ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

নীতি সুদহার ও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি

ড. মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২০:৪১, ৩০ নভেম্বর ২০২৩

নীতি সুদহার ও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি

ড. মো. আইনুল ইসলাম

উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংক সঙ্কোচনমূলক মুদ্রা সরবরাহের পথে হাঁটার ঘোষণা দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে টাকার সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি নীতি সুদহার বা রেপোর সুদহার (কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকের অর্থ ধার করার পদ্ধতি বা হার) আবারও বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি)। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে আমানতের সুদ ও ঋণের সুদহার বাড়ানোর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ২৭ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। ফলে এখন সব ধরনের নীতি সুদহার আবারও বেড়েছে।

এর আগে সর্বশেষ গত অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছিল। বাংলাদেশে সচরাচর মূল্যস্ফীতি প্রায় দুই অঙ্কের ঘরে চলে গেলেও সুদের হার বাড়ানোর অস্ত্র প্রয়োগে নীতিনির্ধারক মহলে অনীহা প্রকাশ করতে দেখা যায়। এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নীতি সুদ বাড়ানো হয়েছে। অতীতে দেখা গেছে নীতি সুদহার বাড়লেও মূল্যস্ফীতির হার কমেনি কিংবা সাময়িক কমলেও আবার বাড়তি ধারায় ফিরে গেছে। শুধু তা-ই নয়, বাজারে মুদ্রা সরবরাহ না কমে বরং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে দেখা গেছে। সাধারণত মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যাওয়া, চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে উৎপাদন হ্রাস, আমদানি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা মেটানো বা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করা হয়।

অর্থনীতি শাস্ত্রে মূল্যস্ফীতিকে এ কারণে অনেক সময় ‘কস্ট পুশ’ বা ‘ডিমান্ড পুশ’ বলা হয়। বাংলাদেশে বাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার জন্য কোভিডের অভিঘাতসহ বিশ্বের নানা সংকটকে দায়ী করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে শুধু বিশ্ব প্রেক্ষাপট নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যাও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি প্রবণতার পেছনে কাজ করেছে। উন্নত দেশগুলোতে এই পরিস্থিতিতে প্রায় সবাই সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে সফল হলেও বাংলাদেশের মতো বিকাশমান বা উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে শুধু নীতি সুদহার বৃদ্ধির অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারা যায় না বলেই দেখা গেছে।

তারপরও নীতি সুদহার বৃদ্ধি স্বীকৃত এক পদ্ধতি। অর্থনীতির বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর ভূমিকা না রাখতে পারা, ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে মূল্য কারসাজির প্রবণতা অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকিতে ব্যর্থতার কারণেই দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মূল প্রতিবন্ধকতা। তবে এসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর সব দায় চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ, রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের কারণে নিয়ন্ত্রক এই সংস্থাটির কার্যক্রম ও ক্ষমতায় সীমাবদ্ধতার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। সংস্থাটির স্বাধীনভাবে কাজ করা নিয়েও নানা সময় নানা প্রশ্ন উঠেছে। 
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদহারে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সময়ের জন্য ঋণ দেয় সেটাই হচ্ছে নীতি সুদহার। ইংরেজিতে যাকে বলে রেপো রেট। রেপোর বাংলা হচ্ছে পুনঃক্রয় চুক্তি, যা  মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রানীতির অন্যতম এক হাতিয়ার হিসেবেও পরিচিত। সুদের হার বাড়লে মানুষ সাধারণত ব্যাংকে আমানত রাখতে উৎসাহিত হন। অর্থনীতিতে নগদ তারল্যের জোগান দিতে বা অন্যভাবে বলতে গেলে ব্যাংকগুলোর জরুরি প্রয়োজনে অর্থ সরবরাহ করতে মুদ্রানীতির এ হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতি হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া।

অর্থাৎ, আগের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে একই পণ্য বা সেবা কিনতে বাধ্য হওয়া। বাজারে যখন মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়, কিন্তু পণ্য বা সেবার পরিমাণ একই থাকে তখনই মূল্যস্ফীতি হয়। আর এই মুদ্রাস্ফীতির ফলেই মূল্যস্ফীতি হয়ে থাকে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ হাতিয়ার ব্যবহার করে। নীতি সুদহার বাড়ানো হয় মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য। নীতি সুদহার বুঝতে হলে রিভার্স রেপো রেটের আলোচনাও সামনে চলে আসে। যেমন– কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি মনে করে বাজারে অতিরিক্ত তারল্য আছে তা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই তারল্য তুলে নেয়। এজন্যও একটি নির্দিষ্ট সুদের হার থাকে। অর্থ তুলে নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে সুদের হার দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাকে বলা হয় রিভার্স রেপো।

সাধারণত নীতি সুদহার বা রেপো রেটের তুলনায় রিভার্স রেপোর সুদহার কম থাকে। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক নীতি সুদহার বৃদ্ধির ঘোষণায় বলেছে, প্রথমত রেপো রেট একবারে দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোয় নীতি সুদহার ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো যে টাকা ধার করবে তার সুদহার বাড়বে। দ্বিতীয়ত, রিভার্স রেপো (বর্তমান নাম স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফ) নিম্ন সীমার সুদহার ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। বাজারে উদ্বৃত্ত টাকা থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক রিভার্স রেপোর মাধ্যমে টাকা তুলে নেয়।

তৃতীয়ত, নীতি সুদহার করিডরের ঊর্ধ্বসীমা স্পেশাল রেপো বা এসএলএফের (স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি) সুদহার ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সংকটে পড়া ব্যাংক উচ্চ সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে। চতুর্থত, স্মার্ট বা সিক্স মান্থস মুভিং অ্যাভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিলের সুদ ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। এখন স্মার্ট রেট ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ব্যাংকগুলো এর সঙ্গে সাড়ে ৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ যুক্ত করতে পারে। নতুন সিদ্ধান্তে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ যুক্ত করতে পারবে ব্যাংকগুলো। তাতে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানতের সুদ ও ঋণের সুদহার আরও বাড়বে। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে নীতি পদক্ষেপ, বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যের নিম্নমুখী ধারা, চলতি আমন ধানের ভালো ফলন এবং শীতকালীন ফসলের সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে আগামী দিনে মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় নেমে আসবে। এছাড়া ডলারের বিনিময় হারকে বাজারমুখী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান প্রচেষ্টা জোরদার ও ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখা হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য এতদিন মূলত ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করে আসছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করছে তারা।

নীতি সুদহার বৃদ্ধি করায় এখন স্বল্পমেয়াদি আমানত সংগ্রহে আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এর বিকল্প নেই। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর মুনাফার ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ট্রেজারি বিলের ছয় মাসের গড় সুদের হার (সিক্সথ মান্থস মুভিং এভারেজ রেট অব ট্রেজারি বিল-স্মার্ট) নামে একটা বিষয় আছে। এ থেকে ৩ শতাংশ বেশি হতে পারবে না ঋণের সুদের হার। বর্তমানে স্মার্ট রেট ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। সে হিসেবে ঋণের সুদ হতে পারবে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক স্মার্ট রেটের সঙ্গে ৩ শতাংশের পরিবর্তে ঋণের সুদ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। তবে এ হার আরেকটু বাড়ালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজটি যেমন ভালো হতো, তেমনি ব্যাংকগুলোও সুরক্ষা পেত বলে অনেক ব্যাংকার মনে করছেন। 
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই নীতি সুদহার বাড়ায় তখন যখন মূল্যস্ফীতি বেশি থাকে। এ বিবেচনায় বাংলাদেশে বছরের শুরুতে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলে ভালো হতো। দেরিতে হলেও এখন নীতি সুদহার বৃদ্ধিতে ব্যাংকগুলোর ঋণের খরচ বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সমস্যা হচ্ছে নীতি সুদহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য নীতি-কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয় না। যেমন– ঋণের সুদ বৃদ্ধি করা।

একজন গ্রাহকের ক্ষেত্রে ছয় মাসের মধ্যে সুদের হার আর বাড়ানো যাবে না- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন বাধ্যবাধকতা থাকায় তা সম্ভব হয় না। বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত এক-দেড় বছর ধরে তীব্র মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে ক্রমাগতভাবে নীতি সুদহার বাড়িয়ে গেছে। করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ২০২২ সালের শুরুর দিকে সব দেশেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা যায়। তখন বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। এ সময় কোভিডে নাগরিকদের বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হওয়ার রেকর্ড গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশে ঠেকেছিল।

আর যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ করেছিল সেখানকার মানুষ। সে বিবেচনায় বলা যায়, বাংলাদেশ বছরের শুরুতে নীতি সুদহার বাড়ালে জনগণের এতটা মূল্যস্ফীতির চাপ বহন করতে হতো না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন ঘোষিত নীতি সুদহার কতটা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই অস্ত্রটি যথাসময়ে যথানিয়মে প্রয়োগ করাই সমীচীন এবং তা উদ্দীষ্ট ফল পেতে কাজে লাগে।


লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

×