২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

পদ্মা ধু ধু বালুচর ॥ কৃত্রিম প্রকল্পে ভারতের পানি প্রত্যাহারের প্রভাব


পদ্মা ধু ধু বালুচর ॥ কৃত্রিম প্রকল্পে ভারতের পানি প্রত্যাহারের প্রভাব

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী ॥ পদ্মার নৈস্বর্গিক রূপ নিয়ে কালে কালে অনেক কাব্য হয়েছে। কখনও স্রোতস্বিনী আবার কখনও রূপহারা পদ্মার গল্প সবার জানা। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে আর পারছে না এককালের প্রমত্তা পদ্মা। উজানের ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে জৌলুস হারিয়ে ক্রমেই অচেনা রূপ ধারণ করছে। এককালের প্রমত্তা পদ্মায় এখন শুধুই হাহাকার। পদ্মার পানে চেয়ে এখন দীর্ঘশ^াস ছাড়া কিছুই মেলে না। পদ্মার করুণ পরিণতি দেখে অনেকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘হায় পদ্মা...।’

তবুও পদ্মা বলে কথা। যুগে যুগে নানা রূপে তার নৈস্বর্গিকতা ফুটে উঠে। এই পদ্মার বুকেই কখনও চলে পাল তোলা নৌকা আবার পানি শুকিয়ে এই পদ্মা হয়ে যায় বালুকাময় মাঠ। নৌকা আটকে তখন চলে গরু মোষের গাড়ি।

রাজশাহী হয়ে বাংলাদেশে ঢোকা পদ্মা নদী এখন পুরোই পানিশূন্য। বালুর স্তরে স্তরে আটকে আছে মাঝিদের নৌকা। শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই কাঠ হয়ে গেছে। বিশাল বালুরাশির ওপর দিয়ে এখন চলছে গরু মোষের গাড়ি। কয়েক বছর আগেও এই সময়ে পদ্মায় পানি থাকত। এখন তা শুধুই স্মৃতি। দিনে দিনে জলরাশির অপার সৌন্দর্য হারিয়ে পদ্মা এখন শুধুই যেন মরুভূমি।

শুধু পদ্মার করুণ পরিণতিতে অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের খাল-বিল, নদী-নালা। একইসঙ্গে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। পদ্মা পানিশূন্য হওয়ার পাশাপাশি ভূগর্ভের পানির স্তরও নিচে নামছে। গভীর নলকূপেও ঠিকমতো মিলছে না পানি। দেখা দিয়েছে সেচ ও পানীয় জলের সঙ্কট। পদ্মা শুকিয়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে মৎস্য সম্পদ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে গোটা বরেন্দ্র অঞ্চল।

সোমবার ঠিক দুপুর বেলা রাজশাহীর অংশে পদ্মা নদীতে গিয়ে দেখা গেছে যেন রূপ পাল্টানো অন্য পদ্মা। কোথাও পানি নেই। যতদূর চোখ যায় শুধু বালুরাশি। বালুর মধ্যে আটকে পড়েছে মাঝিদের নৌকা। ওপারের চরের মানুষ দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে হেঁটে আসছেন এপারে। ওপারের মালামাল আসছে পদ্মার বুক চিরে গরু-মহিষের গাড়িতে করে।

ভাবতেই অবাক লাগে পদ্মার বর্তমান সময়ের করুণ নিসঙ্গতা। পদ্মার এই নিঃসঙ্গ রূপ দেখে হতাশ হবেন যে কেউ। ক্ষণিকের মন ভালর জন্য কেউ পদ্মার কাছে গেলেই অচেনা পদ্মা দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। অনেকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘একি সেই পদ্মা?’

শুকিয়ে কাঠ হওয়া পদ্মায় বেড়াতে আসা নাটোরের স্কুল শিক্ষক ইব্রাহিম হোসেন জানান, তিনি রাজশাহীতে এলেই একবার পদ্মায় ঢু মারেন। এবার অনেকদিন পর পদ্মায় আসা তার। তবে তার কাছে যেন এখন অচেনা পদ্মা। কয়েক বছর আগেও যে পদ্মার রূপ দেখা যেত এখন তার কিছুই নেই। বালুরাশি ছাড়া একটি নৌকাও চোখে পড়েনি তার। পদ্মার বুক জুড়ে এতটুকুও জল দেখতে না পেয়ে হতাশ তিনি।

পদ্মার এ চিত্র শুধু রাজশাহী অংশে নয়, নদীর পশ্চিমাংশে গোদাগাড়ী ও পূর্বে চারঘাট-বাঘা উপজেলার ৪০ কিমি ও আরও বেশি এলাকাজুড়ে একই অবস্থা। স্থানীয় লোকজন জানান, এখন আর বর্ষা মৌসুমেও পানি ঢেউ তোলে না। মাঝে মাঝে চর জেগেই থাকে। আর শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই পরিণত হয় অসংখ্য খালে আর ধু ধু বালুচরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি অনুযায়ী খরা মৌসুম হিসেবে জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশের ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, ওই চুক্তি অনুযায়ী মাত্র তিন বছর পানি মিলেছে। বাকি বছরগুলো ফারাক্কা পয়েন্টেই পানির সঙ্কট থাকায় ন্যায্য হিস্যার পানি পাওয়া যায়নি। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুখলেসুর রহমান দাবি করেন, ফারাক্কা পয়েন্টে পর্যাপ্ত পানি থাকলেই কেবল হিস্যা অনুযায়ী পানি পাওয়ার কথা।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব মতে, ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ গত পাঁচ বছরে ২০ ভাগের কম পানি পেয়েছে। গত ২১ থেকে ৩১ মার্চ ভারত বাংলাদেশকে ১৫ হাজার ৬০৬ কিউসেক পানি দিয়েছে, যা ছিল স্মরণকালের সর্বনি¤œ পানি। এছাড়া এ শুষ্ক মৌসুমের ৩১ মে পর্যন্ত উভয় দেশ ১০ দিনওয়ারি ভিত্তিতে গঙ্গার পানি ভাগাভাগি করে নেয়ার কথা। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে কখনও এ সিডিউল মানা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গার উৎস থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত বহু বাঁধ আর খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে চলেছে ভারত। শুধু ফারাক্কা বাঁধ নয়, কানপুরে গঙ্গা ব্যারাজ ও হরিদ্বারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারে নির্মিত কৃত্রিম খালসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে তারা। এখানেই শেষ নয়, ভারত ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের কানপুরে গঙ্গার ওপর আরও একটি বাঁধ নির্মাণ করছে। এছাড়া উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় চার শ’ পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসব পয়েন্ট থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। পরিণতিতে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে গেছে। ফলে বাংলাদেশের হাজারো চিৎকার আর আহাজারি সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার ‘নায্য হিস্যা’ পাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি রাজশাহী ইউনিটের সাবেক আহ্বায়ক এ্যাডভোকেট এনামুল হক জানান, বাংলাদেশের পদ্মার যে বিপুল আয়তন তাতে স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলে প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টির কথা উঠত না। কিন্তু ভারত নেপালের কোশি থেকে শুরু করে ফারাক্কা পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথে পানি প্রত্যাহারের যে একতরফা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ভারত তাতে বাংলাদেশের বিপর্যয় হয়ে উঠেছে। শুধু বাঁধ-ব্যারাজই নয়, গঙ্গার পানি সরিয়ে নিতে ভারত অনেক আগে থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার তিনটি খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

