২৪ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ॥ দেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা স্থায়ীভাবে ডুবে যেতে পার


কাওসার রহমান, লিমা (পেরু) থেকে ॥ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার জন্য উন্নত দেশগুলোর কাছে নিশ্চয়তাযুক্ত অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা চেয়েছেন পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

বুধবার বিকেলে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের হাইলেভেল সেগমেন্টে বক্তৃতা করতে গিয়ে পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বেশির ভাগ মানুষই চরম বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। তাই আগামী বছর প্যারিসে একটি অর্থবহ চুক্তি না হলে এই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

লিমা জলবায়ু সম্মেলনকে সফল করতে তিনি রাজনৈতিক গতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এতে কমপক্ষে চার কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।

এ সময় মন্ত্রী সীমিত সম্পদ নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন।

ব্রাজিলের পরিবেশ মন্ত্রীর পর পরই পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বুধবার বিকালে স্থানীয় সময় ৪টা ১০ মিনিটে বক্তৃতা করেন। বক্তৃতা শেষ করতে প্রায় সাত মিনিট সময় নেন। এর আগে সকালে মন্ত্রী বাংলাদেশের পক্ষে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন।

চলমান জলবায়ু সম্মেলনের সফলতা প্রত্যাশা করে মন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করছি জটিল ইস্যুর সমাধা করে লিমা জলবায়ু সম্মেলন আবশ্যই ফল নিয়ে হবে। আমি শুনেছি যে, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কর্মকর্তা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, লিমা জলবায়ু সম্মেলন সফল করতে।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, এখন পর্যন্ত জলবায়ু সম্মেলন ইতিবাচকভাবেই এগোচ্ছে। বিশেষ করে গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড, এডাপটেশন ফান্ড ও এলডিসি ফান্ড, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, প্রযুক্তি সহযোগিতা, ক্ষয় ও ক্ষতি (লস এ্যান্ড ড্যামেজ) প্রভৃতি বিষয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক সুপারিশ এসেছে সম্মেলনে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও ২০২০ পূর্ব জলবায়ু কর্মসূচীর ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের মহাবিপর্যয় মোকাবেলায় ২০১৫ সালে প্যারিসে সকল দেশকে নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের যে লক্ষ্য ডারবানে ঠিক করা হয়েছে তার ভিত রচিত হবে লিমাতে।

মন্ত্রী সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক ঘোষণা, কার্বন নির্গমন হ্রাসে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগ এবং গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডে উন্নত দেশগুলোর অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি আমাদের খুব বেশি আশাবাদী করে তুলেছে। প্যারিস যাওয়ার আগে আমাদের এই রাজনৈতিক গতি ধরে রাখতে হবে।

বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ক্ষতির কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সমুদ্র্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ক্রমাগত ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা স্থায়ীভাবে ডুবে যেতে পারে। এতে প্রায় চার কোটি উপকূলীয় মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে। এই বাস্তুচ্যুতির আগেই আমরা পদক্ষেপ চাই।

তিনি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে আমরা বসে নেই। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, স্থানীয় ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়ের অভিযোজনের চাহিদা পূরণ করতে। সেই সঙ্গে উল্লেখ করার মতো প্রশমন কার্যক্রমও সম্পন্ন করছি। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকা- চালানো হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে সবচেয়ে কম কার্বন নির্গমনের মাধ্যমে।

তিনি জানান, বাংলাদেশের জাতীয় এজেন্ডার মূল ফোকাস হচ্ছে অভিযোজন কার্যক্রম। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, এই অভিযোজন কার্যক্রমের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ নিশ্চয়তাযুক্ত অতিরিক্ত সম্পদ। কারণ গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আমরা এক হাজার কোটি ডলারেও বেশি অর্থ খরচ করেছি। ফলে নিশ্চয়তাযুক্ত অতিরিক্ত অর্থ না পেলে বাংলাদেশের অভিযোজন ও প্রশমন উভয় কার্যক্রমই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বন ও পরিবেশমন্ত্রী অর্থায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে বাংলদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার জন্য উন্নত দেশগুলোর নেতৃত্বমূলক সহায়তা আশা করেন।

সংবাদ সম্মেলন ॥ সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও হিমালয়ের বরফ গলনের কারণে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা স্থায়ীভাবে তলিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পর্যাপ্ত সহায়তার হাত না বাড়ালে বাংলাদেশের অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মনে করে, প্যারিসে একটি নতুন জলবায়ু চুক্তির পথে লিমায় সকল পক্ষ একটি সমঝোতায় উপনীত হবে। বর্তমানে জলবায়ু আলোচনায় যে গতি এসেছে তা ধরে রাখতে পারলেই এটা সম্ভব। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে সাবেক পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদসহ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে এক প্রশ্নের জবাবে ড. হাছান মাহমুদ বলেন, উন্নত দেশগুলো মানুষ মারার জন্য যেভাবে সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে চলেছে, মানুষকে বাঁচানোর জন্য সেভাবে ব্যয় বাড়াচ্ছে না। ৪০ উন্নত দেশ ২০১০ সালের চেয়ে ২০১১ সালে মাত্র এক বছরে সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়েছে। এটা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য হতাশাজনক।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: