই অংশ।

এনএলডি নেত্রী সুচির পিতা আউং সান সরকার থাকাকালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীতে সে নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় সামরিক জান্তা সরকার। সুচির পিতা আউং সানও হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। তার কন্যা আউং সান সুচিও সামরিক জান্তা বাহিনীর হাতে এক যুগেরও বেশি সময় গৃহবন্দী ছিলেন। তার মুক্তি ও পরবর্তীতে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পথে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সুচি বর্তমানে সামরিক জান্তা বাহিনীর হাতের পুতুল হয়ে প্রণীত সেই নীলনক্সা বাস্তবায়নের পথেই রয়েছেন। যে কারণে বিশ্বের দেশে দেশে সুচিকে দেয়া নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেয়ার সোচ্চার দাবি উঠেছে। মূলত, সুচি সরকার শক্তিশালী কয়েকটি দেশের সঙ্গে রাখাইন রাজ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা ও দেশ ছাড়া করার প্রক্রিয়ায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বাণিজ্যিক এ স্বার্থের সঙ্গে প্রকাশ্যে যুক্ত রয়েছে শক্তিশালী চীন, রাশিয়া ও ভারত। তাই এ তিন দেশ মিয়ানমার সরকারের বর্তমান কর্মকা- নিয়ে সে দেশের পাশেই অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে রাখাইন পরিস্থিতিতে এসব দেশ উদ্বেগও প্রকাশ করেছে। অথচ সেনা বর্বরতা বন্ধে মিয়ানমারের প্রতি কঠোর হতে বা রোহিঙ্গাদের নিধন প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে কোন বক্তব্য প্রদান করেনি। অথচ জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশ এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য ও মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে সোচ্চার ভূমিকা গ্রহণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার হিউম্যান রাইট ওয়াচ, ইউএনএইচসিআর, আইএমওসহ বহু সংস্থা রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে নানামুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর পাশাপাশি আর্থিক এবং ত্রাণ সহায়তার ঘোষণাও দিয়েছেন এবং তা শুরুও হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের এ দেশের চলে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয় মূলত ১৯৬২ সাল থেকে। এরপর থেকে কেবলই ওরা আসছে। বর্বরোচিত কায়দায় রোহিঙ্গাবিরোধী সে দেশের জান্তা সরকারের অভিযান শুরু হয়েছে ১৯৮২ সাল থেকে। চলতি ২০১৭ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গারা আসছে বানের পানির মতো। রোহিঙ্গাদের ঢল যেন থামছেই না। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার নীতি গ্রহণ করে বলা হয়েছে, ‘ওরা আমাদের মেহমান’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তৃতায় বলেছেন, প্রয়োজনে ভাগ করে খাব। এরপরও বাংলাদেশ মানবতার পক্ষেই থাকবে। গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ৭২তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ইস্যুটি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে সারাবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ ইস্যুতে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সোচ্চার ভূমিকায় রয়েছেন রোহিঙ্গাদের গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমার সরকারকে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। জাতিসংঘের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ বহু দেশ মিয়ানমার সরকারকে এ গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী সমর্থিত এনএলডি সরকার এখনও এ বিষয়ে কোন কর্ণপাত করেনি। সর্বশেষ বলেছে, নাগরিকত্বের সনদ ও অন্যান্য বিষয় যাচাই-বাছাই করে কিছু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাবও করা হয়েছে। কিন্তু এ কথা সত্য যে, যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে এদের হাতেগোনা কিছু ছাড়া অন্য সকলের কাছে নাগরিকত্বের সনদ বা সে দেশের বসবাসকারী হিসেবে তেমন কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। কেননা, এ জাতীয় সবই জান্তা সরকার দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে কেড়ে নিয়েছে। ফলে তারা নিজ দেশে পরবাসী হয়েই জীবনযাপনে নিয়ত ছিল। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, বহু আগে প্রণীত রোহিঙ্গাদের সমূলে উৎখাতের লক্ষ্যে যা যা প্রয়োজন সবই সম্পূর্ণ করে তারা গত ২৫ আগস্ট রাত থেকে চূড়ান্ত অভিযানে নেমেছে। ফলে ইতোমধ্যেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সামরিক জান্তা বাহিনী, বিজিপি, পুলিশ ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উগ্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে কত রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছে এ সংখ্যা জানা না গেলেও তা যে ৬ সহস্রাধিক হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। অপরদিকে, বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা সরকারী পর্যায়ে সাড়ে ৪ লাখ বলা হলেও বেসরকারী পরিসংখ্যানে তা প্রায় ৬ লাখেরও কৌটায় পৌঁছেছে। ফলে ’৬২ সাল থেকে ক্রমাগতভাবে ওরা আসতে থাকায় এবং এ দেশে আশ্রিত হয়ে বসবাসের সুযোগ পেয়ে সংসার জীবনে থেকে নতুন নতুন রোহিঙ্গা সন্তানের জন্ম হয়েছে। ফলে পালিয়ে আসা ও এ দেশে জন্ম নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের বোঝা এবং ভবিষ্যতে অজানা শঙ্কারও বটে। কেননা, রাষ্ট্রবিহীন ও নাগরিকত্ববিহীন এসব রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেশী-বিদেশী কুচক্রীমহলের ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। কেননা, রোহিঙ্গাদের মাঝে সশস্ত্র গ্রুপও রয়েছে। এরা বিভিন্ন নামে সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ জন্ম নেয়া সংগঠনটির নাম এআরএসএ বা আরসা। যার নেতৃত্বে রয়েছেন আতাউল্লাহ জুনুনি নামে একজন। যার জন্ম পাকিস্তানের করাচিতে। শিক্ষা গ্রহণ ও বেড়ে ওঠা সৌদি আরব। ইতোমধ্যে আরসার পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুটি অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার আরসার এ ঘোষণা নাকচ করে দিয়ে অসহায় রোহিঙ্গাদের ওপর হিংস্র ছোবল হেনে যাচ্ছে। যাতে অকাতরে ঝরে যাচ্ছে রোহিঙ্গা নর-নারী ও শিশুর প্রাণ। আর দেশান্তরি হচ্ছে লাখে লাখে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সবচেয়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ। এ দেশ এমনিতেই জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত। তার ওপর মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় গ্রহণ করায় বিষয়টি বড় ধরনের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক ও সন্ত্রাসী চক্রের সহায়তায় বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলেও শঙ্কা রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

ত্রাণ সহায়তা ॥ বাংলাদেশে আশ্রিত লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বিশ্বের বহু দেশ সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি অর্থ ও ত্রাণ সহায়তার ঘোষণাও দিয়েছেন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বলেছেন, এ সমস্যা সমাধান বাংলাদেশে একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তিনি পরিষ্কারভাবে বিশ্ববাসীকে এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। এ আহ্বানে মিয়ানমার সরকারের ওপর বিভিন্ন দেশ চাপ সৃষ্টি করেছে বটে কিন্তু কার্যকর কোন এ্যাকশনে যাওয়ার ঘোষণা আসেনি। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় এ পর্যন্ত ত্রাণ পাঠিয়েছে ভারত ৫৩ টন, মালয়েশিয়া ১১৪ টন, আজার বাইজান ১০০ টন, ইন্দোনেশিয়া ৩৪০ টন, দুবাই ১০০ টন, তুরস্ক ১০ হাজার টন। এছাড়া অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে আরও কয়টি দেশ যার মধ্যে রয়েছেÑ জাতিসংঘ ৫৯২ কোটি টাকা, যুক্তরাষ্ট্র ৭৬০ কোটি টাকা, যুক্তরাজ্য ৭০ কোটি টাকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৫০ কোটি টাকা, সুইজারল্যান্ড ১০ কোটি টাকা, সৌদি আরব ১২২ কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়া ৪০ কোটি টাকা, ডেনমার্ক ২৫ কোটি টাকা, কুয়েত ১২ কোটি টাকা। এছাড়া আরও বহু দেশ অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে বলে জানানো হয়েছে। অপরদিকে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ইউএনএইচসিআর, আইওএম বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী, ডব্লিউএফটি অর্থ ও ত্রাণ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের লেবার পার্টি মিয়ানমারের ওপর রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চাপ সৃষ্টির জন্য বিশ্বের সকল দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এবং ত্রাণ সহায়তা প্রদানের ঘোষণাও দিয়েছে।

এতসব শর্তেও রাখাইন রাজ্যে চলমান সামরিক অভিযান এবং রোহিঙ্গা নিধন ও দেশান্তরী করার ঘটনায় প্রতীয়মান হচ্ছে, জান্তা সমর্থিত মিয়ানমার সরকার তাদের কয়েক দশক আগে প্রণীত নীলনক্সা ও স্বপ্ন পূরণের প্রহর গুনছে অর্থাৎ রাখাইন রাজ্যকে রোহিঙ্গাশূন্য করাই হচ্ছে আসল লক্ষ্য এবং এ রাজ্যে প্রধানত চীন, রাশিয়া এবং ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থে গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক বিশেষ অঞ্চল। কিন্তু পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে সমূলে নির্মূল করে মিয়ানমার সরকার তাদের অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কি-না সে প্রশ্নটিও রয়েছে সর্বাগ্রে। কেননা, রোহিঙ্গা নিধন প্রক্রিয়ায় নেমে আগামীতে সীমান্ত অঞ্চলে জঙ্গীবাদের ভয়াবহ উত্থান ঘটতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞদের মত রয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমানরা বাঙালী এবং সন্ত্রাসী। তারা সে দেশের নাগরিক নয়। অথচ ইতিহাস বলছে ঠিক উল্টো। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস হাজার বছরের। আশির দশকে তাদের নাগরিকত্ব ছিল। নব্বই দশকে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যা ও বিতাড়ন প্রক্রিয়ায় নামে মিয়ানমার সরকার। অনৈতিক, অগণতান্ত্রিক ও বর্বরোচিত কায়দায় কোন দেশে স্বৈরশাসন স্থায়ী রূপ নেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিয়ে অনুরূপ পন্থা অবলম্বন করায় মিয়ানমারও আগামীতে সে দেশে যে শান্তিতে থাকবে তাও সুদূরপরাহত। মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত। কেননা, প্রতিবেশী একটি দেশে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে এবং তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তার আঘাত এ দেশেও আসবে। বর্তমানে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দিতে গিয়ে সঙ্কটের সূত্রপাত হয়েছে এবং বিষয়টি যে দীর্ঘস্থায়ী হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সবচেয়ে বেশি ভীতিকর বিষয় হচ্ছে রোহিঙ্গাদের পক্ষে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদের উত্থান হলে তাতে সবচেয়ে বিপর্যয়ে পড়বে মিয়ানমার। আর তা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি একটি সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের নদী, স্থল ও সমুদ্রসীমা রয়েছে। এ ত্রিমুখী সীমানা থাকবে নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত, যা শুধু বাংলাদেশ নয়; শান্তিকামী বিশ্ববাসীর জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: