মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বেশিরভাগ বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

প্রকাশিত : ২০ মে ২০১৭
  • আইন কমিশনের প্রতিবেদন

নিখিল মানখিন ॥ দেশের অধিকাংশ বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অনুমোদন নেয়ার সময় সরকারী কর্তৃপক্ষের কাছে দেয়া শর্তসমূহ পরবর্তীতে আর মেনে চলে না অনেক কলেজ। অনেক কলেজের অনুমোদন আছে, হাসপাতাল নেই। শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যাল কোসের জন্য পর্যাপ্ত মেডিক্যাল উপকরণ নেই। ভাড়াটে ক্যাম্পাস ও শিক্ষক দিয়ে চলে। শিক্ষার্থীদের শেখার জন্য পাওয়া যায় না পর্যাপ্ত সংখ্যক রোগী। নেয়া হয় উচ্চ ভর্তি ফি। কলেজ কর্তৃপক্ষের ইচ্ছেমতো সবকিছু চলে। সরকারী নিয়ন্ত্রণ নেই। ডাক্তারি ডিগ্রী পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে কলেজ কর্তৃপক্ষের ওপর। বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের খুব বেশি সুযোগ নেই। বেশিরভাগ মেডিক্যাল কলেজ পরিণত হয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। আইন কমিশনের গবেষণায় উঠে এসেছে এসব চিত্র। এসব মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেও কোন নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না বলে কমিশনের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এক বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের আলোকে আইন কমিশন এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনে দেশের চিকিৎসা খাতের দুরবস্থার পেছনে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও চিকিৎসকদের অর্থ উপার্জনকেও দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবসেবার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নয়, শুধু অভিভাবকের চাপে অথবা অর্থ উপার্জনের উপায় বিবেচনায় চিকিৎসক হওয়ার জন্যই মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রথা প্রচলিত রয়েছে। কমিশনের গবেষণায় দেশের মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থা, সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসার অবস্থা, চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস, নার্সিং সার্ভিস, ব্লাড ব্যাংক, জরুরী বিভাগ, ওষুধ ব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো উল্লেখ করে স্বাস্থ্যসেবার করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে কমিশনের প্রতিবেদনে।

গবেষণায় বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ সংক্রান্ত সমস্যা তুলে ধরে বলা হয়, কম মেধার শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ায় সামগ্রিকভাবে শিক্ষার মান খারাপ হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বিপরীতে রোগীসহ অন্তত ৫টি শয্যা থাকা আবশ্যক, কিন্তু বেশিরভাগ বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজে পর্যাপ্ত শয্যা নেই। কিংবা শয্যা থাকলেও রোগী নেই, ফলে ছাত্রছাত্রীদের যথাযথভাবে হাতেকলমে শিক্ষা দেয়ার সুযোগ নেই। ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা অপ্রতুল। বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন নীতিমালা ব্যতিরেকে নিজেদের খুশিমতো অধ্যাপক, শিক্ষক ও ডাক্তার নিয়োগ দেয়। অধ্যাপক, অন্যান্য শিক্ষক ও ডাক্তারগণের মান মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মৃতদেহের অভাবে শিক্ষার্থীদের এ্যানাটমি শিক্ষা যথাযথ হয় না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো পড়াবার উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব, অথচ ওই মৌলিক বিষয়গুলোতে যথেষ্ট জ্ঞান ছাড়াই মেডিসিন, সার্জারি ইত্যাদি ব্যবহারিক বিষয়গুলোতে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয় রয়েছে দেশে ৭২টি বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ। কিন্তু মেডিক্যাল শিক্ষার মান করুণ, কারণ-পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, নার্স, শয্যা ও রোগীর অভাব।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রবণতা ভর্তি প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে গত বছর এই অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে বিশেষ করে বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজগুলোর পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে কিংবা ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন সহজ করে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাপ্তি নিশ্চিত করাও দুরবস্থার কারণ। এসব সমস্যা সমাধানে অর্ধশত সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। এর মধ্যে মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যবস্থা করা, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বিপরীতে রোগীসহ কমপক্ষে পাঁচটি শয্যা নিশ্চিত করা, বিদেশী ছাত্র কোটায় দেশী ছাত্র ভর্তি করার প্রচলিত প্রচলিত সম্পূণরূপে বন্ধ, প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের জন্য উন্নত দেশসমূহের ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি নিরীক্ষা করে আরও কার্যকর কৌশল অবলম্বন ও পরীক্ষার পাস নম্বরকে অতি সহজলভ্য করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী কলেজগুলোর মধ্যে শিক্ষা ব্যয়ের বিরাজমান অস্বাভাবিক ব্যবধান কমিয়ে অযোগ্য শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সঙ্কুচিত করতে হবে।

মেডিক্যাল শিক্ষার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত

এদিকে কিছু সংখ্যক বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজের কারণে পুরো চিকিৎসা সেক্টর প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মাহমুদ হাসান। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, বিভিন্ন কারণে পর্যাপ্ত দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে না। অনেক বেসরকারী কলেজে শিক্ষক, মেডিক্যাল উপকরণ ও রোগীর সঙ্কট রয়েছে। কিছু সংখ্যক মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতাল পর্যন্ত নেই। হাসপাতাল, রোগী ও পর্যাপ্ত মেডিক্যাল উপকরণ না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিক্যাল দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ে। নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আর শিক্ষকদের যোগ্যতা ভালভাবে মনিটরিং করা হয় না। একজন শিক্ষককে শিক্ষাদান ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হয়। অনেক সময় শিক্ষাদানের তুলনায় চিকিৎসাদানে বেশি সময় দিতে হয় শিক্ষকদের। অনেক শিক্ষক একাধিক মেডিক্যাল কলেজে সম্পৃক্ত থাকেন। তিনি আরও বলেন, বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজগুলোর মান বজায় রাখতে হবে। নিম্নমানের কলেজ থেকে বের হয়ে একজন দক্ষ চিকিৎসক এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের চিকিৎসকরা অনেক সময় জাতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠেন। ভাড়াটে ক্যাম্পাসে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ থাকে না। নতুন কলেজ অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক থাকা উচিত। মেডিক্যাল শিক্ষার মানের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, এ বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজগুলোর মান বজায় রাখতে হবে। নিম্নমানের কলেজ থেকে বের হয়ে একজন দক্ষ চিকিৎসক এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের চিকিৎসকরা অনেক সময় জাতির জন্য হুমকি হয়ে ওঠেন। দেশের শতকরা ৬০ ভাগ চিকিৎসক বের হয় বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ থেকে। আর তাদের সকলেই ধনাঢ্য পরিবার থেকে আসে। ফলে তারা গরিব মানুষের কষ্ট অনুভব করতে পারেন না বলে মনে করেন বিএমএ সভাপতি।

ন্যূনতম নিয়মনীতি মেনে চলে না এমন বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজও দেশে রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের পরিচালক অধ্যাপক আবদুর রউফ সরদার। তবে প্রশ্নবিদ্ধ কলেজগুলো বন্ধ না করে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে সেগুলোর মানোন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ গড়তে বিপুল বাজেটের অর্থ ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকে। তাই অভিযুক্ত কলেজগুলোকে বন্ধ করা ঠিক হবে না। তিনি জানান, মেডিক্যাল কলেজ থাকলেও, হাসপাতাল নেই-এমন কলেজের সংখ্যা খুবই কম। তবে এ ধরনের কলেজও দেশে রয়েছে। আর ভাড়াটে শিক্ষক দিয়েই চলে অনেক কলেজ। এসব অনিয়ম দূর করতে শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত। আর কিছু সংখ্যক কলেজের দুর্বলতার জন্য সকল বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজকে একই শ্রেণীর ভাবা ঠিক হবে না বলে মনে করেন অধ্যাপক আবদুর রউফ সরদার।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশীদ ই মাহবুব জানান, দক্ষ চিকিৎসক সৃষ্টি এবং মানসম্মত কলেজ গড়তে হলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন রয়েছে। আর তা আন্তরিকভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ নিম্নমানের বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজের বিরুদ্ধে এক সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও আরেক সরকার এসে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। কলেজগুলোর ওপর শক্তিশালী ও স্বচ্ছ মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলে দেশে দক্ষ চিকিৎসক ও মানসম্মত কলেজ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক রশীদ-ই মাহবুব।

প্রকাশিত : ২০ মে ২০১৭

২০/০৫/২০১৭ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: