ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

মাঠে-ময়দানে নির্বাচনী আমেজ বিজয়ের জন্য মেরুকরণ

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ

প্রকাশিত: ০২:০১, ২ ডিসেম্বর ২০২৩

মাঠে-ময়দানে নির্বাচনী আমেজ বিজয়ের জন্য মেরুকরণ

.

চারদিকে এখন নির্বাচনী আমেজ। আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রায় সবাই এখন দলীয় প্রার্থীর পক্ষে একাট্টা হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এরই মধ্যে মাঠে-ময়দানে প্রার্থীদের পক্ষে নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। প্রভাবশালীদের পক্ষে রাখতে চলছে এক রকম প্রতিযোগিতা। নির্বাচনের  দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমজমাট হচ্ছে নির্বাচনের পরিবেশ। এবার নতুন ভোটারদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। হাট-বাজার চায়ের দোকান সবখানেই ভোটের আলাপ। হেমন্তের শিশির ঝরা রাতেও নির্বাচনী তৎপরতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রার্থী বেশি হওয়ার কারণে জমে উঠেছে নির্বাচন।
মুন্সীগঞ্জের তিন আসনে সব মিলিয়ে ৩২ জন প্রার্থী হয়েছেন। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে ১১ জন, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে ১০ জন এবং মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থী ১১। তবে বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করা হবে ৪ ডিসেম্বর। আর ১৭ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়। এরপরই চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার পরই নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে, চলবে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। ভোট গ্রহণ ৭ জানুয়ারি। কিন্তু এর আগেই এক রকম প্রচার শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে দলীয় প্রতীক নৌকা, লাঙ্গল, কুলাসহ বিভিন্ন প্রতীকের প্রচার চলমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এবার বেশি প্রচার দেখা যাচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র তথা বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তাই আওয়ামী লীগের কোন্দল প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের শক্ত প্রার্থী থাকলেও এবার চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার আবুজাফর রিপন জানান, সারা দুনিয়ার চোখ বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে। স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণে সকল প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রাচীন সভ্যতার জনপদ জেলাটিতে পদ্মাসেতুসহ বিগত দেড় দশকে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়ন নিয়ে নৌকার প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এক সময়কার বিএনপির ঘাঁটি বিএনপি নির্বাচনে না এলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকার কারণে ভোট হবে উৎসবমুখর। আর বিএনপি নির্বাচনে এলে হবে আরও জমজমাট। তবে নৌকায় চির ধরাতে চান স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। জাতীয় পার্টিও (জাপা) শক্তভাবে লড়াই করার আভাস দিচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) ॥ স্বপ্ন জয়ের পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মুন্সীগঞ্জ-১ আসন তথা শ্রীনগর ও সিরাজদিখান উপজেলার গুরুত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণ। রাজধানীর সঙ্গে পদ্মা সেতুকে যুক্ত করা দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ে এই দুই উপজেলার ওপর দিয়েই গেছে। আর পদ্মা সেতু ঘিরে দেশের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রে এই আসন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। 
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে নৌকার প্রার্থী হয়েছেন সিরাজদিখান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন আহম্মেদ। মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য বিকল্পধারার ভাইস চেয়ারম্যান মাহী বি চৌধুরী। তৃণমূল বিএনপির নির্বাহী চেয়ারম্যান অন্তরা হুদাও আসনটিতে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। স্বতন্ত্র হিসাবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবির। জাপার প্রার্থী হয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। বিএনপি নির্বাচনে না এলেও আসনটিতে এবার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। দীর্ঘ ৫২ বছর পর সিরাজদিখান উপজেলা হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মহিউদ্দিন আহম্মেদ। গত নির্বাচনে জোটগতভাবে আসনটি বিকল্পধারাকে ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। এবার শেষ পর্যন্ত আসন ছাড়লেও ভোটের লড়াই হবে প্রবল। তাই সবার নজর এখন মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের দিকে। 
মুন্সীগঞ্জ-২ (টঙ্গীবাড়ি-লৌহজং) ॥ পদ্মা তীরের লৌহজং এবং টঙ্গীবাড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত মুন্সীগঞ্জ-২ আসন নানা কারণেই আলোচিত।  পদ্মা সেতুর উত্তর প্রান্ত মাওয়াকে বলা হয় দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার তথা দক্ষিণ দুয়ার। প্রতিদিন দক্ষিণবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করে থাকেন। পদ্মা তীর নদীভাঙন এই অঞ্চলের যেন অভিশাপ ছিল। পদ্মা সেতুর নদী শাসন ছাড়াও পৃথক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তাই স্থায়ীভাবে বাঁধ তৈরি কাজ শুরু হয়ে গেছে। সরকার ৪৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। লৌহজং থেকে  টঙ্গীবাড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প এই অঞ্চলের আশীর্বাদ। তবে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ভূমিকা প্রশংসনীয়। আর পদ্মা সেতু ঘিরে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে এলাকাটিতে। পুনর্বাসন কেন্দ্রও বদলে দিয়েছে অনেক পরিবারের চিত্র। পুরো এলাকাটিই অর্থনৈতিক চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। মানুষের জীবন মানে বড় পরিবর্তন এসেছে। আর এই সেতু ঘিরে জমির দাম লাফিয়ে বাড়ছে। পদ্মা সেতুর মাওয়া টোল প্লাজার কাছেই বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘খান সাহেবের বাড়ি’। এই বাড়িরই সন্তান দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিষ্ঠাতা স¤পাদক ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ। এই এলাকায় মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও তার পরিবারেরও অনেক অবদান। দীর্ঘদিন এই খান বাড়ি থেকেই সংসদ সদস্য হয়েছেন এই আসনটি থেকে।
এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। সবশেষ ২০১৮ সালে ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থী সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহাকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি টানা প্রায় ২৯ বছর ধরে এখানে নেতৃত্ব দিয়ে নিজের অবস্থান মজবুত করছেন। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নেও তার ভূমিকা রয়েছে। মাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণেও সাধারণের কোনো রকম ক্ষোভ প্রকাশ হয়নি। তবে তার সঙ্গে এবার স্বতন্ত্র হিসাবে লড়ছেন মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহানা তাহমিনা। তবে জাপার প্রার্থী নতুন মুখ নারায়ণগঞ্জের আল জয়নাল প্লাজার মালিক জয়নাল আবেদীন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। পদ্মাপাড়ের আসনটিতে প্রার্থী সংখ্যা ১০।
মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) ॥ এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস। তিনি তৃতীয়বারের মতো নৌকার মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার পদত্যাগী মেয়র হাজী মোহাম্মদ ফয়সাল বিপ্লব। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি। সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য মঙ্গলবার পদত্যাগ করেছেন মেয়র পদ থেকে। ফয়সাল বিপ্লব নানাভাবে তার অবস্থান শক্তভাবে জানান দিচ্ছেন। তার বাবা সাবেক এমপি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী  লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের ইমেজ কাজে লাগাতে চাইছেন। মূলত নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে তার লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এ পর্যন্ত পরপর তিনবার আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে আসনটি। এর আগে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পর পর তিনবার বিএনপির দখলে ছিল।
এদিকে জাপা মুন্সীগঞ্জে শক্তভাবে দাঁড়াতে না পারলেও এবার নতুন মুখ হিসাবে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা রফিকুল্লাহ সেলিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে বিএনপি নির্বাচনে এলে হিসাব পাল্টে যাবে। আর নির্বাচনে না এলে বিএনপির ভোট ব্যাংক এই আসনে কোথায় যায়, সেটিও দেখার বিষয়। এ ছাড়া আরও স্বতন্ত্র বিকল্প প্রার্থী হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি নির্বাচনে না এলেও এই আসনে উৎসবমুখর নির্বাচনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সবার কৌতূহলী চোখ এখন মুন্সীগঞ্জ সদরের আসনটির দিকে।
 

×