২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কৃষক বিদ্রোহের নীরব সাক্ষী ॥ চৌগাছার নীলকুঠি


বিষ্ণুচরণ ও দিগম্বর বিশ্বাস। নীল বিদ্রোহের নায়ক। বাড়ি চৌগাছা। দু’জনই এক সময় নীল কুঠিতে চাকরি করতেন। কিন্তু নীলকরদের অত্যাচার দেখে তারা চাকরি ছেড়ে দেন। যোগ দেন নীল বিদ্রোহে। তাদের স্মৃতি বিজড়িত চৌগাছার নীল কুঠি এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

চৌগাছা নীল বিদ্রোহের সূতিকাগার। নীলকর ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম চৌগাছা থেকে নীল বিদ্রোহের দাবানল সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। আর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে চৌগাছার কপোতাক্ষ নদের পাশে অবস্থিত সেই নীলকুঠি আজও দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে।

ঊনবিংশ শতাব্দীতেই বৃহত্তর যশোরে প্রথম নীল চাষ শুরু হয়। ১৮৬০ সাল থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত নীলচাষ এ অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে। কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জমিতে নীল চাষ করতেন। কিন্তু ইংরেজ কুঠিয়ালদের কাছে সমুদয় নীল পানির দরে বিক্রি করতে হতো। এতে কৃষকরা ঋণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অমানবিক জীবনযাপন করত। আর এ নিয়ে সৃষ্ট ধুমায়িত ক্ষোভ এক সময় বিদ্রোহের আগুনে রূপ নেয়। ইংরেজদের অত্যাচারের খড়গ থেকে বাঁচার জন্য নীল চাষীরা শুরু করেন আন্দোলন। ঢেলে দেয় বুকের রক্ত। মূলত ১৮৫৮ সালে চৌগাছা থেকেই বিদ্রোহের সূত্রপাত। প্রথমে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন চৌগাছার অকুতোভয় চাষী এক সময় নীল কঠির চাকরিজীবী দিগম্বর বিশ্বাস ও তার সহোদর পিতাম্বর বিশ্বাস ওরফে বিষ্ণুচরণ।

যশোর জেলায় সর্বপ্রথম নীল কারখানা স্থাপন করে মিঃ বন্ড। ইংরেজদের যেসব নীলকুঠি ছিল তার মধ্যে চৌগাছা, কাঠগড়া, খলিপুর, গুয়াতলী কাদবিলা, ইলেশমারি অন্যতম। এর মধ্যে চৌগাছা নীলকুঠি ইতিহাসখ্যাত। কারণ নীল বিদ্রোহ এখান থেকেই জ্বলে ওঠে। অন্যায় আইন চাপিয়ে দেয়ার কারণে নীল চাষ কৃষকদের পক্ষে লাভজনক ছিল না। প্রতি বিঘায় একজন চাষীর নীল চাষ করতে খাজনা বাবদ ১০ আনা, বীজ বাবদ চার আনা, চাষ করতে এক টাকা, বুনতে চার আনা, নীলগাছ কাটাসহ অন্যান্য বাবদ মোট দুই টাকা ১৪/১৫ আনা খরচ হতো। এছাড়া কুঠিয়ালদের নিকট হতে অগ্রিম স্ট্যাম্প বাবদ দুই আনা কেটে নেয়া হতো। নীল চাষীদের নীল উৎপাদন করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হতো।

নীলকরদের অত্যাচারে এ অঞ্চলের কৃষককুল দিশেহারা হয়ে পড়ে। এ কারণে চৌগাছার জমিদার হেমপ্রসাদ চিঠি লিখেছিলেন বাংলার কৃষক ক্রীতদাস নহে। ঝিকরগাছা থানার অমৃতবাজারের শিশির কুমার ঘোষ, চৌগাছার দিগম্বর, পিতাম্বর বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গার মথুরানাথ আচার্য, চ-িপুরের শ্রী হরি রায় একসঙ্গে বিদ্রোহ শুরু করেন। দিগম্বর বিশ্বাস কুঠিয়ালদের দেওয়ান ছিলেন। সে সময় চাষীদের প্রাণে বাঁচার জন্য তিনি ১৫ হাজার টাকা তালুক থেকে দান করে দেন। ইলেশমারী কুঠির পার্শ্ববর্তী গুয়াতলিতে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। কৃষককুল জোটবদ্ধ হয়ে বাগদা থানা আক্রমণ করে। সেখান থেকে ছয়টি একনলা বন্দুক ছিনিয়ে আনে। চৌগাছায় বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটার পর একে একে তা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। ঝিকরগাছার বেনেয়ালীতে সশস্ত্র আক্রমণ হয় কুঠিতে। সে সময় কলকাতার পেট্রিয়ট পত্রিকায় কৃষকদের বিদ্রোহ ও নীলকরদের অত্যাচারের কথা ছাপা হলে সরকার ওই পত্রিকা বাজেয়াফত ঘোষণা করে। এরপর আনন্দবাজার পত্রিকায় এসব কথা ছাপা হলে পত্রিকার সম্পাদকের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। অনুরূপভাবে চৌগাছার দিগম্বর ও পিতাম্বর ওরফে বিষ্ণুচরণের বিরুদ্ধেও হুলিয়া দেয়া হয়। এই দুই সহোদর ইংরেজদের অপমান সহ্য করতে না পেরে দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ১৮৬৮ সালে কুঠিয়ালরা বিদ্রোহের কারণে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদী বিদ্রোহের ফলে ১৯০৫ সালে ভারতবর্ষ হতে নীল চাষ উঠে যায়। জানা যায়, দিগম্বর ও পিতাম্বরের বাড়ি ছিল চৌগাছার কংশারীপুর গ্রামে। বিদ্রোহের সময় এই দুই সহোদর কোথায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে উপজেলার গরীবপুর গ্রামের পাশে তাদের সমাধি করা হয়, এমন কথা প্রচার আছে। যে কারণে ওই স্থানের নাম হয় পিতম্বরপুর গ্রাম। ভারতবর্ষের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে চৌগাছার নীল বিদ্রোহের কথা। বর্তমানে চৌগাছার কুঠিপাড়ায় অবস্থিত সেই নীলকুঠি অত্যাচারীদের রক্তাক্ত ইতিহাস বুকে ধারণ করে কালের সাক্ষী হয়ে আজও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।

-সাজেদ রহমান, যশোর থেকে