এসব খালের মোট দৈর্ঘ ১৩ হাজার ৬শ’ কিলোমিটার। এগুলো হচ্ছে ‘আপারগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট’ এবং ‘নি¤œগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট।’ এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেয়ার ব্যাপক কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা। ‘উপর গঙ্গা খাল প্রকল্পের’ মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যে ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল কেটে পদ্মার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানাল প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে মূল ও শাখাসহ খননকৃত খালের মোট দৈর্ঘ প্রায় ১৬শ’ কিলোমিটার। ‘নিম্নগঙ্গা সেচ প্রকল্পের’ জন্য ৬ হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এভাবে এসব উৎসের শতকরা ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে নিম্নভাগের গঙ্গায় মাত্র ১০ ভাগ পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারছে।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, চলতি বছরের শুকনো মৌসুমের শুরুতেই পদ্মাজুড়ে চরে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে পদ্মার শাখা-প্রশাখাসহ অন্তত ৩৬ নদী কার্যত মৃত খালে রূপ নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী পদ্মায় পানির হিস্যা দাবি করেন তিনি। পদ্মানদীর এ অবস্থার জন্য তিনি ফারাক্কা ব্যারাজকেই দায়ী করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পদ্মা বাংলাদেশের প্রধান নদী। এটি হিমালয়ে উৎপন্ন গঙ্গার প্রধান শাখা। বিভাগীয় শহর রাজশাহী এই পদ্মার উত্তর তীরে অবস্থিত। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন গঙ্গা নদীর প্রধান শাখা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সেখান থেকে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। পদ্মার দৈর্ঘ্য ৩৬৬ কিলোমিটার। পদ্মার প্রধান উপ-নদী মহানন্দা ও পুনর্ভবা। মহানন্দা উপ-নদীটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এবং পুনর্ভবা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। তবে শুধু পদ্মায় পানি না থাকায় বিভিন্ন শাখানদীও আগেভাগেই পানিশূন্য হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে শুষ্ক মৌসুম শুরুর আগেই পদ্মা পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে। পদ্মার এমন অবস্থার কারণে চর ও বরেন্দ্র এলাকায় বৈরী আবহাওয়া সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনিভাবে এর বিরূপ প্রভাব কৃষিতে পড়ায় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিপর্যয়ে সেচ ॥ এদিকে শুস্ক মৌসুম শুরুর আগেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় রাজশাহীর পদ্মানদী। এর প্রভাবে আগেই শুকিয়ে যায় বরেন্দ্র অঞ্চলের খাল-বিল, নদী-নালা। একই সঙ্গে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যায়। গভীর নলকূপেও ঠিকমতো মিলছে না পানি। ফলে দেখা দিয়েছে সেচ ও পানীয় জলের সঙ্কট। নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে মৎস্য সম্পদ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বরেন্দ্র অঞ্চল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর পদ্মাসহ শুকিয়ে যাওয়ায় পানিশূন্য এখন এ অঞ্চলের ১২ নদী। পদ্মা সংযুক্ত ১২ নদী মরা খালে পরিণত হওয়ায় এ অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে ও মাঝি বেকার হয়ে পড়েছে।

শুধু পদ্মায় পানিশূন্যতার কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মহানন্দা, আত্রাই, বারনই, শিব ও রানী (ফকিন্নী), ছোট যমুনাসহ ১২ নদ-নদীতেও পড়েছে প্রভাব। এসব নদী পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন মৃতপ্রায়। আশির দশক পর্যন্ত এসব নদীতে শুষ্ক মৌসুমেও পানি থাকত। সে পানি কৃষিজমির সেচ কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো। জেলেরা মাছ শিকার করতেন, চলত নৌকাও। তবে এখন সে দৃশ্য শুধুই স্মৃতি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. সারোয়ার জাহান জানান, উজানের নদীকেন্দ্রিক পরিকল্পনার কারণে পলি জমা হয়ে পদ্মা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আর এর প্রভাবে এ অঞ্চলের ১২ নদী এখন মৃতপ্রায়।

এদিকে রাজশাহী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, বরেন্দ্র অঞ্চলে বর্তমানে গড়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ১১০ ফুট নিচে অবস্থান করছে। ক্রমেই তা আরও নিচের দিকেই যাচ্ছে। ফলে এ অঞ্চলে হাজার হাজার গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। এ সবই হচ্ছে পদ্মা নদীর পানিশূন্যতার প্রভাবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: