ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

ড. মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২০:৫৯, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩; আপডেট: ১৬:৫৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩

প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম

আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বৈদেশিক বিনিয়োগের অবদান ১ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশের এফডিআই যদি ৫-৬ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ১০ শতাংশ। এই পরিমাণ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগও রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। এর জন্য দেশী উদ্যোক্তাদের পুঁজি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কার্যকর সুযোগ করে দিতে হবে। প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশে টেক্সটাইল, চামড়াজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিকস দ্রব্য, রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল, কৃষিভিত্তিক শিল্প, কাঁচা পাট, কাগজ, রেশম শিল্প, হিমায়িত খাদ্য (বিশেষত চিংড়ি), পর্যটন, কৃষি, ক্ষুদ্রশিল্প, সফটওয়্যার ও ডাটা প্রসেসিংয়ের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে বিদেশী বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে সবার আগে দেশী-বিদেশী, সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে নানা সময়ে তুলে ধরা প্রতিবন্ধকসমূহ সরিয়ে ফেলতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে

পৃথিবীর উন্নয়ন ইতিহাসে এ কথা প্রমাণিত, আজকের উন্নত দেশগুলোর ধনী হওয়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দেশাত্মবোধসম্পন্ন চেতনার সংরক্ষণবাদী নীতি-কৌশল। ধনী দেশগুলোর কোনোটিরই ধনী হওয়ার পেছনে নব্য-উদারবাদীদের মুক্তবাণিজ্য বা মুক্তবাজার মতবাদ কাজে আসেনি। বরং কাজে লেগেছে বাণিজ্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশজ শিল্প সুরক্ষা এবং তা বিকশিত করার পথ-পদ্ধতি, যেখানে সরকারি ব্যয়-বরাদ্দ ও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। অথচ ১৯৯১ সাল থেকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার কথা বিবেচনা না করেই অনেকটা বলেকয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে গা ভাসিয়ে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে। তারপরও এই দীর্ঘ চার দশকে বাংলাদেশ কল্যাণমূলক কোনো অর্থনীতি ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি।

এর কারণ, বাংলাদেশের অর্থনীতির এই বিকাশ মূলত দেশের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র মানুষের খুদে খুদে অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াসনির্ভর (যা-ও আবার বড় বড় পুঁজিপতিরা ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছে)। একবিংশ শতকের দ্বি-দশকে এসে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের যাত্রায় বিশ্বের ৫০টি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের তালিকায় ৪৬৫ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি নিয়ে ৩৫তম স্থানে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু সেখানে উন্নয়নের অন্যতম অনুঘটক প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই) ভূমিকা ছিল খুব সামান্য। এখন বাংলাদেশের সরকার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই আকর্ষণে উঠেপড়ে লেগেছে। নানা আহ্বান জানাচ্ছে বিভিন্ন দেশে। তারপরও বাংলাদেশের মতো এত সহজে টাকা উপার্জনের দেশে কিছুতেই বাড়ছে না এফডিআই। এর কারণ কী? অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিদেশী ব্যবসায়ীরা অনেক দিন ধরেই বিদেশী বিনিয়োগের অপ্রতুলতার পেছনের কারণগুলো বলে আসছেন। সে অনুযায়ী সরকারও নানা সময় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তবু প্রত্যাশিত ও প্রয়োজনীয় এফডিআই আসছে না দেশে। 
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে এফডিআই বা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ) এসেছে ৩৪৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিট পুঁজি ১৩৫ কোটি ডলার, যা মোট এফডিআইর ৩৯ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৫১ কোটির মধ্যে নিট পুঁজি ৮২ কোটি ডলার, যা মোট এফডিআইর ৩৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৩৭ কোটির মধ্যে নিট পুঁজি ৭৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ মোট এফডিআইর ৩১ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৮৯ কোটি ডলারের মধ্যে নিট পুঁজি ১২০ কোটি ডলার, মোট বিনিয়োগের ৩১ শতাংশ। ২০২২ সালে বিশ্বে এফডিআই কমলেও বাংলাদেশে বেড়েছে।

এ সময় দেশে এফডিআই প্রবাহ ২০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪৮ কোটি ডলার, যা এখন স্থানীয় মুদ্রায় ৩৭ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকার মতো (প্রতি ডলার ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা ধরে)। দেশে ১৯৯০ সালের পর এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এফডিআই। দেশে গত ৩৩ বছরের মধ্যে ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ৩৬১ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছিল। তবে এই হিসাবে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। এফডিআইর বড় অংশই এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানির ঋণ ও অর্জিত মুনাফা থেকে এসেছে। মোট বিনিয়োগের মধ্যে নিট পুঁজি হিসেবে আসে ৩০ থেকে ৩৯ শতাংশ। বিনিয়োগের এই চিত্র বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতির বাংলাদেশের জন্য মোটেও সুখকর নয়।
এফডিআই প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যবিষয়ক একটি ডকুমেন্টারির তথ্য তুলে ধরতে সর্বাগ্রে মন চাইছে। ডকুমেন্টারিতে দেখা যায়, অতীতে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ‘কালোমানিক’ এক রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য তুলে ধরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের আমলা-ব্যবসায়ীরা বিদেশে বসে যখন বিনিয়োগবিষয়ক আলোচনা করেন, তখন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ফিরিস্তি তুলে ধরেন। কিন্তু কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করার সময় এলে সবার আগে বিদেশী বিনিয়োগকারীর কাছে তার দেশে আবাসন খাতের নিয়মকানুন জানতে চান, সিটিজেন হওয়ার শর্তসমূহ বুঝতে চান, সন্তানের লেখাপড়ার ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন। ফলে চতুর বিদেশী বিনিয়োগকারী চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও কিছুদিন বাংলাদেশে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেফিরে যা বোঝার বুঝে নেন এবং কিছুদিন পর নিজ দেশে ফিরে হাত গুটিয়ে বসে থাকেন।

অথচ সরকারিভাবে বলা হয়, ১০০ শতাংশ সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (ডিএফআই) অথবা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) যৌথ বিনিয়োগ অথবা এই এলাকার বাইরের বিনিয়োগ; স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাবলিক কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের দ্বারা তালিকাভুক্ত বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ যেমনÑ বিদ্যুৎ খাত, তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান, টেলিযোগাযোগ, বন্দর, সড়ক ও জনপথ; সরাসরি অথবা প্রত্যক্ষ ক্রয় অথবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয় করা (বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়াধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার), বেসরকারি ইপিজেড বিনিয়োগ প্রভৃতি খাতে যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগকারীর জন্য বাংলাদেশে উৎকৃষ্ট। আরও বলা হয়, সরকার ধাপে ধাপে শিল্প ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে নিজের সম্পৃক্ততা সরিয়ে বেসরকারি অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করছে।

অর্থনৈতিক নীতিসমূহের ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত সুনির্দিষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন করছে, যেখানে সরকারের ভূমিকা অনুঘটকের, নিয়ন্ত্রকের নয়। নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধকে ন্যূনতম একটি পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে; সরকার সুষম গতিতে বাণিজ্য ক্ষেত্রে উদারীকরণ করেছে; শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা, যৌক্তিক শুল্ক নির্ধারণ এবং রপ্তানি সুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্জন সাধন করেছে; শিল্পহার কাঠামো ও আমদানিনীতির বিভিন্ন দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 
সরকারের এসব কথা সত্যি হলেও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারি কাগজেকলমে অনেক কিছু থাকলেও বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অনেক বাধা রয়েছে। যেমন- বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রপ্তানিতে কর ও কোটা সুবিধা পাওয়ায় দেশে গার্মেন্ট খাতে অনেক বিদেশী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। কিন্তু দেশের গার্মেন্ট খাতের উদ্যোক্তারা এর তীব্র বিরোধী। তাদের দাবি, বিদেশীরা প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করুক। কারণ, দেশে মৌলিক ও বড় শিল্প স্থাপন করা জরুরি। এই উদ্যোক্তারা ভাবেন না, আধুনিককালে অর্থনৈতিক নীতির মূল ভিত্তিই হলো সম্পদের উৎপাদন ও বণ্টনে প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতির ওপর আস্থা এবং বেসরকারি খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দূর করা।

