ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

সেঞ্চুরিয়ান ট্রাভিস হেডকে কিংবদন্তির স্বীকৃতি অস্ট্রেলিয়ার নতুন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের, আর  ফাইনালে ভারত বধের নায়ক হেড বললেন, ‘হাজার কোটি বছরেও এতটা ভাবেননি’

কামিন্সের অমরত্ব আর হেডের ইতিহাস

শাকিল আহমেদ মিরাজ

প্রকাশিত: ২২:৪১, ২০ নভেম্বর ২০২৩

কামিন্সের অমরত্ব আর হেডের ইতিহাস

গর্বিত অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের নায়ক সেঞ্চুরিয়ান ট্রাভিস হেড ও মার্নাস লাবুশেন

প্যাট কামিন্সের অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হওয়াটাই একটা ইতিহাস। বল টেম্পারিংয়ের দায়ে পাওয়া নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফিরলেও নেতৃত্ব দিতে পারবেন না স্টিভেন স্মিথ এবং ডেভিড ওয়ার্নার। সেক্স-চ্যাট কা-ে টেস্ট অধিনায়ক টিম পেইনেরও ক্যারিয়ার শেষ। রঙিন পোশাকে দায়িত্ব পড়ে অ্যারন ফিঞ্চের ওপর। ২০২১ টি২০ বিশ্বকাপ জোতানো ফিঞ্চ হঠাৎই ওয়ানডে থেকে অবসর নিলে বিপাকে পড়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)। টেস্ট ক্যাপ্টেন কামিন্সকে ওয়ানডের দায়িত্ব দেওয়া হয় ২০২৩ বিশ্বকাপ সামনে রেখে। কামিন্সই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম অধিনায়ক, একজন পেসার হয়েও যিনি এ দায়িত্ব পান।

দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ফুটে ওঠে আইপিএলকে ‘না’ বলায়। প্রথম পরিকল্পনাতেই সফল। গত জুনে ওভালে ভারতকে হারিয়ে জেতেন আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় আসরের ট্রফি। দুরন্ত ব্যাটিংয়ে সেদিন ম্যাচসেরা হয়েছিলেন এই ট্রাভিস হেড, যিনি আহমেদাবাদে বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারত-বধের নায়ক। বয়স তিরিশ হওয়ার আগেই তাই হেডকে কিংবদন্তির স্বীকৃতি অধিনায়ক কামিন্সের।
পেসাররা সাধারণত চোটপ্রবণ হন। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) তাই এর আগে কখনোই কোনো পেসারকে স্থায়ী অধিনায়ক করেনি। কামিন্সও কিন্তু স্থায়ী পরিকল্পনায় ছিলেন না। অনেকটা বাধ্য হয়েই বিশ্বকাপ সামনে রেখে তাকে ওয়ানডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১৫- আগের ১২ আসরে পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতে রেকর্ডটা আগেই ছিল অস্ট্রেলিয়ার দখলে। অদম্য অজিরা এবার হেক্সা পূর্ণ করল। অ্যালান বোর্ডার, স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিং (দুইবার), মাইকেল ক্লার্কের পাশে বসলেন প্যাট কামিন্স। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পর বিশ্বকাপের ট্রফি, প্রথম পেসার-অধিনায়ক হিসেবে অমরত্বও পেলেন নিশ্চই। ‘এ বছর আমাদের যত সাফল্য সবার ওপরে থাকবে এই সাফল্য। 
একেবারে চূড়ায়। বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে আর কিছুর তুলনা চলে না। তাও আবার ভারতের মাটিতে লাখো দর্শকের সামনে ভারতকে হারিয়ে। ফাইনালে ছেলেরা অসাধারণ পারফর্ম করেছে। হেডের কথা আলাদা করে বলতে হয়। এই বয়সেই সে বড় টুর্নামেন্টের বড় ম্যাচে জয়ের নায়ক হয়ে উঠেছে। সেটা নিয়মিত। আমি এখনই ওকে কিংবদন্তিদের কাতারে রাখব।’ বলেন কামিন্স। লিগ পর্ব হয়ে সেমিফাইনালÑ টানা দশ ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠে রোহিত শর্মার ভারত ছিল পরিষ্কার ফেভারিট। আহমেদাবাদে বিশ্বের সর্বোচ্চ দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন (১ লাখ ৩০ হাজার) নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম রূপ নিয়েছিল নীল সমুদ্রে। 
উন্মাদনার ফাইনালে টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে রোহিত, বিরাট কোহলি, লোকেশ রাহুলদের নিয়ে গড়া ভারতীয় লাইনাপকে অস্ট্রেলিয়া গুঁড়িয়ে দিল মাত্র ২৪০ রানে। এরপর ৪৩ ওভারেই ৬ উইকেট হাতে রেখে সেটি টপকে গেল অজিরা। ৪৭ রানে ৩ উইকেট হারানোর পর তাদের এ জয়ের নায়ক ট্রাভিস হেড। ১২০ বলে ১৫ চার ও ৪ ছক্কায় খেললেন ১৩৭ রানের অবিস্মরণীয় এক ইনিংস। অথচ অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল জোড়া হারে। ভারতের কাছে ৬ উইকেটে, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১৩৪ রানে।

এরপরই ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা সাত জয়ে উঠে আসে সেমিফাইনালে, অতঃপর চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপ জয়ের পর কামিন্সকে জিজ্ঞেস করা হয়, প্রথম দুই ম্যাচে হারার পর দলকে কী বার্তা দিয়েছিলেন? অস্ট্রেলিয়ার নতুন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক জবাবে যা বলেন, তা চিরায়ত অস্ট্রেলীয় চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ, ‘বলেছিলাম আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে এবং বিশ্বকাপ জিততে হবে। আর সেটার জন্য অপেক্ষা করার সময় নাই। আমাদের সাহসী হতে হবে, এখান থেকেই সেটা শুরু করতে হবে।’ তাই বলে ফাইনালে ভারতের মতো দলের বিপক্ষে টস জিতে ফিল্ডিং নিয়ে এমন জয়! কীভাবে সম্ভব হলো?, ‘আমার মনে হয়, সেরাটা শেষের জন্যই জমা রেখেছিলাম। বড় ম্যাচগুলোতে কয়েকজনই ভালো অবদান রাখল, যেটা আমাদের এগিয়ে দিল।’
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপজয়ে ব্যাট হাতে বড় অবদান ওয়ার্নারের, ২ সেঞ্চুরি ও ২ হাফসেঞ্চুরিতে করেছেন ৫৩৫ রান। ২ সেঞ্চুরিতে মিচেল মার্শের রান ৪৪১। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৩ উইকেট লেগস্পিনার অ্যাডাম জাম্পার। তবে হেডের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। বাঁহাতের চোট সত্ত্বেও তাকে স্কোয়াডে রেখেছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম পাঁচ ম্যাচে খেলতে পারেননি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফিরেই ১০৯ রানের ইনিংসে ম্যাচসেরা, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৬২ রানের সঙ্গে ২ উইকেট নিয়ে আবারও ম্যাচসেরা, ফাইনালে তো ইতিহাস।

ওয়ানডে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সপ্তম ক্রিকেটার ও মাত্র তৃতীয় অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে ফাইনালে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বসেছেন রিকি পন্টি, অ্যাডাম ক্রিলক্রিস্টের পাশে। ফাইনালে ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে নিয়ে নিজের এই কীর্তির দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্যই মনে হয়েছে হেডের। উচ্ছ্বাসের তোড়ে বলছিলেন, ‘আমি কখনোই এমন কিছু আশা করিনি। লাখো-কোটি বছরেও নয়। এটি আমার জীবনের অন্য রকম একটি দিন।’ কতটা অন্য রকম, সেটিই ফুটে উঠেছে তার অধিনায়ক কামিন্সের কথায়। 
যেখানে আছে একজন খেলোয়াড়ের আজীবনের স্বীকৃতি, ‘হাত ভেঙে যাওয়ার পরও নির্বাচক এবং চিকিৎসক দল ওর ওপর আস্থা রেখেছিল। ঝুঁকিটা অনেক বড় ছিল। তবে এর প্রতিদান আমরা পেয়েছি। ট্রাভিসের জন্য এরচেয়ে বেশি খুশির কিছু হতে পারে না। আবারও বলছি, সে একজন কিংবদন্তি। আমরা তাকে ভালোবাসি।’

×