ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

ফেডারেশন কাপ ফুটবল

টাইব্রেকারে আবাহনীকে হারিয়ে শিরোপা মোহামেডানের

রুমেল খান

প্রকাশিত: ২৩:০৪, ৩০ মে ২০২৩

টাইব্রেকারে আবাহনীকে হারিয়ে শিরোপা মোহামেডানের

ফেডারেশন কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন মোহামেডানের খেলোয়াড়রা

একসময়ের প্রতাপশালী ফুটবল দল ছিল তারা। ৮৭ বছরের ক্লাব-ইতিহাসে চ্যাম্পিয়ন ট্রফির সংখ্যা ৪৬টি। অথচ প্রিমিয়ার লিগ তারা সর্বশেষ জিতেছে ২১ বছর আগে। আর যে কোনো পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় শিরোপা জিতেছে ৯ বছর আগে। একদা সফল অথচ ক্ষয়িষ্ণু সেই ফুটবল-শক্তির নাম মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। তাদের জার্সির রং সাদাকালো। প্রায় এক দশক ধরে জার্সির মতোই তাদের সাদামাটা পারফর্ম্যান্স ক্লাবের খেলার মান একেবারে নি¤œমুখী করে ফেলেছিল। তবে বছর তিনেক ধরেই নতুন করে আবার জেগে ওঠার চেষ্টা করছিল মতিঝিল পাড়ার ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ খ্যাত মোহামেডান। তারই ঝলক দেখা গেল মঙ্গলবার, কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে। ৪৩ বছরের মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল টুর্নামেন্ট ফেডারেশন কাপের ৩৩তম আসরের শিরোপাটা নিজেদের করে নিয়েছে মোহামেডান। ফাইনালে হারিয়েছে তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ঢাকা আবাহনী লিমিটেডকে, টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট শেষে ম্যাচের স্কোরলাইন ছিল ৪-৪।   
এই আসরের শিরোপা জিততে দীর্ঘ ১৪ বছর লেগে গেল মোহামেডানের। অথচ ঘরোয়া ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আসর ফেডারেশন কাপের অন্যতম সফল দলের নাম মোহামেডান। ১৪ বছর পর ১৫তম বারের মতো ফাইনালে উঠে একাদশতম বারের মতো শিরোপা জেতে মোহামেডান। মজার ব্যাপার, ২০০৯ সালে খেলা সর্বশেষ ফেডারেশন কাপের ফাইনালেও এই আবাহনীকেই টাইব্রেকারে হারিয়েছিল মোহামেডান! ২০১৪ সালে স্বাধীনতা কাপে চ্যাম্পিয়ন হবার দীর্ঘ ৯ বছর পর আবারও নিজেদের শোকেসে আরেকটি ট্রফি সাজিয়ে রাখার গৌরব অর্জন করেছে আলফাজ আহমেদের শিষ্যরা।
মোহামেডানের এই জয়ের রূপকার তাদের অধিনায়ক-ফরোয়ার্ড সুলেমান দিয়াবাতে। ম্যাচে হ্যাটট্রিকসহ ৪ গোল করার পাশাপাশি টাইব্রেকারেও লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। ফেডারেশন কাপের ফাইনালের ইতিহাসে তিনিই প্রথম হ্যাটট্রিক করার বিরল কৃতিত্বের অধিকারী। ম্যান অব দ্য ফাইনাল, প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট এবং টপ গোল স্কোরার (৮ গোল) ... তিনটি পুরস্কারই লাভ করেন আফ্রিকার দেশ মালির এই কুশলী ফুটবলার। এছাড়া বদলি গোলরক্ষক আহসান হাবিব বিপুর কথাও বলতে হবে। টাইব্রেকারে তিনি আবাহনীর দুটি শট আটকে ‘হিরো’ বনে যান। 
এবারই প্রথম ঢাকার বাইরে অনুষ্ঠিত হলো আবাহনী-মোহামেডানের কোনো ফাইনাল ম্যাচ। ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত উপভোগ্য। দুদলই খেলে আক্রমণ করে। গ্যালারিতে ছিল উপচেপড়া দর্শক। মোহামেডানের এই সাফল্যে দেশের ফুটবলের জন্যই মঙ্গলজনক বলে মনে করছেন ফুটবলবোদ্ধারা। এতে করে ঘরোয়া ফুটবলে আবারও জোয়ার আসবে বলে মনে করেন তারা।
মোহামেডানের এই সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন দেশের অন্যতম সফল ক্লাব বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান। নিজের ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘ফেডারেশন কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সকল খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা এবং সমর্থকদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।’ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীকে হারিয়ে দীর্ঘ নয় বছরের শিরোপা খরা কাটিয়েছে মোহামেডান। এই জয়ের কৃতিত্ব দলের খেলোয়াড়দের দিয়েছেন মোহামেডান কোচ আলফাজ আহমেদ, ‘বিশাল একটা ফুটবল ম্যাচ। ব্যাকফুটে থেকে আবারও সমান সমান। এরপর লিড নিয়ে আবারও সমতা। এরপর টাইব্রেকারে জেতা। আসলে বোঝা যাচ্ছিল না কে জিতবে!

সুলেমান দিয়াবাতের অসাধারণ পারফর্ম্যান্স; মুজাফফরভের হাত ভেঙে গেছে, তারপরও সে দলের জন্য খেলেছে। এই প্রশংসার দাবিদার সম্পূর্ণ খেলোয়াড়রা। তারা তাদের সর্বস্ব উজাড় করে খেলেছে মোহামেডানের জন্য এবং জিতেছে।’ আলফাজ আরও বলেন, ‘অনেক আগে একটা ফাইনাল ছিল, যেটা আমি নিজে খেলেছিলাম। তবে আমি আজকের ম্যাচটাকেই এগিয়ে রাখব। আজকের খেলায় বাংলাদেশ ফুটবলে আবাহনী-মোহামেডানের যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তার জয় হলো। এই জয় শুধু মোহামেডানেরই নয়, ফুটবলেরই জয়। আমার জীবনের একটা স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। ফেডারেশন কাপে খেলে এর আগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, এবার কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’

খেলোয়াড়দের ম্যাচের আগে যে বার্তা দিয়েছিলেন আলফাজ, সেটাও জানান তিনি, ‘আমার বার্তা ছিল- তোমরা ম্যাচ ঠা-া মাথায় খেল। আমি তিনটি পরিবর্তন করিয়েছিলাম, সেটা কাজে লেগেছে। খেলোয়াড়রা সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে।’ বদলি গোলরক্ষক নিয়ে টাইব্রেকারে জয় পেয়েছে মোহামেডান। তবে খেলা টাইব্রেকারে গড়ালে আহসান হাবিব বিপুকেই প্রথম পছন্দ ছিল বলে জানিয়েছেন আলফাজ, ‘গোলরক্ষক সুজন হোসেন চোট পাওয়াতে পরিবর্তন করতে হয়েছিল। একটু টেনশন হচ্ছিল। তবে আমাদের পরিকল্পনাই ছিল বিপু টাইব্রেকারে কিপিং করবে।’
এদিকে ফাইনাালে হেরে আবাহনীর পর্তুগিজ কোচ মারিও লেমোস বলেন, ‘দ্বিতীয়ার্ধে আমাদের শুরুটা ভালো ছিল না। আমরা তাদের খেলায় ফেরার সুযোগ করে দিয়েছি। তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। এমন ম্যাচে কোন দল একবার এগিয়ে গেলে তখন সেখান থেকে জয় পাওয়া অনেক কঠিন। দুই দলেরই সমান সুযোগ ছিল।

টাইব্রেকার ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছে। আমাদের এই ম্যাচে জয় পাওয়ার কথা ছিল। আমরা শিরোপা জয়ের জন্য যোগ্য দল ছিলাম। তবে আমরা পারিনি। বাংলাদেশে দিয়াবাতে অন্যতম সেরা একজন স্ট্রাইকার। সে আজ তার সেরাটা দিয়েছে। সবাইকে নিজের সক্ষমতা দেখিয়েছে। আমার দলের অধিনায়ক রাফায়েল অগাস্তো পুরোপরি ফিট ছিল না। তারপরও তাকে খেলানো হয়েছে। সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তবে দিনটা আমাদের ছিল না। অভিনন্দন মোহামেডানকে।’
ফাইনাল শেষে পুরস্কার মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাফুফের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান ভুঁইয়া (মানিক), বাফুফের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার, সংসদ সদস্য (কুমিল্লা-৬) আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, বাফুফে সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ পিন্টু, ইলিয়াস হোসেন, মহিদুর হমান মিরাজ, কুমিল্লা জেলা প্রশাসক শামীম আলম, কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান, কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আহসান ফারুক রোমেল, কুমিল্লা জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বাদল খন্দকার প্রমুখ।

×