১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

মধুমতি তীরের সেই ছেলেটি


বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রাম। নাম টুঙ্গিপাড়া। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম। গ্রামের পাশে বয়ে চলেছে মধুমতি নদী। এই নদী গোপালগঞ্জ ও বাগেরহাট জেলাকে ভাগ করে রেখেছে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ এই গ্রামেই জন্মেছিলেন বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পুরো জীবন তাঁর কেটেছে বাংলার মানুষের স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে এবং স্বাধীন স্বদেশ গড়ে তোলায়। গ্রামে তখন একটি মাত্র ইংরেজী স্কুল ছিল, যা পরে হাইস্কুল হয়, সেই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে চতুর্থ শ্রেণীতে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩৪ সালে যখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র, তখন ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে সময়ের স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘ছোট সময়ে আমি খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম। খেলাধুলা করতাম, গান গাইতাম এবং খুব ভাল ব্রতচারী করতে পারতাম। হঠাৎ বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে আমার হার্ট খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। আব্বা আমাকে নিয়ে কলকাতায় চিকিৎসা করাতে যান। কলকাতার বড় বড় ডাক্তার শিবপদ ভট্টচার্য, একে রায় চৌধুরী আরও অনেককেই দেখান এবং চিকিৎসা করাতে থাকেন। প্রায় দুই বছর আমার এভাবে চলে।’

এরপর ১৯৩৬ সালে শেখ মুজিবের চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়ে। আবার কলকাতায়। সেখানে থাকতেন বোনের বাড়িতে। ডাক্তার চোখে অপারেশনের পরামর্শ দিলেন। ভর্তি হলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পরদিন সকালে অপারেশন। শুনে ভয়ে পালাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। অপারেশন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। দশ দিনের মধ্যে দু’চোখের অপারেশন করা হলো। তিনি ভাল হলেন। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিলেন, কিছুদিন লেখাপড়া বন্ধ রাখতে হবে, চশমা পরতে হবে। সেই ১৯৩৬ সাল থেকেই তিনি চশমা পরা শুরু করেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তা ছিল। রক্তাক্ত সিঁড়িতে তাঁর মরদেহের পাশেই পড়েছিল চশমাটি।

কলকাতা হতে ফিরে এলেন গ্রামে। লেখাপড়া নেই, খেলাধুলা নেই তখন। শুধু একটা মাত্র কাজ, জনসভায় যাওয়া। তখন ছিল শাসক ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। এতে এলাকার সব কিশোর যুবারা যোগ দেয়। এসব সভায় তিনিও যোগ দিতেন দেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়নের জন্য। ১৯৩৭ সালে আবার ভর্তি হলেন স্কুলে। এবার গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল। গরিব ছেলেদের সাহায্যার্থে তিনি প্রতি রবিবার থলে নিয়ে আরও ছাত্রসহ বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল সংগ্রহ করতেন। তা বিক্রি করে বইখাতা ও পরীক্ষার ফিয়ের ব্যবস্থা করতেন গরিব ছাত্রদের জন্য। এই স্কুলে ইংরেজী শিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া হতো। শেখ মুজিব ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতেন। খুব ভাল খেলোয়াড় না হলেও স্কুল টিমে অবস্থান ছিল ভাল। চার বছর লেখাপড়া করতে না পারায় ক্লাসের ছেলেদের চেয়ে একটু বড়ই ছিলেন। ভীষণ একগুঁয়ে শেখ মুজিবের একটা দল ছিল। কেউ কিছু বললে আর রক্ষা ছিল না। মারপিট করতেন দলবেঁধে। এতে বাবা মাঝে মধ্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেন। ছোট শহর, সবাই সবাইকে চেনে। নালিশ যেত বাবার কাছে। শেখ মুজিব বাবাকে ভীষণ ভয় করতেন।

১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা ও মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সফর করেন। তাঁদের ভাষণ শুনে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতা শেখ মুজিবের জীবনের ধারা বদলে গেল। দেশ এবং দেশের দরিদ্র মানুষ তাঁকে আলোড়িত করে। পরাধীন দেশ তাঁর ভাল লাগত না। স্বপ্ন দেখতেন ইংরেজদের বিতাড়ন করে স্বাধীন দেশ গড়ে তোলার। সেই স্বপ্নের পথ ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। তারপর কত জেল, জুলুম, কত আন্দোলন সংগ্রাম এবং সবশেষে যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালীকে স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের জন্য বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্র এনে দিলেন।

বিশ্ব মানচিত্রে ১৯৭১ সালে ঠাঁই পেল একটি নতুন দেশ। নাম তার বাংলাদেশ। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের ডাকে দেশের মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। হানাদার হটাতে কিশোররাও সেদিন যুদ্ধ করেছে অস্ত্র হাতে।

মহান নেতার জন্মদিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই মহান নেতাকে ঘাতক দল সপরিবারে হত্যা করলেও তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। তিনি জেগে আছেন বাংলার মাঠ ঘাট প্রান্তরে, বাঙালীর মনে। আজকের প্রজন্ম গৌরববোধ করে এই মহান নেতার জন্য।