তারা সস্তা শ্রমের দৌলতে অধিক আয়ের মানসকিতা ত্যাগ করতে চান না। করতে চান না প্রতিযোগিতা। বিদেশী উদ্যোক্তাদের বেলায় তারা মানতে চান না যে, অর্থনীতিতে টাকা বাড়ে তখন, যখন সে উৎপাদনশীল কোথাও বিনিয়োজিত হয়। কারণ, টাকা নিজে হাঁটতে পারে না, উড়তেও পারে না। অথচ টাকাকে উড়িয়ে নেওয়া যায়, যদি বিনিয়োগপ্রত্যাশী কেউ তাকে উড়িয়ে নিতে পারেন। যদি তার মূল্য দিতে পারেন। অদক্ষ শ্রমিক-অধ্যুষিত বাংলাদেশে প্রযুক্তির মতো দক্ষতানির্ভর খাতে বিনিয়োগ করতে বিদেশীদের বয়ে গেছে। আমলাদের দীর্ঘসূত্রতা আর অতিমুনাফালোভী বাংলাদেশী ব্যবসায়ী শ্রেণির এই মানসিকতাই বাংলাদেশ এফডিআই আকর্ষণের পথে মূল অন্তরায়। দুর্নীতিসহ আনুষঙ্গিক আরও সব বাধা এই দুই অন্তরায় থেকেই সৃষ্টি হয়েছে।

এ কথা সত্যি, সাদা চোখে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। তারপরে রয়েছে যথাক্রমে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে আইনের দ্রুত প্রয়োগের অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মাত্রাতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ, দুর্বল অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, জমির অভাব ও ক্রয়ে জটিলতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের ঋণ জোগানে অক্ষমতা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যোগসূত্র ও সমন্বয়ের অভাব। এর বাইরেও রয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। 
বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হলে আগে দেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। দেশী বিনিয়োগকারীদের দেখে বিদেশীরা এগিয়ে আসবেন। তাদের মনে আস্থার সঞ্চার করতে হলে বাংলাদেশীদের স্বদেশে বিনিয়োগের উদাহরণ তুলে ধরতে হবে। অথচ ২০২২ সালের শুরুতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অধিশাখা এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিদেশে তাদের অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা তখন বাংলাদেশী দেশীয় ব্র্যান্ডকে প্রমোট করতে উদ্যোগটিকে ভালো বললেও অর্থ পাচারের ঝুঁকির আশঙ্কার বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। ওই সিদ্ধান্তের পর অর্থ পাচারের প্রবণতা আরও বেড়েছে। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের অর্থ সঞ্চয় নিয়ে হইচই হওয়ায় এখন বাংলাদেশীরা সুইজারল্যান্ড বাদ দিয়ে অন্য নয়টি দেশে নিরাপদে টাকা পাচার করছে।

যার মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড। এসব দেশে প্রতিবছর আমাদের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩৬ শতাংশ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, যার পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকার কম নয়। অর্থপাচার প্রভাবশালীদের কাছে এখন মামুলি বিষয় মাত্র। সরকারের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও আমাদের মানসিকতা অসৎ। 
এই উদ্দেশ্য সফল করতে হলে, সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো থাকতে হয়। কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার পাশাপাশি সরকারকেও স্বচ্ছ হতে হয়। অন্যথায়, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে শেল কোম্পানিও প্রস্তুত হয়। বাংলাদেশে সেটাই হয়েছে। এস আলম গ্রুপ সিঙ্গাপুরে কমপক্ষে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক অথবা সরকারের কোনো অনুমতি ছাড়াই। অথচ এস আলম গ্রুপ চাইলে অনেক বিদেশী বিনিয়োগকারীকে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দিতে পারত। কারণ, বিদেশী বিনিয়োগ উদ্যোক্তারা প্রথমেই বড় বাধায় পড়েন যোগাযোগের ক্ষেত্রে।

সাধারণত যেকোনো দেশে বিদেশী বড় বিনিয়োগ আসে দেশী উদ্যোক্তার হাত ধরে। কিন্তু দেশের বিনিয়োগকারীরা যৌথ উদ্যোগে কারখানা করতে আগ্রহী নন। তারা একক মালিকানায় শিল্প স্থাপনেই বেশি আগ্রহী। ফলে বিনিয়োগ সম্মেলন, আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে বিদেশি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যে সম্পর্ক হয়, সেখানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তবে বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের দাবিও অমূলক নয়। তাদের মতে, দেশে ব্যবসায় রয়েছে নানা জটিলতা। কারখানা চালাতে স্থানীয় পর্যায়ে বড় অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়, সরকারি অফিসের নানা ঘাটে চাঁদার চাহিদা মেটাতে হয়। ফলে খরচ বেড়ে যায়। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের উটকো ঝামেলার ঝুঁকি নিতে চান না। এ ছাড়াও দেশে বর্তমানে গ্যাস, বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকটও প্রকট। চড়া দাম দিয়েও নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ মেলে না।

অবকাঠামোগত সমস্যা তো আছেই। এগুলোর মধ্যে বিদেশীদের ডেকে এনে বিপদে ফেলতে কার মন চায়! বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) থেকে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আওতায় ৫০ ধরনের সেবা দেওয়া হয়। এতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত জটিলতা কিছুটা কমলেও মাঠপর্যায়ের সেবা পেতে দুর্নীতি থেকে শুরু করে নানা ঝামেলা পোহাতে হয়। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সে সময় বলা হয়, প্রায় সব স্তরেই দুর্নীতি আছে বলে ব্যাপকভাবে অনুমান করা হয়, যা বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।

এ ছাড়াও বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইনের দুর্বল প্রয়োগ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো ও বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের সক্ষমতার অভাবকে অন্যতম সমস্যা। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সরবরাহের সংকটের কথাও বলা হয়েছে। কয়েক বছর আগে বিনিয়োগের জন্য ১৬টি বাধা চিহ্নিত করেছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। সেসব বাধা দূর করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তেমন কার্যকর ফল আসেনি। চিহ্নিত বাধাগুলোর মধ্যে ছিলÑ কারখানা স্থাপনে পর্যাপ্ত জমির অভাব, বিদ্যুৎ ও গ্যাস প্রাপ্তিতে সমস্যা, দুর্বল অবকাঠামো, চাহিদা ও সময়মতো ঋণ না পাওয়া, কাঁচামালের সমস্যা, দক্ষ জনশক্তির অভাব, পণ্য বিপণনে সমস্যা, যথেষ্ট জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উদ্যোক্তার অভাব, অসম প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন সংস্থা থেকে ছাড়পত্র গ্রহণে জটিলতা, বিভিন্ন ধরনের কর সমস্যা, নীতির অস্পষ্টতা, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের জোগান কম ইত্যাদি।
আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বৈদেশিক বিনিয়োগের অবদান ১ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশের এফডিআই যদি ৫-৬ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ১০ শতাংশ। এই পরিমাণ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগও রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। এর জন্য দেশী উদ্যোক্তাদের পুঁজি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কার্যকর সুযোগ করে দিতে হবে। প্রকৃত অর্থেই, বাংলাদেশে টেক্সটাইল, চামড়াজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিকস দ্রব্য, রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল, কৃষিভিত্তিক শিল্প, কাঁচা পাট, কাগজ, রেশম শিল্প, হিমায়িত খাদ্য (বিশেষত চিংড়ি), পর্যটন, কৃষি, ক্ষুদ্রশিল্প, সফটওয়্যার ও ডাটা প্রসেসিংয়ের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে বিদেশী বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তবে সবার আগে দেশী-বিদেশী, সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে নানা সময়ে তুলে ধরা প্রতিবন্ধকসমূহ সরিয়ে ফেলতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে সরকারকে। সবার আগে দেশের শিল্পায়ন নীতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অন্তর্ভুক্ত পাট শিল্প, বয়ন শিল্প, গ্যাস, তেল, কয়লা, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য শিল্প-বাণিজ্য খাতের রাষ্ট্রায়ত্তকরণ আরও কিভাবে শক্তিশালী করা যায় অথবা কিভাবে তা শ্রমিকদের মালিকানাধীন সরকারি ব্যবস্থায় (যা সংবিধানের ১৩ অনুচ্ছেদে আছে) পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয়-বরাদ্দসহ সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রাখতে হবে। তা না-হলে প্রতিবছর ছিটেফোঁটা করে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এলেও, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই রূপ দিতে কোনোকালেই তেমন কাজে দেবে না।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

×