১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ঈদে ডায়াবেটিক রোগীর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস


মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় আচরণ হলো রমজান মাসে রোজা রাখা। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর প্রায় ২০ কোটি ডায়াবেটিক মুসলমান এ রমজানে রোজা রাখছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও মৌসুম ভেদে এ সময়কাল ১৩ ঘণ্টা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। আমাদের দেশে সেহ্রি ও ইফতারের মধ্যবর্তী সময় সর্বোচ্চ ১৮ ঘণ্টা হতে পারে। এ দীর্ঘ সময় একজন ডায়াবেটিক রোগীর না খেয়ে থাকা উচিত হবে কী না তা নিয়ে অনেক বছর ধরে বহু বিতর্ক হয়েছে। অবশেষে পৃথিবীর মুসলমান ও অমুসলমান ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞগণ সর্বসম্মতভাবে মতামত দিয়েছেন যে, ডায়াবেটিক রোগীর পক্ষে রোজা রাখা ক্ষতিকর হবে। কোরআন শরীফেও রোগাক্রান্তদের রোজা রাখা থেকে রেহাই দেয়া হয়েছে ( সুরা আল বাকারা : আয়াত ১৮৩- ১৮৫) আর অন্য যে কোন ধরনের অসুখের চেয়ে ডায়াবেটিস নিয়মিত ও পরিমিত খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ডায়াবেটিক রোগীর বিপর্যস্ত বিপাকীয় তন্ত্রের কারণে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শারীরিক নানাবিধ সমস্যা হতে পারে। তারপরও কিছু কিছু ডায়াবেটিক রোগী রমজান মাসে রোজা রাখতে জেদ করেন এবং কোন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডায়বেটিক রোগীকে রোজা রাখার পরামর্শ দেবেন না। কিন্তু কোন ডায়বেটিক রোগী যদি ধর্মীয় প্রচ- আগ্রহের কারণে রোজা রাখতে চান তবে তাকে নিষেধ করাও কারও পক্ষে সম্ভব না। এখানে আমরা ডায়াবেটিক রোগীর রোজা রাখার কারণে যেসব সমস্যা হতে পারে এবং তা থেকে যতটা সম্ভব সতর্ক থাকার পদ্ধতি আলোচনা করব।

রোজা রাখার সময় ডায়বেটিক রোগীর ঝুঁকিসমূহ

§ রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)

§ রক্তে গুøকোজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)

§ হাইপারগ্লাইসেমিয়াজনিত মারাত্মক অসুস্থতা (ডায়াবেটিক কিটোএ্যাসিডোসিস, এইসএইসএস)

§ পানি শূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)

§ থ্রম্বোসিস ও রক্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়া

রমজান মাস শুরু হওয়ার আগে থেকে যাদের ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রণ খুব ভাল ছিল তাদের পুরো রমজান মাস যেমন-তেমন কোন ঝামেলা ছাড়াই পার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যারা টাইপ ১ ডায়াবেটিসের রোগী, যাদের ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ আশানুরূপ নয় অথবা যাদের একই সঙ্গে কিডনি ও লিভার দীর্ঘস্থায়ী কোন রোগে আক্রান্ত এবং যাদের কোন ধরনের জীবাণু সংক্রমণ হয়েছে তাদের সবারই ডায়াবেটিসজনিত কোন না কোন জটিলতা দেখা দেয়ার কথা।

যেসব ডায়াবেটিক রোগী সব ঝুঁকির কথা জেনেও রোজা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তাদের রোজা শুরুর কমপক্ষে ১ মাস আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে হবে। এর মধ্যে আছে খালি পেটে ও খাবার ২ ঘণ্টা পর (মোট ৬ বার) রক্তের গ্লুকোজ, খালি পেটে রক্তের লিপিড, লিভার, কিডনি ও হৃৎপিন্ডের কার্যকারিতার পরীক্ষা, এবং এইচবিএ১সি ইত্যাদি পরীক্ষা করে নিতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হলো রক্তের গ্লুকোজ বেড়ে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসেমিয়া)। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। দুটি ক্ষেত্রেই রোগী হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূলমন্ত্র হলো সুশৃঙ্খল জীবনযাপন। সুশৃঙ্খলা বলতে খাওয়া-দাওয়া, শারীরিক শ্রম, অন্যান্য কর্মকা- চিত্তবিনোদন সবই বোঝায়। যারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হননি তারা তো বটেই, যারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মোটামুটি সক্ষম হয়েছেন তাদেরও রোজাকালীন সময়ে বিপাকীয় দুর্বিপাকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া অতি জরুরী।

রমজান শেষে আবার রমজান পূর্ববর্তী স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরতে গিয়ে কিছু সমস্যা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরামর্শ হলো-

১. রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ জেনে নিন প্রথমে (অভুক্ত অবস্থায়, সকালে নাস্তার ২ ঘণ্টা পরে, দুপুরে খাবার আগে ও ২ ঘণ্টা পরে ৬ বার)।

২. রক্তের ঐনঅ১ঈ পরীক্ষা

৩. কিডনি ও লিভারের পরীক্ষা

৪. প্রস্রাব পরীক্ষা

এ সব রিপোর্ট আপনার চিকিৎসকদের দেখাবেন। তবে সাধারণভাবে খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সংযমি ও বিবেচক হওয়া অতি জরুরী।

া প্রতি দিনের ক্যালোরি গ্রহণ সীমার মধ্যে রাখতে হবে।

া প্রচুর পরিমাণে তরল খাদ্য গ্রহণ করবেন।

া একমাস ধরে প্রধানত রাত্রিবেলা খাদ্য গ্রহণ ও দিনের বেলা না খেয়ে থাকার পর ঈদ-উল-ফিতরের দিন থেকে আবার স্বাভাবিক খাদ্য পদ্ধতি, দিনের বেলায় প্রধান আহারগুলো গ্রহণ করার মাধ্যমে কর্মপদ্ধতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য গ্রহণের যে শৃঙ্খলা আনতে হবে, সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট হিসেবি ও সাবধান হতে হবে। রমজান মাস শেষে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ খাদ্য গ্রহণের দিকে ধাবিত হওয়া উচিত হবে না। বরং প্রাক-রমজান সুসম খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

া ঈদের আনুষ্ঠানিকতায় গা ভাসিয়ে দিয়ে প্রচুর সেমাই, পায়েস, পোলাও, বিরিয়ানি খাওয়া উচিত হবে না।

া দৈনন্দিন কর্মকা-ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।

া কারও কারও পাতলা পায়খানা, বুক জ্বালা করা ও হজমে সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরী।

সকলকেই তার নিজের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। চিকিৎসগণ এক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করবেন। সকলকে ঈদের শুভেচ্ছা।

ডাঃ শাহজাদা সেলিম

সহকারী অধ্যাপক

এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ

মোবাইল : ০১৭৩১ ৯৫৬০৩৩