১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কলিম শরাফীর পঞ্চম প্রয়াণ দিবস আজ


গৌতম পাণ্ডে ॥ মানব মুক্তির মিছিলে নির্ভীক অভিযাত্রী শিল্পী কলিম শরাফী। গানই ছিল তাঁর জীবন সাধনা। সূর্যস্নান চলচ্চিত্রে ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে’ অথবা ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভরাট কণ্ঠের সেই রেকর্ড আজও চিত্ত প্রসন্ন হয়। সঙ্গীতের শৈল্পিক সুরভী মানুষকে কতটা পরিচ্ছন্ন করে তা তিনি দেখিয়েছেন তাঁর শিল্পী সত্তা দিয়ে। গণসঙ্গীত দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও রবীন্দ্রনাথের গানই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের আরাধ্য সাধনার ধন। সঙ্গীতকে ঘিরে পথ চলতে চলতে কোন এক সময়ে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন তিনি। মানুষকে বড় ভালবেসেছিলেন, তাই হয়ত সঙ্গীত দিয়েই মানুষের চিত্তের শূন্যতাকে পূরণ করতে চয়েছিলেন আজীবন। মানুষের জীবনের ব্যথা-বেদনা, সুখ-দুঃখ, ক্ষোভ ও অধিকার আদায়ের উদ্দীপ্ত সেøাগানে সব সময় শামিল হতে চেয়েছেন এই নির্লোভ প্রতিবাদী মানুষটি। সে জন্যই হয়ত তিনি ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের মধ্য দিয়ে সেই গণজাগরণের গানই ধারণ করেছিলেন। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি হয়ে গণমানুষকে সচেতন করে তোলার ব্রত নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার যে কোন অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র সভাপতি হিসেবে নয়, তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল সব সময় প্রাণোচ্ছল। এমনকি হুইল চেয়ারে করে পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে যখন তিনি শেষবারের মতো উপস্থিত হলেন সংস্থা কর্তৃক তাঁর ৮৬ তম জন্মদিন পালনে, তখনও তাঁর উপস্থিতি ছিল সবার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও বাড়তি পাওনা।

সঙ্গীতাঙ্গনের এই দীপ্তিময় শিল্পীর পঞ্চম প্রয়াণবার্ষিকী আজ সোমবার। রাজধানীর বারিধারার নিজ বাসভবনে ৮৬ বছর বয়সে ২০১০ সালের এই দিনে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কলিম শরাফী ১৯২৪ সালে ৮ মে বীরভূম জেলার খৈরাডিহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম মাখদুমজাদা শাহ সৈয়দ কলিম আহমেদ শরাফী। পিতার নাম সামি আহমদ শরাফী। মাত্র চার বছর বয়সে মা আলিয়া বেগমকে হারান তিনি। পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় আরবী ওস্তাদজী আর বাংলা প-িত মশাইয়ের কাছে। একটি রক্ষণশীল পরিবার থেকে উঠে আসা এই মানুষটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতেন। ১৯৪৪ সালে তিনি আইপিটিএতে যোগ দিয়ে কলকাতার হাজারা পার্কে হাজার হাজার দর্শকের সামনে প্রথম গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। তারপর ১৯৪৬ সালে এইচএমভি থেকে বের হয় তাঁর প্রথম গণসঙ্গীতের রেকর্ড। এর সঙ্গে কলকাতা বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হয়ে যান তিনি। ১৯৪৭ সালে শুভ গুহঠাকুরতার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ‘দক্ষিণী’তে রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখা শুরু করেন। পরবর্তীতে সেখানে তিনি শিক্ষকতাও করেছেন। ছাত্র থাকাকালীন প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য শিক্ষকদের পাশাপাশি শিল্পী সুবিনয় রায়ের সান্নিধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতে তালিম নেন। ১৯৪৮ সালে তিনি মহর্ষী মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, মোঃ ইসমাইল প্রমুখের সঙ্গে মিলে ‘বহুরূপী নাট্য সংস্থা’ নামে একটি নাটকের সংগঠন গড়ে তোলেন। এ দলের হয়ে ‘নবান্ন’, ‘পথিক’, ‘ছেড়া তার’, ‘রক্ত করবী’সহ বহু নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকাতে তিনি বেতারে নবীন শিল্পী হিসেবে যোগ দেন। এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গণসঙ্গীত পরিবেশন করতেন। তাঁর গাওয়া ‘অবাক পৃথিবী’ গানটির জন্য তিনি তৎকালীন পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের কুনজরে পড়েন এবং ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে গিয়ে গড়ে তোলেন ‘প্রান্তিক’ নাট্যদল। ১৯৫৭ সালে পূর্ববাংলায় নির্মিত ‘আকাশ আর মাটি’ চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে তার প্রথম প্লেব্যাক শুরু। ১৯৫৮ সালে তাঁর গান রেডিওতে সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এ নিষেধাজ্ঞা আর তুলে নেয়া হয়নি। ১৯৬০ সালে তিনি এসএম মাসুদ প্রযোজিত ‘সোনার কাজল’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি উদীচীর উপদেষ্টা ছিলেন পরে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালে তিনি ‘সঙ্গীত ভবন’ নামে একটি সঙ্গীত শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৮৬ সালে সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ‘একুশে পদক’ এ সম্মানিত হন। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ অর্জন করেন। তিনি তাঁর সাফল্যের জন্য একুশে পদকসহ অনেক পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৯৮ সালে গণসাহায্য সংস্থা সম্মাননা, ২০০০ সালে মহান স্বাধীনতা পদক, ২০০২ সালে জনকণ্ঠ সম্মাননাসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন তিনি।

কলিম শরাফীর পঞ্চম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে শনিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা আয়োজিত স্মরণসভায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসান ইমাম বলেন, আমার ছোট মামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন কলিম শরাফী। সেই সূত্রে আমি তাঁকে মামা ডাকতাম। কলিম মামার মতো এত অমায়িক লোকের কেন এত শত্রু থাকে তা আমার বোধগম্য নয়। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় প্রথম টিভি সেন্টার চালু হলে তিনি সেখানে প্রেগ্রাম ডিরেক্টর পদে যোগ দেন। কিন্তু বিটিভিতে তাঁকে নিয়ে কোন প্রোগ্রাম হয় না। তিনি ১৯৬৯ সালে সত্যেন সেনের সঙ্গে উদীচীর কর্মকা-ে যোগ দেন। ১৯৭৭ থেকে অনেক বছর সভাপতি ও সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কিন্তু উদীচীর পক্ষ থেকে তাঁকে নিয়ে কোন প্রোগ্রাম হয়েছে কি না আমার জানা নেই। কোন এক সময়ে তাঁর গান রেডিওতে সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। একের পর এক বিভিন্নভাবে হয়রানির ফলে তাঁর সৃষ্টি থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী বলেন, কলিম শরাফী ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষের জন্য ভেবেছেন। তাঁর স্বপ্ন আজ পর্যন্ত আমরা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। তিনি নেই কিন্তু তাঁর আদর্শ পরবর্তী প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম লালন করা আমাদের কর্তব্য।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: