২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

রোহিঙ্গা ॥ বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু


তাদের নিজেদের দেশ নেই, রাষ্ট্র নেই, নাগরিকত্ব নেই। তাদের জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। সবার কাছে তারা অতি অবহেলিত ও উপেক্ষিত। তারা হলো রোহিঙ্গাÑ বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত লাঞ্ছিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। মূলত মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে এদের বাস। সেখানে ওদের সংখ্যা ১১ লাখ। আশপাশের অন্য দেশেও আছে। তবে মিয়ানমারসহ কোন দেশেরই নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেনি তারা।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গারা সংখ্যাগুরু। সেখানকার জনগোষ্ঠীর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তারাই। কিন্তু হলে কি হবে, সেখানকার কর্তৃপক্ষ ও তাদের সমর্থনপুষ্ট সংখ্যালঘুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় রোহিঙ্গারা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশ, থাইল্যান্ডে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আছে ৩ থেকে ৫ লাখ, সৌদি আরবে ৪ লাখ, পাকিস্তানে ২ লাখ, থাইল্যান্ডে ১ লাখ ও মালয়েশিয়ায় ৪০ হাজার। অর্থাৎ বিশ্বে রোহিঙ্গাদের মোট সংখ্যা হবে ১৮ থেকে ২০ লাখ।

এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী কাজের সন্ধানে ও উন্নত জীবনের আশায় বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টায় নৌকায় ওঠে। মানবপাচারকারী দলের পুরনো মরচে ধরা নৌকায় শত শত রোগা পটকা নারী-পুরুষ-শিশুর গাদাগাদি বসে থাকার দৃশ্য বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে। অথচ এভাবেই বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গারা দলে দলে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে অন্য দেশে গিয়ে ভিড়েছে। সমৃদ্ধি ও ইসলামী ঐতিহ্যের আকর্ষণে ১ লাখের মতো রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় আছে।

২০১২ সালে রাখাইন এলাকার স্থানীয় বৌদ্ধারা রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা চালালে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তারপর থেকে তাদের অবস্থা শোচনীয় আকার ধারণ করতে থাকে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ হয়ে উঠে যে, রোহিঙ্গারা প্রথমবারের মতো দলে দলে সমুদ্রপথে অন্যত্র পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়। অবশ্য মানবপাচারকারীচক্র স্রেফ মুনাফার লোভে ওদের এর আগে ছোটখাটো আকারের পাচার যে করেনি, তা নয়। হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে কক্সবাজারের আশপাশের এলাকায় পালিয়ে এসেছে। কি অবর্ণনীয়, অমানুষিক ও অমানবিক পরিস্থিতিতে তারা পালাতে বাধ্য হয়েছেÑ সে কাহিনীর শেষ নেই। একটি মানবাধিকার সংস্থার ভাষায় রোহিঙ্গারা গণ-নৃশংসতা ও গণহত্যার মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গারা মূলত আত্মগোপন করে বসবাস করা জনগোষ্ঠীর রূপ নিয়েছে। মালয়েশিয়া তাদের কোন আইনগত মর্যাদা দেয় না। আইনত তাদের কোন কাজ করতেও দেয়া হয় না। রাষ্ট্রের তরফ থেকে এদের কোন চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগ নেই। বেসরকারী খাতের কিছু নিয়োগকর্তা এর সুযোগ নিয়ে তাদের ইচ্ছামতো শোষণ করে। অল্প বেতনে কাজে লাগায়। মানবেতর পরিবেশে পাদাগাদি করে থাকতে দেয়। তাও তাদের কাছে পরিস্থিতিটা রাখাইন এলাকার চেয়ে ভাল। অন্তত এই ধারণা নিয়ে রাতে তারা ঘুমাতে যেতে পারে যে, পরদিন তারা জেগে উঠবে।

রোহিঙ্গারা দাবি করে, তারা মিয়ানমারের দেশজ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। কিন্তু মিয়ানমার তাদের সেভাবে মেনে নিতে রাজি হয়নি। তাই ২০১২ সালে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে রাখাইনে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে শরণার্থী শিবিরে রাখা হয়। তাদের অর্ধেক অশেষ দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, আশঙ্কা ও বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে আশপাশের দেশে চলে যায়। আইএসসিআই নামে একটি সংস্থার গবেষকদের ভাষায়, ২০১২ সালে মিয়ানমারের সেই শুদ্ধি অভিযান ছিল রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার প্রক্রিয়ার একটি পর্যায়। ইতিহাসগতভাবে অন্য দেশে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ধিক্কার সূচক হিসেবে ছাপ মারা, তারপর তাদের নানাভাবে হয়রানি করা, আলাদা করে রাখা এবং সুপরিকল্পিতভাবে নাগরিক অধিকার হরণ করে নেয়ার মধ্য দিয়ে। এই প্রস্তুতিমূলক অধ্যায়গুলোর মধ্য দিয়েই গণহত্যার পর্ব সূচিত হয়। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে প্রথম চারটি পর্যায়ের সবকটিই ঘটেছে, তবে পঞ্চম পর্যায় অর্থাৎ গণহত্যা এখনও ঘটেনি। রাখাইন প্রদেশে গণহত্যার হয়ত অবশ্যম্ভাবী নয়, তথাপি এমনটা ঘটা সম্ভব।

চলমান ডেস্ক

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট